• ঢাকা
  • সোমবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১,

দেশে এখনো ২৩.২ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর


সংবাদ প্রকাশ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৩, ০৭:২৩ পিএম
দেশে এখনো ২৩.২ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর
ছবি : সংগৃহীত

কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গে দীর্ঘ ২৫ বছর জড়িত আবুল কাশেম। পরিবারে অভাবের তাড়নায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়নি তার। ছয় বছর বয়সে নরসিংদীর বাবু বাজারে এক আত্মীয়ের দোকানে কাজ শুরু করেন তিনি। দুই বছর পর কাজ করতে করতে এক সময় মনে হয় হিসেব-নিকেশ শিখতে হবে। দোকানের মালিকের সহায়তায় তখন তা শিখা হয়। কিন্তু নিজের নাম ও স্বাক্ষর করা শিখা হয়নি তার।

সংবাদ প্রকাশকে আবুল কাশেম বলেন, “আত্মীয়ের দোকানে দীর্ঘদিন কাজ করে এবার রাজধানীর রামপুরায় নিজের দোকান দিয়েছি। দোকানের কেনাকাটায় বিভিন্ন সময় নিজের নাম লিখতে হয়। ব্যাংক ঋণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় নিজের নাম লিখে সই দিতে হয়। তখন বেশ অসুবিধায় পড়তে হয়। পরে বাধ্য হয়ে কিছু দিন আগে পাশের দোকানের এক ভাইয়ের সহযোগিতায় নিজের নাম লিখা ও সই করা শিখেছি।”

সৃষ্টির শুরু থেকে শিক্ষার আলোই মানুষকে সামনের পথ দেখিয়েছে, চলতে শিখিয়েছে। জীবনের মান-উন্নয়নে ও সভ্যতার বিকাশে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছরে এখনো শতভাগ সাক্ষর জ্ঞান সক্ষমতা পৌঁছাতে পারেনি দেশ। বর্তমানে বাংলাদেশে ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ লোক রয়েছে। বাকি ২৩ দশমিক ২ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখনো নিরক্ষর। 

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সাক্ষর জ্ঞানে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছেন নারীরা। শিক্ষাবিদরা বলছে, শতভাগ সাক্ষর জ্ঞান নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনের তাগিদে সাধারণ মানুষকে সচেতনতার জন্য সাক্ষর জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

হাতিরঝিল এলাকায় চা বিক্রেতা নূর আলম সংবাদ প্রকাশকে বলেন, “দীর্ঘদিন ফুটপাতে চা বিক্রি করি। কোনোদিন মনে হয়নি নিজের নাম লিখতে হবে। তাই নিজের নাম লেখা শিখা হয়নি। সব সময় আঙ্গুলের চাপ দিয়ে কাজ করেছি। কিছুদিন আগে মেয়ের বিয়ের জন্য এনজিও থেকে লোন নিতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হয়। আঙ্গুলের চাপ দিয়ে হবে না। নিজের নাম লিখে সই দিতে হবে। তখন মেয়ের সহযোগিতায় কোনোভাবে নিজের নাম লিখে সই দিই।”  

দেশের সাক্ষরতার হার নিয়ে সংবাদ প্রকাশকে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, “সাক্ষরতার হাত শতভাগ অর্জন করতে হলে প্রাথমিক স্তরেই আমাদের শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে। সেখান থেকেই আমাদের কাজ করতে হবে। আমাদের এখানে কার্যকর সাক্ষরতা নিশ্চিত করতে হলে বাংলায় একটি অনুচ্ছেদ লিখতে পারা এবং পড়তে পারা নিশ্চিত করতে হবে।”

মনজুরুল ইসলাম আরও বলেন, “চলমান সমস্যার সমাধানে আমাদের শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই জোর দিতে হবে। পাশাপাশি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মতো কার্যক্রমগুলোতেও জোর দিতে হবে। বর্তমানে এ ধরনের কার্যক্রমগুলো অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। গণসাক্ষরতা অভিযানের মতো কার্যক্রমগুলোও আমাদের সমাধান দিতে পারে। এজন্য আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করলেই শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন সম্ভব হবে।”

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আইরিন সুলতানা সংবাদ প্রকাশকে বলেন, “দেশের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে একজনের অর্থ-সম্পদ অন্যজন হাতিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা সবসময় শোনা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এমন ঘটনা কমে এসেছে। প্রতিটি পরিবারে কেউ না কেউ প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। তারপরেও এখন প্রত্যন্ত গ্রামে খেটে খাওয়া মানুষগুলো সাক্ষরতার জ্ঞানে পিছিয়ে আছেন। নানাভাবে প্রতারিত হচ্ছেন। স্বাক্ষর জালজালিয়াতি করে কেউ যাতে প্রতারিত না করতে পারে সেজন্য সবাইকে সাক্ষর জ্ঞানের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।”  

আইরিন সুলতানা আরও বলেন, “দেশে বর্তমানে সাক্ষরতার হার বাড়ানোর জন্য সরকারকে সাক্ষরতাকেন্দ্রের প্রসার ঘটানোর পাশাপাশি দেশের যেসব অঞ্চলে সাক্ষরতার হার কম, সেসব অঞ্চলে এই কেন্দ্রগুলোর বেশি করে প্রসার ঘটাতে হবে। পাশাপাশি কেবল সরকারের পক্ষে নিরক্ষরতা দুর করা সম্ভব নয়। তাই সমবেত ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আর্থ সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে।”

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, দেশে বিগত ২০১৮ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০১৯ সালে এ হার ছিল ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এরপর ২০২০ সালে ছিল ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২১ সালেও সাক্ষরতার হার একই ছিল। এরপর সর্বশেষ ২০২২ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ।

Link copied!