জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে ১২ ফেব্রুয়ারি। এই গণভোটকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভাজনও স্পষ্ট—জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল প্রকাশ্যে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে, কিছু দল নীরব অবস্থানে আছে, আবার কেউ কেউ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরব। এদিকে সরকারি পর্যায় থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচার শুরু হওয়ায় সাধারণ মানুষের কৌতূহলও বেড়েছে। এসবের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বড় প্রশ্ন—গণভোটে সংস্কারপন্থী অবস্থান ‘হ্যাঁ’ জয়ী না হলে জুলাই সনদ ও চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ কী হবে?
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘হ্যাঁ’ পরাজিত হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসবে আইনি কাঠামোয় নয়, রাজনৈতিক বাস্তবতায়। তাদের ভাষায়, ফল নেতিবাচক হলে সরকারের সংস্কার উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক শক্তি কমে যাবে, এবং নতুন সংসদের সামনে পুরো প্যাকেজ সংস্কার একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে তারা এটাও বলছেন, গণভোটের ফল ‘না’ হলেও কাগজে-কলমে জুলাই সনদ বাতিল হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না; বরং তখন সংস্কারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে নতুন সংসদের সদিচ্ছা, ভেতরের ঐকমত্য এবং জনচাপের ধারাবাহিকতার ওপর।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারি বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট পরাজিত হলে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন হবে না—এমনটাই তার ধারণা। তাঁর মতে, এতে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক গতিপথও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, “যেভাবেই হোক ‘হ্যাঁ’কে জয়যুক্ত করা হবে”—এই ধারণার পেছনে তিনি সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোটপক্ষে মাঠে নামার বিষয়টিও যুক্ত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেছেন, আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাবের প্রশ্নও আলোচনায় রয়েছে এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি. মাইলামের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বাইরের সমর্থন থাকলে সংস্কারের দিকে প্রক্রিয়া এগোবে বলেই মনে করেন অনেকে। তাঁর বক্তব্যে বিএনপির ৩১ দফার প্রসঙ্গও এসেছে—সেটিকে তিনি বড় সংস্কার প্রস্তাব হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তবে জুলাই সনদকে তুলনামূলকভাবে ‘বেশি সংস্কার’ বলেও মন্তব্য করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক শিক্ষক ড. রাশেদ আলম ভূঁইয়া আরও কড়া ভাষায় আশঙ্কার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পরাজিত হলে যাঁরাই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের মধ্যে স্বৈরাচারী প্রবণতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকবে এবং দেশে আবারও সরকার পতনের আন্দোলন, গণ অভ্যুত্থান, সংঘাত-সংঘর্ষ বাড়তে পারে। তিনি এমনকি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার আশঙ্কাও তুলে ধরেছেন এবং বলেছেন, গণভোটকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি ও প্রপাগান্ডা ছড়ানোর প্রবণতা থাকতে পারে। তিনি আরও বলেন, সংস্কার প্রস্তাব বাধাগ্রস্ত হয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে রাজনৈতিক মেরুকরণও নতুনভাবে ঘটতে পারে—যেখানে একদিকে আওয়ামী লীগ বেশি ফোকাসড থাকবে, অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি আলাদা অবস্থানে যেতে পারে; আর বিএনপি যদি বিষয়টি সময়মতো ‘অ্যাড্রেস’ করতে না পারে, তাহলে বিভিন্ন গোপন শক্তি তাদের রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, ‘হ্যাঁ’ পরাজিত হলে সেটা মানুষের জন্যও ক্ষতি, দেশের জন্যও ক্ষতি এবং বিএনপির জন্যও ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, বিএনপির ৩১ দফার বহু অংশে জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সংস্কারের সঙ্গে খুব বেশি মৌলিক পার্থক্য নেই; তাই জাতীয় স্বার্থে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন—এমন যুক্তি দিয়ে যে পরে সংসদে ৩১ দফার আলোকে সংস্কার বাস্তবায়নের সুযোগ থাকবে।
তবে সব রাষ্ট্রবিজ্ঞানীই যে ‘হ্যাঁ’ হারলে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হবেই—এ বক্তব্যে একমত, তেমন নয়। তাদের যুক্তি হলো, বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের উল্লেখ থাকলেও এটি নিয়মিত শাসনপ্রক্রিয়ার অংশ নয়। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান থাকলেও রাজনৈতিক সনদ বা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট বাধ্যতামূলক—এমন কোনো কথা নেই, যদি না তা আলাদা আইনে নির্ধারিত থাকে। ফলে গণভোটে ‘না’ ভোট পড়লে জুলাই সনদ আইনগতভাবে বাতিল হবে না—এমনটাই তাদের ব্যাখ্যা। তবে তারা স্বীকার করছেন, এর রাজনৈতিক বৈধতা বড় ধাক্কা খেতে পারে, এবং তখন নতুন সংসদের পক্ষে পুরো সনদ একযোগে বাস্তবায়ন করা বাস্তবসম্মতভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষর থাকলেও এটি কোনো আইনি চুক্তি নয়—এটি মূলত রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তাই জনগণের সরাসরি সমর্থন না মিললে দলগুলো চাইলে এই অঙ্গীকার থেকে সরে আসতে পারে বা নতুন বাস্তবতা সামনে এনে অবস্থান বদলাতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংস্কারের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে সংসদের ভেতরে ঐকমত্য গড়ে ওঠার ক্ষমতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের ধারাবাহিক চাপ।
এ আলোচনায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার উদাহরণও সামনে এসেছে। ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইমরান আহম্মদের মতে, গণভোটে পরাজয় মানে সংস্কারের চূড়ান্ত অবসান নয়—তবে এর গতি ও কাঠামো বদলে যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ২০২২ সালে চিলিতে নতুন সংবিধান গণভোটে বাতিল হওয়ার পর দেশটি পুরো প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করতে বাধ্য হয়েছিল। আবার ২০১৬ সালে কলম্বিয়ায় শান্তিচুক্তি গণভোটে বাতিল হলেও পরে সংসদ সংশোধিত চুক্তি পাস করেছিল। তাঁর মতে, এখানে হার-জিতের হিসাবের চেয়ে বেশি জরুরি হলো—একটি সক্রিয় ও কার্যকর সংসদ, যে সংসদ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার এগিয়ে নিতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের বক্তব্য দাঁড়াচ্ছে—গণভোটে ‘হ্যাঁ’ হারলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনিভাবে সব শেষ হয়ে যাবে না, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে। এরপর সংস্কারের পথ কোন দিকে যাবে—তা নির্ভর করবে নির্বাচনের পর কে ক্ষমতায় আসে, সংসদে কী ধরনের সমঝোতা তৈরি হয় এবং জনগণ সংস্কারের দাবিকে কতটা ধারাবাহিকভাবে সামনে রাখে।



































