রাজধানী ঢাকায় গত এক বছরে একের পর এক আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে পেশাদার ভাড়াটে খুনিদের হাত। নেপথ্যের নির্দেশদাতারা টাকার বিনিময়ে এই খুনিদের দিয়ে টার্গেট কিলিং ঘটাচ্ছে। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্তে নেমে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানীতে সক্রিয় ৪০১ জন ভাড়াটে শুটারকে শনাক্ত করেছে এবং তাদের তালিকা তৈরি করেছে।
বিভাগওয়ারী শুটারদের বিস্তার
ডিএমপির আটটি ক্রাইম বিভাগে শনাক্ত হওয়া ৪০১ জন ভাড়াটে শুটারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মতিঝিল বিভাগে — ১১৮ জন। এরপর রয়েছে ওয়ারী ৭৩, তেজগাঁও ৬১, মিরপুর ৬০, রমনা ৩৬, লালবাগ ২৪, গুলশান ১৬ এবং উত্তরা ১৩ জন।
থানাওয়ারী হিসাবে সবচেয়ে বেশি ভাড়াটে খুনির উপস্থিতি মতিঝিল থানা এলাকায় — ১০৬ জন। এরপর বৃহত্তর মিরপুরে ৪২, মোহাম্মদপুরে ৩৯, কদমতলীতে ৩৪, শ্যামপুরে ২১ এবং নিউমার্কেট থানা এলাকায় ২০ জন। এই তালিকাভুক্তদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধে ১০ থেকে ৪৩টি পর্যন্ত হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও অস্ত্র মামলা রয়েছে। তারা কিছুদিন পরপর অবস্থান বদলায় এবং হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়।
কুখ্যাত শুটারদের রেকর্ড
তালিকাভুক্ত শুটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা রয়েছে ভাষানটেকের রূপচাঁদ মিয়ার বিরুদ্ধে — ৪৩টি। একই এলাকার শুটার বাবুলের বিরুদ্ধে ৩৪টি, রামপুরার 'ভাগিনা তুষার'-এর বিরুদ্ধে ২২টি, তেজগাঁওয়ের মন্টু জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ২০টি এবং ভাষানটেকের 'বুকপোড়া সুজন'-এর বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা রয়েছে।
একের পর এক টার্গেট কিলিং
গত এক বছরে রাজধানীতে ভাড়াটে শুটার দিয়ে ঘটানো উল্লেখযোগ্য হত্যাকাণ্ডগুলো হলো:
-
৮ জানুয়ারি — কারওয়ান বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির
-
২১ মার্চ — গুলশানে ব্রডব্যান্ড ব্যবসায়ী সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমন
-
২৫ মে — মধ্য বাড্ডায় গুলশান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল আহসান সাধন
-
১০ নভেম্বর — পুরান ঢাকায় আদালতের কাছে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন
-
১৭ নভেম্বর — পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া
-
১১ ডিসেম্বর — শ্যামবাজারে মসলা ব্যবসায়ী আবদুর রহমান ভূঁইয়া
সব ঘটনাতেই অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
নির্দেশদাতারা নেপথ্যে, শুটাররা সামনে
তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে নির্দিষ্ট নির্দেশদাতা রয়েছে। গোলাম কিবরিয়া হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামি জনি ভূঁইয়ার আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান মামুনের নির্দেশেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়। দুবাই থেকে আসা শুটার 'পাতা সোহেল' ওরফে মনির হোসেনসহ কয়েকজন পেশাদার খুনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুছাব্বির হত্যার নির্দেশ দেয় 'দীলিপ ওরফে বিনাশ' নামের এক শীর্ষ সন্ত্রাসী। ডিবি এ ঘটনায় আবদুর রহিম, জিন্নাত, আব্দুল কাদের, রিয়াজ ও বিলালকে গ্রেপ্তার করেছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, রহিম ও জিন্নাত সরাসরি গুলি চালায় এবং উভয়ই টাকার বিনিময়ে হত্যায় অংশ নিয়েছিল।
সুমন মিয়া হত্যার নির্দেশদাতা বাড্ডা-গুলশান এলাকার সন্ত্রাসী মেহেদী। তার নির্দেশে ওয়াসির মাহমুদ সাঈদ ওরফে বড় সাঈদ-এর নেতৃত্বে চার থেকে পাঁচজনের একটি দল এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, ভাড়াটে খুনিদের পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, শনাক্তকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং ইতিমধ্যে কয়েকটি মামলায় অভিযুক্তদের আটক করা হয়েছে।

































