বাংলাদেশে ‘একাধিক’ পটপরিবর্তনের মধ্যে দুই দেশের সম্পর্ক কীভাবে এগিয়েছে, বিদায়ী বার্তায় তার ওপর আলো ফেলেছেন ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মা।
ঢাকায় তিন সরকারের সঙ্গে কাজ করা এই কূটনীতিক রোববার (২৪ মে) বলেছেন, আমরা প্রায় চার বছর ধরে ঢাকায় অবস্থান করেছি—যা প্রচলিত তিন বছর মেয়াদকালের চেয়ে দীর্ঘ। এই সময়কালে আমরা একাধিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছি, যার প্রত্যেকটি একে অপরের থেকে পৃথক। প্রতিটিরই রয়েছে নতুন একদল করে অংশীজন, যাদের ভারতের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে রয়েছে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। কখনও কখনও এটি ছিল বন্ধুর। কিন্তু ফিরে তাকালে মনে হয়, এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ফলপ্রসূ একটি অভিজ্ঞতাও ছিল।
রামিসাসহ সব শিশু ধর্ষণ, হত্যার দ্রুত বিচার এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি
২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশে ভারতীয় মিশন প্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসা প্রণয় ভার্মাকে বেলজিয়াম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত করে ব্রাসেলস পাঠাচ্ছে দিল্লি।
সাড়ে তিন বছর আগে পেশাদার এই কূটনীতিক যখন ঢাকা মিশনের দায়িত্বে আসেন, তখন দুই দেশের সম্পর্ক ‘সোনালী অধ্যায়ে’ থাকার কথা বলত দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদী এবং ঢাকায় শেখ হাসিনার সরকার।
তার দায়িত্ব পালনকালে বিরোধীদের বর্জনের মধ্যে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে টানা চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।
সাত মাসের মাথায় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সে বছর ৫ অগাস্ট পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। তখন থেকে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
সরকার পতনের পরে আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে হাই কমিশনারের দায়িত্ব সামলান প্রণয় ভার্মা। এ সময় নানা বিষয়ে একে অপরের হাই কমিশনারকে পাল্টাপাল্টি তলব করেছিল ঢাকা ও দিল্লি।
দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পেরিয়ে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির নতুন সরকার ঢাকার ক্ষমতায় আসার পর ওই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালাচ্ছে উভয় দেশ।
এর মধ্যে ঢাকা মিশনে পরিবর্তন এনে সাবেক মন্ত্রী দীনেশ ত্রিদেবীকে হাই কমিশনার করে পাঠাচ্ছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার।
রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতের পর ঢাকায় নিজের চার বছরের দায়িত্ব এবং দুদেশের সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি নিয়ে লিখেছেন প্রণয় ভার্মা।
বিদায়ী বার্তায় হাই কমিশনার লিখেছেন, “আমি ও আমার স্ত্রী মনু এখান থেকে অনেক অবিস্মরণীয় স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে যাব। অনেক মানুষ অসাধারণভাবে আমাদের জীবনকে ছুঁয়ে গেছেন, গড়ে তুলেছেন এমন বন্ধুত্বের বন্ধন, যা কূটনীতিবিদ হিসেবে এই দেশের সাথে সংযোগের পরিসর অতিক্রম করে অনেক বেশি স্থায়ী হবে। বাংলাদেশে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি যে আমাদের সম্পর্কগুলো কতটা বিশেষ ও অনন্য। এক স্তরে, আমরা অভিন্ন ভূগোল, ইতিহাস, ভাষা ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে সংযুক্ত। অন্য দিকে, আমাদের মধ্যে এমন এক সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা ও সহমর্মিতা রয়েছে, যা অন্য যেকোনো দুটি সমাজের মধ্যে বিরল।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সম্মিলিত আত্মত্যাগের মাধ্যমে দুই দেশ ‘আবেগের বন্ধনে আবদ্ধ’ মন্তব্য করে প্রণয় ভার্মা বলেন, আমাদের সম্পর্কটি তাৎপর্যপূর্ণ পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও আন্তঃসংযোগের। একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ যেমন ভারতের জন্য কাম্য, তেমনই একটি সমৃদ্ধ ভারতও বাংলাদেশের জন্য কাম্য। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আবেগগত সংযোগের এই বাস্তবতা এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও পারস্পরিক কল্যাণের এই যুক্তিই আমাদের সম্পর্কটিকে অব্যাহতভাবে পথনির্দেশনা প্রদান করবে এবং সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
৫৫ বছরে দুই দেশের পথচলার দিকে আলোকপাত করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের জন্মের পর বিগত ৫৫ বছরে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছে। আমরা উভয়ই আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি সক্ষম, আত্মবিশ্বাসী, সংযুক্ত এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী সমাজে পরিণত হয়েছি। আমরা উভয়েই আমাদের অভিন্ন এই অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন।
‘জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত স্থায়িত্বের মতো অভিন্ন প্রতিবন্ধকতাসমূহ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে আমাদের দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের দুটি বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে, আমাদের উভয়কেই এই অঞ্চলে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের লক্ষ্যে মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে হবে।’
‘অতীতের তুলনায়’ আলাদা হওয়ার এই সময়ে দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ-কেন্দ্রিক নতুন কর্মসূচির তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন প্রণয় ভার্মা।
তিনি বলেন, আজ আমরা আমাদের অতীতের তুলনায় অনেকাংশেই আলাদা হওয়ার কারণে আমি আরও বিশ্বাস করি যে, আমাদের সম্পৃক্ততার জন্য ভবিষ্যৎ-কেন্দ্রিক নতুন একটি কর্মসূচি প্রয়োজন। এমন একটি কর্মসূচি যা আমাদের নতুন সক্ষমতাসমূহ, নতুন লক্ষ্যসমূহ ও নতুন জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমন একটি কর্মসূচি যা আমাদের সুদৃঢ় সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সংযোগের মাধ্যমে পরিচালিত। এবং এমন একটি কর্মসূচি যা পারস্পরিক আগ্রহ, পারস্পরিক কল্যাণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর ভিত্তি করে গঠিত।
দুদেশের ভৌগোলিক নৈকট্যকে ‘সম্পদ’ হিসেবে অভিহিত করে প্রণয় ভার্মা বলেন, দ্রুত বিকাশমান দুটি দেশ হিসেবে আমাদের ভৌগোলিক নৈকট্য আমাদের উভয়ের জন্যই একটি সম্পদ, কোনো দায় নয়। এই নৈকট্যকে উভয়ের জন্য নতুন সুযোগে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে আমাদেরকে অবশ্যই নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। আমি আশাবাদী যে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সকল শুভানুধ্যায়ী এই অভিন্ন স্বপ্নকে গড়ে তোলা ও এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একত্রিত হবেন।
তিনি বলেন, দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিষয়ে ‘আরও বেশি আশাবাদী হয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ’ করছেন তিনি।
প্রণয় ভার্মা বলেন, চার বছর অনেক দীর্ঘ সময় হলেও এই দেশ ও তার মানুষের প্রতি আমাদের যে স্নেহার্দ্রতা ও আবেগীয় টান গড়ে উঠেছে, তার জন্য এই সময়কাল অপ্রতুল। নানা উত্থান-পতন সত্ত্বেও কেবলমাত্র অসাধারণ বন্ধুত্ব, এ দেশের মানুষের উষ্ণতা ও স্নেহের কারণে আমার ও আমার স্ত্রীর কাছে বাংলাদেশে আমাদের কাটানো এই সময়টি সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি হিসেবে অমলিন হয়ে থাকবে।
সবশেষে প্রণয় ভার্মা লেখেন, বাংলাদেশের প্রায় সকল স্তরের এমন বহু সদয় ও সুহৃদ বন্ধু, যারা আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার প্রত্যাশা করছি। আমরা আশা করি, আমাদের পথ আবার কখনও, কোনো এক সময়ে, কোনো এক স্থানে মিলিত হবে! সেই পর্যন্ত, আমি শুধু এটাই বলতে চাই—আবার দেখা হবে!
সূত্র: বিডি নিউজ
















