যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, অন্যদিকে পরে তিনি জানান, ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ চলায় পরিকল্পিত হামলা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
তবে সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের জন্য ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। দেশটির কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, আবার হামলা হলে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়াতে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে।
নিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, চলতি বছরের প্রথম দফার যুদ্ধে ইরান দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রস্তুতি নিয়েছিল। সে কারণে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে কিছুটা সংযম দেখায়, যাতে দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চালানো সম্ভব হয়।
তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। ইরানের ধারণা, এবার সংঘাত হবে স্বল্প সময়ের হলেও অনেক বেশি তীব্র। বিশেষ করে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সমন্বিত হামলার আশঙ্কা করছে তেহরান।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন দফার সংঘাতে ইরান প্রতিদিন কয়েক ডজন থেকে শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। এতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনাগুলো বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের তেলক্ষেত্র, শোধনাগার ও বন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এতে সংঘাত এড়িয়ে চলতে চাওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোও সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার চাপের মুখে পড়তে পারে।
গত কয়েক সপ্তাহে ইরানের সরকারি ঘনিষ্ঠ মহলে বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে কড়া বক্তব্য দেখা গেছে। তেহরানের অভিযোগ, আমিরাত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় সহায়তা করেছে।
ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক মেহদি খারাতিয়ান এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা চাইলে আমিরাতকে আবার উটের যুগে ফিরিয়ে নিতে পারি। প্রয়োজন হলে আবুধাবিও দখল করব।’
যদিও এসব বক্তব্যকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করা হচ্ছে, তবু বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের ভেতরের চিন্তাভাবনার প্রতিফলন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা শিল্প অঞ্চলে বিস্ফোরণের পর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলি দেখছেন বিদেশি শ্রমিকেরা। ৩ মার্চ ২০২৬
আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক আলি আলফোনেহ বলেন, ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কাই এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে কিছুটা সংযত রাখার অন্যতম কারণ।
এ ছাড়া ইরান লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্ত করা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত এলাকার কাছেই প্রণালিটি অবস্থিত।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবেও চাপ তৈরি করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রকে একসঙ্গে দুটি সামুদ্রিক রুট নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে।
মেহদি খারাতিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে বাব আল-মান্দেবে জাহাজ চলাচল সীমিত করার পদক্ষেপ নিতে পারে তেহরান।
তবে এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়ন সহজ নাও হতে পারে। হুথিরা আঞ্চলিক যুদ্ধ হলে ইরানকে সমর্থনের ঘোষণা দিলেও আগের সংঘাতে তারা তুলনামূলক সতর্ক অবস্থানে ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, সীমিত সামরিক সক্ষমতা ও অস্ত্র মজুদের বিষয়টি তখন তাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল।
















