আলীকদম উপজেলায় স্থানীয়দের সংরক্ষণ করে রাখা একটি পাড়াবনের গাছ নিধনে প্রশাসনের অভিযানের পরও গাছ কাটা বন্ধ হয়নি। গেল এক সপ্তাহ ধরে কেটে রাখা গাছগুলো আবার রাতের আঁধারে গাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আলীকদম-থানচি সড়কের ২৩ কিলো এলাকায় ম্রোদের সংরক্ষণ করে রাখা একটা পাড়াবনের গাছ অবৈধভাবে দুই বছর ধরে কেটে নিয়ে যাচ্ছিল আলীকদমের এক ব্যবসায়ী। এ নিয়ে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর অভিযান চালায় স্থানীয় প্রশাসন ও বনবিভাগ।
অভিযানে ৩০০ ঘনফুট কাঠ জব্দ করা হয় এবং পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির কাজের ব্যবহৃত একটি এক্সক্যাভেটর নষ্ট করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া গাছ ব্যবসায়ী আবু হান ইসমাইলের বিরুদ্ধে বনবিভাগের মামলা করা হয়। পরে সেনাবাহিনীর একটি দলও ঘটনাস্থলে গিয়ে কেটে রাখা গাছ পুড়িয়ে দেয়।
কিন্তু অভিযানের ১৮-২০ দিন পর আবারও পাড়াবনে ঢুকে কেটে রাখা গাছগুলো রাতের আঁধারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পামিয়া পাড়ার বাসিন্দা লাইরু ম্রো বলেন, “ইলেকট্রিক করাত দিয়ে পাড়াবনের গাছ কেটে স্তূপ করে রাখছিল তারা। প্রতিদিন বড় ট্রাকে করে গাছগুলো আলীকদমে নিয়ে যেত। সাংবাদিকরা নিউজ করার পর অভিযানের কারণে কিছুদিন বন্ধ ছিল। গত এক সপ্তাহ ধরে কেটে রাখা গাছগুলো আবার রাতের আঁধারে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
“প্রথমে রাতে একটা করে গাড়ি ঢুকে। কয়েকদিন হল এখন দিনে-দুপুরেও নিয়ে যাচ্ছে। রোববার বিকালেও একসঙ্গে দুইটা গাড়ি ঢুকছে। সকাল থেকে সারাদিন গাছ টানছে তারা। ইউএনও এবং আলীকদম সেনা জোনকে জানানো হয়েছে। অভিযান চালানো হবে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে কেটে রাখা গাছগুলো প্রকাশ্যেই নিয়েই যাচ্ছে তারা।”
লাইরু ম্রো বলেন, “আজকে (রোববার) বিকালেও ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে। আলীকদমে এমপি আসছেন। তিনি সেখানে ব্যস্ত আছেন বলে জানালেন।”
এ বিষয়ে জানতে লামা বনবিভাগের চৈক্ষ্যং রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলামকে মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি।
এ ব্যাপারে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনজুর আলম বলেন, “এ বিষয়ে রোববার সকালেও সেনাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাকে ধরার জন্য লোক লাগানো হয়েছে বলল। তারা সিরিয়াসভাবে নিয়েছে তাকে ধরবে। তারা বলেছে, আলীকদম-থানচি সড়কের ডিম পাহাড়ে তাদের ২৬ কিলো এলাকার ক্যাম্পে এত লোকজনও থাকে না। আলীকদম সদর থেকে টিম পাঠাতেও সময় লাগবে। তাদের একটা স্পেশাল টিম অ্যাসাইন করা হয়েছে তাকে ধরার জন্য।
“আমার খেয়াল আছে, তাকে যদি ধরতে পারে বনবিভাগের আর কোনো মামলায় যাব না। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এক দেড় বছরের জেল দিয়ে দেব। কারণ বনবিভাগের আদৌ কী হবে, না হবে অনিশ্চিত। এখন আর্মি সহায়তা এজন্য লাগবে। কারণ, ২৩ কিলো এলাকা অনেক দূরে। তারা যদি দুয়েক দিনের মধ্যে অভিযান চালাতে পারে আমি অবশ্যই মোবাইল কোর্ট করে দেব।”
পাহাড়িদের কোনো একটি পাড়ায় তার আশপাশে অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চলে একটি নির্দিষ্ট বড় এলাকা নিয়ে বনভূমি সংরক্ষণ করে রাখা হয়। মৌজা প্রধান হেডম্যান ও গ্রামপ্রধান কারবারিরা এটাকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের দ্বারা পরিচালিত এই সংরক্ষিত বনকে পাড়াবাসীরা বলে থাকেন ‘পাড়াবন’।
পাড়াবন অনেকের কাছে ‘পাড়াবাম’ ও ‘রিজার্ভ বন’ নামেও পরিচিত। এই পাড়াবনের প্রাকৃতিক সম্পদগুলো সামাজিকভাবে ব্যবহার করা হয়। তাই এই পাড়াবনের মালিকানা সম্পূর্ণ সামাজিক। পাড়াবন সামাজিক মালিকানা হলেও বড় গাছ কাটার জন্য বনবিভাগের অনুমতি লাগে। বনবিভাগের অনুমতি ছাড়া কারও বড় গাছ কাটার নিয়ম নেই।
সূত্র: বিডি নিউজ

















