• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১ পৌষ ১৪৩২, ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৭

অ্যাম্বুলেন্স


অমর মিত্র
প্রকাশিত: অক্টোবর ১১, ২০২১, ০৪:১৬ পিএম
অ্যাম্বুলেন্স

অবিনাশ মজুমদার অবসর নিয়েছে আট বছর। চাকরিতে তার বয়স কমানো ছিল দেড় বছর। জন্ম ভাদ্র মাসে, কিন্তু হায়ার সেকেন্ডারি সার্টিফিকেটে তা পৌষ। জানুয়ারির সাত তারিখ। কী করে হলো, তা জানে না অবিনাশ। স্কুলে ভর্তির সময় এই কাজ করা হয়েছিল মনে হয়। যে তারিখে ভর্তি, সেই তারিখই জন্মতারিখ। কয়েক বছর কমানো থাকলে চাকরির ক্ষেত্রে সুবিধে পাবে অবিনাশ, তাই পেয়েছিল। দেড় বছর বেশি চাকরি করেছে। সরকারি চাকরি করত অবিনাশ। সেই চাকরি ছিল মফস্বলে। জেলায় জেলায়। প্রমোশনে প্রমোশনে অবিনাশ জেলার সহকারী কর্তা হয়ে উঠেছিল। রিটায়ার করে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা থেকে। চাকরিতে যাদের সঙ্গে ওঠাবসা ছিল, তারা ক্রমশ দূরে সরে গেছে। কত নিকটের বন্ধু ছিল শুভময়, কার কাছে শুনল সে বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে। হৃদ্যন্ত্র বিকল হয়েছিল বেঙ্গালুরুতে। তার ছেলে হাসপাতালে দেওয়ায় বেঁচে গেছে। কথাটা সে শুনেছিল নির্মলের কাছে। নির্মল ব্রহ্মচারী। নির্মল মাঝে মাঝে তাকে ফোন করে। একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলেছে অবিনাশ। কিন্তু ঠিকমতো অপারেট করতে পারে না। বুঝতে পারে না, এত মানুষ কী করে সেখানে। সবাই কিছু কিছু লেখে। কত রকম বাদ-প্রতিবাদ, সত্য-অসত্য লেখে মানুষ। ছবি দেয়। বাড়িতে কী রান্না হয়েছে, সেই ছবিও দেয়। পিঠাপুলির সিজনে তার ছবি। ইলিশের সিজনে ইলিশের ছবি। আবার কোনো পুরুলিয়া জেলায় পলাশ ফুল ফুটলে সেই ছবিও আসে। অবিনাশ মাঝে মাঝে তা দেখে। দেখাই সার। কী লিখবে সে? লেখার কিছু নেই। তবে নির্মল ব্রহ্মচারী লেখে। কী লেখে, না মৃত্যু সংবাদ। তাদের সার্ভিসের কেউ মারা গেলে লেখে নির্মল।

“আমাদের সহকর্মী, বীরভূম জেলার সিউড়ি নিবাসী সুপ্রকাশ রায়, গত একুশে ডিসেম্বর কলকাতা থেকে সিঙ্গাপুর যাবে বলে এয়ারপোর্টে পৌঁছে হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করেন। সঙ্গে তার পুত্র, পুত্রবধূ এবং স্ত্রী ছিলেন। তারা সিঙ্গাপুর যাচ্ছিলেন ছেলের কাছে। ছেলে সেখানে উঁচু পদে চাকরি করে। ব্যক্তিজীবনে তিনি সুখী মানুষ ছিলেন। যাহোক, এয়ারপোর্ট থেকেই কলকাতার সুখ্যাত হাসপাতালে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পথেই তার প্রয়াণ হয়। তিনি আমাদের সংগঠনের অনেক কাজ করেছেন। নির্লোভ এবং সৎ মানুষ ছিলেন। প্রথম জীবনে অনেক কষ্ট করে জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।” 

অবিনাশ চিনত না সুপ্রকাশ রায়কে। সমস্ত পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে থাকা সকল সহকর্মীকে তার পক্ষে চেনা সম্ভব নয়। নির্মল ব্রহ্মচারী চেনে সকলকে। নির্মলের কাছ থেকে অনেকের পরিচয় পায় অবিনাশ। সে থাকে টালা পার্কের সামনে। হাজার বর্গফুট ফ্ল্যাট বাড়িতে। স্বামী-স্ত্রী। অবিনাশের ছেলে একটা মেয়েকে বিয়ে করে দিল্লি চলে গেছে। বাবা-মায়ের খোঁজ তেমন নেয় না। অবিনাশের ইচ্ছে হয় একবার দিল্লি যায় সুমিতাকে নিয়ে। সেই কবে, যখন ছেলের বয়স সাত-আট, দিল্লি গিয়েছিল। কালীবাড়িতে ছিল। দিল্লি, আগ্রা, মথুরা, বৃন্দাবন, ফতেপুর সিক্রি ঘুরে এসেছিল, তারপর আর যায়নি। যায়নি যে তা নয়। সরকারের কেস লড়তে সুপ্রিম কোর্টে গেছে কয়েকবার। থেকেছে বঙ্গভবনে। কাজ করে ফিরে এসেছে। এখন যেহেতু ছেলে দিল্লিতে থাকে, যাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভির বউ তাদের প্রতি অতি শীতল। 

এখন দিল্লিতে। তার আগে ছিল সুইজারল্যান্ডে দুবছর। ওরা কলকাতায় আসে, অবিনাশ শুনেছে মাত্র। শুনেছে অভির এক কলিগের কাছ থেকে। সে অবিনাশকে ফোন করত আগে। ইদানীং থেমে গেছে। অবিনাশের দিল্লি যাওয়ার উপায় নেই। সুমিতা কান্নাকাটি করবে। নিষ্ঠুর পুত্র। কলকাতায় আসে, কিন্তু ওঠে শ্বশুরবাড়ি বালিগঞ্জে। তারা কলকাতার অভিজাত পরিবার। স্ট্যাটাসে মানায় না অবিনাশের সঙ্গে। ও পক্ষ বিয়েই দিতে চায়নি। বিয়ে হলো এবং তারা ভিন্ন হয়ে গেল। অভির শ্বশুরবাড়ি বেজায় ধনী। অবিনাশ সারা জীবন টাকা জমিয়েছে। জমিয়ে একটা ফ্ল্যাট কিনতে পেরেছে। ছেলেকে ম্যানেজমেন্ট পড়াতে পেরেছে। এখন এই টালা ছাড়া অন্য কোথাও বিশেষ যায় না। বেড়াতে যেত আগে, এখন থেমে গেছে। অবসরের আগে আন্দামান, তারপর উত্তরবঙ্গ গিয়েছিল। সুমিতা আর যেতে চায় না, কারণ অভি। অভিষেক। সুমিতার মনে হয়, অভিষেক একদিন ছুটে আসবে। আসবেই। তখন যদি তারা কলকাতায় না থাকে, ফিরে যাবে সকলে। অভির সঙ্গে তার কন্যাটিও থাকবে। নাতনি কত বড় হলো, অবিনাশ জানে না। সুমিতা নাতনিকে দেখতে চায়। কিন্তু বড় ঘরের মেয়ে অবিনাশের মতো সাধারণ, অতি সাধারণ মানুষের সংসর্গে আসতে দিতে চায় না তার সন্তানকে।

এমন এক কাহিনি অবিনাশ পড়েছিল একটা উপন্যাসে। ছেলে বেঁচে নেই। নকশাল করত। পুলিশ গুলি করে মেরে দিয়েছিল। কিন্তু মা জানে ছেলে বেঁচে আছে। ছেলে ফিরবে। মা কিছুতেই বাড়ি ছেড়ে যেত না। পাশের বাড়িতেও না। একটা সময় নিজের ঘরই ছাড়ত না। বিছানা থেকেই নামতে চাইত না, অভি এসে ফিরে যাবে। সেই ছেলেটির নাম কি অভি ছিল? হয়তো, হয়তো না। আগে অবিনাশ গল্প-উপন্যাস খুব পড়ত। এখন মনে হয়, আর পড়া দরকার নেই। আগে দুই প্যাকেট সিগারেট ছিল তার নিত্য সঙ্গী, এখন সেই অভ্যাস চলে গেছে। আচমকা ছেড়ে দিয়েছিল। তখন অভি ম্যানেজমেন্ট পড়তে ঢুকেছে বেসরকারি ইনস্টিটিউটে। কত দিন হবে তা, অন্তত বছর পনেরো আগে। তার ইসিজিতে একটা গোলমাল বেরিয়েছিল। বন্ধু চিকিৎসক রিপোর্ট দেখে আরও কিছু টেস্ট করতে বলেছিল। টেস্ট করার আগেই সে ত্যাগ করেছিল সিগারেট। দোকানের সামনে গিয়ে ফিরে এসেছিল না কিনে। বই পড়ার ক্ষেত্রে এমন কিছু হয়নি। কিন্তু তার আকর্ষণ নেই প্রায়। খবরের কাগজ আসে বটে, কিন্তু কতটা পড়ে, পড়ে না তা বলতে পারবে না। অবিনাশ কিছু খবর জানে মোবাইল ফোনে ফেসবুক খুলে। যেমন আজ জেনেছে সিনেমার এক হিরো মারা গেছেন সামান্য বয়সে। ৬১। তার চেয়ে সাত-আট বছরের ছোট হবে। হিরো জেল খেটেছিলেন কুকাজের জন্য। হিরো রাজনীতি করে কুখ্যাত হয়েছিলেন। তবু হিরো তো। অবিনাশ জানল খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। অবিনাশ এখন চায়ের দোকানে। চা-দোকানি বাবলু বলল, টালা ব্রিজে গাড়ি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সে কী, কেন? অবিনাশ জিজ্ঞেস করল। 

ব্রিজ ভেঙে পড়ার অবস্থা হয়েছে। 

বেশি তো বয়স না ব্রিজের। অবিনাশ বলল, জন্মাতে দেখেছি। 

কাগজে লিখেছে ছাপ্পান্ন বছর। বাবলু বলল। 

অবিনাশ আটষট্টি। তার যখন বারো, ব্রিজ চালু হয়েছিল। ব্রিজ যখন ভেঙে পড়ে, আরও ছয় বছর আগে সে সাত। কিন্তু তার কোনো স্মৃতি নেই পুরোনো সেই কাঠের ব্রিজের। ১৯৬৩-৬৪ সালে এই টালা পার্কে একটি বাণিজ্য মেলা বসেছিল। অবিনাশের মনে আছে সেই মেলায় দেখেছিল ব্রিজ ভেঙে পড়ার সাদা-কালো ছবি। অপুর সংসার ছবিতে অপু ও অপর্ণা সংসার পেতেছিল যে বাড়িটিতে সেই বাড়ি রেললাইনের ওপারে। সিনেমায় দেখেছিল অবিনাশ। গুডস ট্রেনের রেল-ইয়ার্ড, ধোঁয়া ওঠা স্টিম ইঞ্জিন, তীব্র হুইসেলের শব্দ...। বিটি রোডের দিকের ব্রিজটিও ছিল অপুর সংসারে। অন্ধকারে অপু লম্বা সংলাপ বলতে বলতে নেমে আসছে ব্রিজ থেকে। অবিনাশ ব্জিজ্ঞেস করল, সব গাড়ি বেলগাছিয়া ব্রিজ দিয়ে যাবে?

আর কোনো পথ নেই, বিটি রোডের সব গাড়ি এই পথে যাবে। বাবলু বলল। 

বাবলু আর অবিনাশ এক বয়সী। অবসরের পর আবার বাবলুর সঙ্গে অবিনাশের কথা আরম্ভ হয়েছে। যত দিন চাকরি করেছে, কলকাতায়, জেলায়-মফস্বলে...বাবলুর খোঁজই রাখত না অবিনাশ। সময়ই হতো না। বাবলু ছিল তার শৈশবের সঙ্গী। টালা পার্কে একসঙ্গে ক্রিকেট, ফুটবল, পায়ে হেঁটে শ্যামবাজারের সিনেমা হলে ৬৫ পয়সায় লাইন দিয়ে রাজকাপুরের সঙ্গম, উত্তম সুপ্রিয়ার শুধু একটি বছর কিংবা পূর্ণশ্রী সিনেমা হলে আমেরিকা বাই নাইট দেখার কথা এখন মনে পড়ে। বাবলুর কিছুই হলো না। ফ্যাক্টরি ওয়ার্কারের ছেলে তাই-ই হয়। কোন জুট মিলে কাজ করত। মিল উঠে যাওয়ায় পার্টি ধরে বাজারের গায়ে ফুটপাতে এই চায়ের দোকান। বাবলু আর তার বউ দুজনেই চালায়। বাবলুর ছেলে একটা কাজ করে। উচ্চমাধ্যমিক অবধি পড়েছে। সে যায় বিটি রোড ধরে টিটাগড়। তার খুব অসুবিধে হবে না। কথাটা বলে বাবলু হাসল, ওদিকে টানা চলে যাবে ব্যারাকপুর, ব্রিজ নেই, ডানলপ ব্রিজ তো মাথার ওপর দিয়ে গেছে, পড়লে মাথার ওপর ভেঙে পড়তে পারে, কিন্তু পড়বে না, ওসব সায়েবদের করা। 

অবিনাশ আবার বলল, আমি কোনো দিকে দিকে যাই না।

শ্যামবাজার যাও না অবিনাশ? বাবলু জিজ্ঞেস করল।

না, কী কাজে যাব? অবিনাশ বলল।

আমি অবশ্য হেঁটে যাই, শ্যামবাজারে হেঁটে যাওয়া আর বাসে যাওয়া এখন এক হয়ে যাবে। বাবলু বলল, সাত টাকা বেঁচে যায়। 

তখন ফলওয়ালা বুড়ো ইমতিয়াজ বলল, আমার ব্যবসা লাটে উঠবে স্যার, আমি এক শীতে এলাম, তখন দুই বিরিজই ছিল, এমন দেখতে হবে ভাবিনি। 

অবিনাশ বলল, তুমি কবে এলে? 

শীত ছিল, আমি মধুগঞ্জ থেকে হাসপাতালে এলাম, তারপর কলকাতা থেকে আর যাইনি। 

ফল ব্যবসা কর তো? অবিনাশ জিজ্ঞেস করে, কবে থেকে কর? 

তখন থেকে, আমি ফল আনতে যাই বড়বাজার ফলপট্টি, বিরিজ পার না হলে হবে? ট্রাম বন্ধ হয়ে খুব ভুগান্তি হচ্ছে, এরপর একটা বিরিজ বন্ধ হলে আমার ব্যবসা যাবে। 

অবিনাশ জিজ্ঞেস করল, ট্রাম কবে বন্ধ হলো?

আপনি কি টেরাম রাস্তায় যান না? বহুতদিন স্যার, আগে ফলের বস্তা নিয়ে চিৎপুরের টেরাম ধরে বেলগাছিয়া এসে নামতাম, এখন বাসে খুব ঝামেলা। 

খেয়াল করিনি, কিন্তু এদিকের ব্রিজ তো ঠিক আছে, ট্রাম বন্ধ হলো কেন?

বেহালার বিরিজ ভেঙে যেতে আর নেই, টেরামের ওজন বেশি, হামাদের এ বিরিজ কমজোরি হয়ে যাবে, তাই বন্ধ করে দিল।

মাঝেরহাট ব্রিজ ভেঙে পড়েছে বছর দুই। তারপর কি ট্রামে অবিনাশ শ্যামবাজার যায়নি? গেছে মনে হয়। কিন্তু ইদানীং অনেক দিন ব্রিজ পার হয়ে, আর জি কর হাসপাতাল পার হয়ে, বাগবাজার ক্যানেল ব্রিজ পার হয়ে শ্যামবাজার যায়নি সে। তাই-ই তো। কেন যায়নি? সব এই বেলগাছিয়া-পাইকপাড়ায় মিলে যায়। অবিনাশ উঠল। ট্রাম বছর দেড় বন্ধ। লাইন কংক্রিট করতে করতে তা ওপরে পিচ ঢেলে লাইন বন্ধ করে দিয়েছে ট্রাম কোম্পানি। ফলওয়ালার নাম ইমতিয়াজ। থাকে ট্রাম লাইনের ওপারে মুসলমান বস্তিতে। ট্রামই নেই, তো ট্রাম লাইনের ওপার থাকবে কীভাবে? 

অবিনাশ বুঝতে পারছিল না কী হতে যাচ্ছে। বাবলু বলল, দুই ব্রিজের গাড়ি এক ব্রিজ দিয়ে গেলে কী হতে পারে ভাবো অবিনাশ ভাই।

অবিনাশ মজুমদার বলল, না, আমি ব্রিজের ওপারে যাই না, আমার দরকার পড়ে না। 

এ কী কথা হলো বাবু, হাসপাতাল আছে ওপারে, বিরিজ না পার হলে হাসপাতাল যাবেন কী করে?

অবিনাশ চুপ করে থাকে। হাসপাতাল যাবে কীভাবে? যাবে না। তার ছেলে অভিষেক এবার না আসার আরও যুক্তি খুঁজে পাবে। একটা ব্রিজ বন্ধ, একটা ব্রিজ দুই ব্রিজের গাড়ি নিয়ে কি সচল থাকবে, না হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে।

 দুই

আবীরা ফোন করল দ্যুতিমানকে, ব্রিজে এত জ্যাম, আটকে আছি, কখন পৌঁছব জানি না।

কোন রাস্তা দিয়ে আসছ? দ্যুতিমান জিজ্ঞেস করল।

গাড়ি বেলগাছিয়া দিয়ে ঘুরিয়ে দিয়েছে, নড়ছে না কিছু, টালা ব্রিজ বন্ধ। আবীরা বলল। 

বন্ধ করে দিল আজ থেকেই?

যেকোনো দিন ভেঙে পড়তে পারে, পরশুই তো জানিয়েছিল, তুমি ভুলে গেলে? 

জানতাম, কিন্তু এত খারাপ যে বন্ধ করে দিতে হবে এত তাড়াতাড়ি, ভাবিনি। 

আবীরা বলল, তুমি এই ব্যাপার নিয়ে খবরের কথা ভাবনি, এইটা মাঝেরহাট ব্রিজের মতো হয়ে যেত, বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে, এখন শুধু প্রাইভেট কারে ছাড়, কিন্তু কয়েকটা করে ছাড়ছে, বাস ঘুরে বেলগাছিয়া দিয়ে আসছে।

দ্যুতিমান বলল, দুই ব্রিজের ভার এক ব্রিজ নেবে, পারবে?

সরকার জানে, পিডব্লিউডির সেক্রেটারি মনীশ আগরওয়াল, যোগাযোগ করতে হবে।

আমাদের বিষয় নয়। বলল দ্যুতিমান।

আমাদেরই বিষয়, রাস্তা, সেতু একটা জায়গা বদলে দেয়, তাহলে সেতু ভেঙে গেলে বিপরীত কিছু হবে।

এই নিয়ে কি তেলিভিশনে একটা প্রোগ্রাম হবে, আড্ডা, ফেসবুক লাইভ? 

জানি না, দেখি না, ভালো লাগে না। আবীরা বলল।

বাড়ি ফিরে কী কর? দ্যুতিমান জিজ্ঞেস করল।

কবিতা লিখি, পড়ি...। আবীরা মৃদু গলায় বলল, কবে চালু হবে ব্রিজ সেটা জানা দরকার, মানে কত দিন লাগবে নতুন ব্রিজ গড়ে উঠতে? 

আমি থাকি নরহরিদাস রোডে, আমি কী বলব, এদিকের মাঝেরহাট ব্রিজই কবে চালু হবে জানি না।

আবীরা বলল, দ্যুতিমান ব্রিজের জন্য আমাকে কি ভোরবেলা বেরোতে হবে? 

বেলগাছিয়ায় নেমে মেট্রো ধরতে পারতে। 

বেলগাছিয়া আসতেই তো আসল সময়টা খেয়ে নিল, বুঝতে পারিনি, এখন ব্রিজের ওপরে, লেট হয়ে গেল, কী করে অফিস যাব এরপর?

দ্যুতিমান বলল, এস, পরামর্শ করা যাবে, ফোনে এসব কথা হয় না। 

আবীরা চব্বিশ, দ্যুতিমান আটাশ। এক অফিসে কাজ করে। তাদের একটা ম্যাগাজিন আছে। ইংরেজি। সাহিত্য এবং সংবাদ থাকে। তা বাদে তারা ইংরেজি বই ছাপে। বই বিদেশে পাঠায়। প্রায়ই বুক লঞ্চিং সেশন, বুক রিডিং সেশন সংগঠিত করতে হয়। দ্যুতিমান বুক এডিটর। তার স্বপ্ন লেখক হবে। সে এই বুক কোম্পানি ছাড়বে না। আবীরা বাংলায় লেখে। দ্যুতিমান তাকে ইংরেজি লিখতে প্রলুব্ধ করে। আবীরা মাথা নেড়েছে। নিজের ভাষাই ভালো জানি না, ইংরেজিতে লিখব কীভাবে?

দ্যুতিমান বলে, চেষ্টা কর, ফিকশন লিখতে চেষ্টা কর, আমি এডিট করে দেব, অনেক টাকা। 

আবীরার কানে হিয়ারিং কর্ড। আবীরা ফরিদা পারভীনের লালনগীতি শুনছে। উপায় নেই। আজ ফিরবে কখন রাতে। দ্যুতিমানদের বেহালাও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বছর দুই। দ্যুতিমান আসলে বাঁকুড়ার ছেলে। বেহালায় ভাড়া থাকত। মাঝেরহাট ব্রিজ যেদিন ভেঙে পড়ে, সেদিন তারা দুজনেই ছুটি নিয়েছিল। আবীরার জন্মদিন ছিল সেদিন। মে মাসের ২১ তারিখ। দ্যুতিমান আর সে সেদিন সিনেমা দেখবে ঠিক ছিল। তারপর ডিনার করে ফিরবে। দ্যুতিমান আসতেই পারেনি। দুপুরে ব্রিজ ভেঙে পড়েছিল। অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল সব রাস্তা। বাস লরি প্রাইভেট কার, অ্যাম্বুলেন্স সব দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। দ্যুতিমান বলে, সেদিন কত কত অ্যাম্বুলেন্সের আর্তনাদ শুনেছিল সে। মাঝেরহাট ব্রিজ পার হয়ে বড় বড় তিন হাসপাতাল। প্রায় কুড়িটি অ্যাম্বুলেন্স আগে পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ে সাইরেন বাজিয়েই চলেছিল। জায়গাটা যেন যুদ্ধক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছিল। দ্যুতিমান বলেছিল তাই। সে একটা ওয়ার পিকচারে অমনই দেখেছিল। বোমা বর্ষণের পর আহত নিহত, রক্তস্নাত মানুষদের নিতে আসছে অ্যাম্বুলেন্স, আসতেই পারছে না। আবীরার কানের ভেতরে অ্যাম্বুলেন্সের আর্তনাদ প্রবেশ করছে। ফরিদা পারভীনের গান ভেঙে যাচ্ছে, কেউ যেন আছড়ে ভাঙছে তা, কেউ যেন হাতুড়ি, গাঁইতি, শাবল দিয়ে ভেঙে ফেলছে সংগীত মূর্ছনা, হো হো হো, ভয়ানক উল্লাসে আর্তনাদ মিশে যাচ্ছে, আকাশচুম্বী টাওয়ারে উড়ন্ত বিমান ঢুকিয়ে দিয়ে ভেঙে দিচ্ছে লালনের সুর, বম্বিং করে ভেঙে দিচ্ছে মানুষের ঘরবাড়ি। 

আবীরা গান থামিয়ে বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। বাসের পাশেই একটি অ্যাম্বুলেন্স। তীব্র, তীক্ষ্ণ স্বরে সাইরেন বাজিয়ে বাজিয়ে পথ চাইছে। মাথায় বনবন করে ঘুরছে নীল আলো। দেড় হাজার মিটার পেরোলেই ব্রিজ নেমে যাবে হাসপাতালের মুখে। অ্যাম্বুলেন্স এইটুকু রাস্তা পার হতে পারছে না। যে আর্তনাদ শুরু করেছিল যাত্রা আরম্ভে তা শেষই হচ্ছে না। সবুজ শার্ট নীল প্যান্ট পরিহিত সিভিক ভলান্টিয়ার ঘুরছে ফাঁকফোকর বের করতে যেখান দিয়ে ইনটেসিভ কেয়ার ইউনিটসমেত মস্ত অ্যাম্বুলেন্সকে পার করিয়ে দেওয়া যায়। একটা ছিদ্র পেলেই হবে যেন। মন্ত্রবলে দেহ সংকুচিত করে অ্যাম্বুলেন্স পিঁপড়ের মতো ঢুকে যাবে সেই ছিদ্রপথে। কিন্তু তা-ও নেই। মনে হয় ডানা ছাড়া যাওয়ার উপায় নেই। আবীরা আবার কানে কর্ড গুঁজল। চোখ বন্ধ করল। যখন পৌঁছানোর পৌঁছাবে। সে শ্যামবাজার পৌঁছে কী করবে, ভাববে। অফিস যাবেই না। দ্যুতিমানকে ডেকে নেবে। চলো সিনেমা দেখি। কিংবা ঘুরি। অনেক দিন গঙ্গা দেখিনি। মিলেনিয়াম পার্ক, নৌকো, চক্ররেল, ইডেন গার্ডেন, ভিক্টোরিয়া, ইলিয়ট পার্ক...। কলকাতা এইটুকু। মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা কিংবা শপিং মলে কেনাকাটা। উইন্টার গারমেন্ট এসে গেছে। পুজোর পরপরই আসে। এত সব ভাবতে ভাবতে আবীরার চোখ ঢুলে এল। সে গানের সুরে ভেসে গেল। নদী দেখতে পেল। গঙ্গা কিংবা অন্য কোনো নদী, পদ্মা, যমুনা, শিপ্রা, সিন্ধু, নর্মদা...। পাহাড় দেখতে পেল। অযোধ্যা পাহাড় কিংবা ময়ূর পাহাড়, জয়ন্তিয়া পাহাড়, দার্জিলিং পাহাড়, ভুটান পাহাড়...। জঙ্গল দেখতে পেল, ডুয়ারস কিংবা ঝাড়গ্রাম, জঙ্গলমহল, লালগড়, শালবনি, জয়পুর...। লালমাটি দেখতে পেল। ধূ-ধূ প্রান্তর। নদীর ভাঙন, শিলাবতী, গনগনির ডাঙা... যেথা ইচ্ছে সেথা যাওয়া যায়। অবারিত আকাশ অবারিত মাঠ। তখন ফোন বাজতে লাগল। আবীরার চটকা ভেঙে গেল। দ্যুতিমান ডাকছে, কত দূর?

ব্রিজে বসে আছি, পাশে অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়েই চলেছে। আবীরা বলল। 

দ্যুতিমান বলল, তোমাকে একটা পথ খুঁজে বের করতে হবে আবীরা।

গতকাল তো বেশ গিয়েছিলাম, আধা ঘণ্টা বেশি লেগেছিল, আজ কী হলো বলতে পারব না। 

এক দিন আধা ঘণ্টা এক দিন এক ঘণ্টা, কোনো দিন দেড় ঘণ্টা হয়ে যেতে পারে। দ্যুতিমান বলল, আমি তো তিন মাস বাদে শকুন্তলা পার্ক ছেড়েছিলাম, তিন মাস যা ভুগেছিলাম। 

আবীরা বলল, তোমার মতো তো রেসিডেন্স চেঞ্জ করতে পারব না, সম্ভব না। 

দ্যুতিমান শকুন্তলা পার্কে ভাড়ায় থাকত। এখন নরহরি দাস রোডে একটি ওয়ান রুম ফ্ল্যাট কিনে নিয়েছে। সেকেন্ড হ্যান্ড। আচমকা পেয়ে গিয়েছিল। নরহরি থেকে টালিগঞ্জ মেট্রো পনেরো-বিশ মিনিট অটোয়। দ্যুতিমান সিদ্ধান্ত নিতে পারে ভালো। অফিসের কাজেও তাই। দ্যুতিমানের অনেক সিদ্ধান্তে কোম্পানির লাভ হয়েছে। হ্যাঁ, মেট্রো থেকে বেরিয়ে অটোর জন্য দাঁড়াতে হয়। অটোর লাইন ফেরার সময় খুব বড় হয়। দ্যুতিমান হাঁটতে আরম্ভ করে ইচ্ছে হলে। বলে, এক একদিন হেঁটেই তার ফ্ল্যাটে পৌঁছে যায়। একা হাঁটতে হয় না। সঙ্গে বেশ কয়েকজন থাকে। তারা কাছেপিঠের লোক। বেশ লাগে কোনো কোনো দিন। গল্প করতে করতে যাওয়া। আবার বিরক্ত লাগে ক্লান্ত থাকলে। আবীরা সেই ওয়ান রুম, ডাইনিং স্পেস, সোফাকামবেড ও ডাইনিং টেবিলে গিয়েছিল একদিন। ভেবেছিল ঘুপচির ভেতরে হবে। ঘরে আলো থাকবে না। বাতাস থাকবে না। গুমোট অস্বাস্থ্যকর হবে। হ্যাঁ, তাই-ই। সকালে নাকি পুবের রোদ আসে এক চিলতে। ফ্ল্যাট খুঁজছিল দ্যুতিমান। দক্ষিণ থেকে উত্তরে, সিঁথি, বরানগরে চলে আসবে বলেছিল। তাদের তো বিয়েটা করতে হবে। আজ বা কাল। কিংবা পরশু। অন্ধকার ওয়ানরুম ফ্ল্যাটে নড়াচড়া করা যায় না। একজনের জন্য চলতে পারে, দুজনের জন্য কিছুতেই নয়। আর একটা ঘর থাকা দরকার। 

দ্যুতিমান হ্যালো হ্যালো করছে। আবীরা সাড়া দিল, শুনছি, বলো।

সিঁথি, বরানগর, বিটি রোডে তো ফ্ল্যাট কিনতে পারব না তাহলে। দ্যুতিমান বলল। 

কম করে পাঁচ বছর ভোগান্তি, পাঁচ বছরের আগে তো নতুন ব্রিজ হবে না।

তাহলে বরং দমদম দেখা যায়, মেট্রো রয়েছে।

পারবে না, অনেক দাম। আবীরা বলল, আমাদের দিকে বরং দাম পড়ে যাবে এখন, কিনে নিলে আখেরে লাভ হবে।

পাঁচ বছরে ব্রিজ হবে?

হওয়ার তো কথা। আবীরা বলে। 

তুমি এই পাঁচ বছর চাকরি করবে কীভাবে? দ্যুতিমান জিজ্ঞেস করল। 

আবীরা জানালা দিয়ে দেখল অ্যাম্বুলেন্স জায়গা পেয়ে গেছে। বাস নড়ছে। এবার সব গাড়ি, বাস, প্রাইভেট কার, লরি, ম্যাটাডোর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে হর্ন বাজাতে শুরু করেছে। সবাই যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। খোলা হাইওয়ের স্বপ্ন দেখছিল। লম্বা পিচ ঢালা রাস্তা চলে গেছে, দূর, অতিদূর। দুপাশে শস্যক্ষেত্র, হলুদ হয়ে গেছে ধানমাঠ। ইঞ্জিনের ধোঁয়া ছাড়ছে পুরোনো লরি। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে। হু হু হাওয়ার রাস্তা। কণ্ঠস্বর উঠছে। সবদিক থেকে কেমন একটা আনন্দধ্বনি শুনতে পাচ্ছে যেন আবীরা। কলকল শব্দ শুনতে পাচ্ছে আবীরা। স্রোতের শব্দ। বন্ধনমুক্তির শব্দ। বাঁধ ভেঙে গেছে। সে বলল, ছেড়েছে।

আপাতত রেসিডেন্স চেঞ্জ করতে হবে তোমাকে, না হলে চাকরি করবে কীভাবে?

মাথা খারাপ বিটি রোডের সব বাসিন্দা, ডানলপ অবধি সব বাসিন্দা টালা ব্রিজ বেলগাছিয়া ব্রিজের এপারে এসে ঠাঁই খুঁজবে? পালিয়ে আসবে বিটি রোড, বরানগর টবিন রোড, ঘোষপাড়া, সিঁথি থেকে? 

আহা সকলে কেন, তুমি? বলল দ্যুতিমান।

বরং তুমি চলে এস টালা ব্রিজ পার হয়ে বিটি রোডের ধারে, নতুন ফ্ল্যাট কদিন বাদেই কমে পাবে, আমরা একসঙ্গে অফিস যাব দেরি করে। বলতে বলতে আবীরা দেখছিল ব্রিজ সচল হয়েছে। ব্রিজটা একটা অতিকায় কাছিমের পিঠের মতো। নিদ্রা ভেঙেছে তার। ট্রাম চলত এই ব্রিজে। ট্রাম চাপতে অনেক দিন সে এই পথে এসেছে। তারপর মেট্রো করে দমদম। উফ! ট্রাম আর ডাবল ডেকার বাস নেই এই শহরে। ভাবা যায়। দ্যুতিমান লাইন কেটে দিয়েছে। বাস ব্রিজ থেকে নেমে আর জি কর হাসপাতালের কাছে দাঁড়িয়ে। আবার সব থেমে গেছে। এখানে দু-তিনজন ট্রাফিক পুলিশ, একজন সার্জেন্ট। বাঁ দিকের কলকাতা স্টেশন থেকে বড় বাস, প্রাইভেট কার বেরোচ্ছে, ডান দিকের হাসপাতাল থেকে বেরোচ্ছে মানুষের পর মানুষ, হলুদ ট্যাক্সি, একটি শববাহী গাড়ি। ফুলে সাজানো গাড়ির ভেতরে বৃদ্ধের মৃতদেহ। শববাহী গাড়ি সাইরেন বাজাচ্ছে। যে মানুষটি চিরকালের মতো এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তাকে জায়গা করে দাও। ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে লুঙ্গি আর শার্ট এক বৃদ্ধ নেমে পড়েছে রাস্তায়। চিৎকার করে ট্যাক্সির হর্ন থামাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স অ্যাম্বুলেন্স… চিৎকার করে ডাকছে, পেশেন্ট পেশেন্ট। শববাহী গাড়িও সাইরেন বাজাচ্ছে। দুই সাইরেন একাকার হয়ে যাচ্ছে। আবীরা দেখল শববাহী গাড়িটি জায়গা পেয়ে যাচ্ছে। তাকে জায়গা করে দিচ্ছে সিভিক ভলান্টিয়ার। বুড়ো লোকটা তবু চিৎকার করছে, অ্যাম্বুলেন্স ফাস্ট, অ্যাম্বুলেন্স ফাস্ট...। 

মৃতের পিছু পিছু চাকা গড়িয়ে এগিয়ে চলেছে তাদের গাড়ি। আবার ছেড়েছে গাড়ি। সাইরেন বাজিয়ে মৃতদেহ তাদের গাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আবীরা আজ অফিস যাবে না, আবীরা কি যাবে মৃতের সঙ্গে শ্মশানের দিকে। গঙ্গার ঘাট, হরিবোল। শহর থেকে বিদায় দিতে যাবে শহরের এক নাগরিককে? 

তিন 

এই এলাকায় রেললাইনের ওপর দুটি সেতু। টালা ব্রিজ এবং বেলগাছিয়া ব্রিজ। দুই ব্রিজের ওপারেই, দুই ব্রিজ থেকে নেমেই হাসপাতালের প্রবেশপথ। ব্রিটিশ আমলে ছিল কারমাইকেল হাসপাতাল। বাবার মুখে শুনেছে অবিনাশ। তার ঠাকুরদা ওই হাসপাতালে মারা গেছেন। তার বাবা বাড়িতে কদিন ভুগে চলে গেছেন। তার শ্বশুর মশায় মারা গিয়েছিলেন ওই হাসপাতালে। ওখানে মৃত্যুর তালিকা কম নয়। আবার তার সন্তান অভিষেকের জন্মও ওই হাসপাতালে। তার জন্ডিস হয়েছিল বছর বত্রিশে। তখন অভির জন্ম হয়নি, তার বিয়ের সবে দেড় বছর। আর জি কর হাসপাতালে চিকিৎসা করে, সুস্থ হয়ে ফিরেছিল সে। ইমতিয়াজের কথামতো হাসপাতালটা দরকার। তার জন্য ব্রিটিশ আমলের বেলগাছিয়া সেতুর স্বাস্থ্য ভালো থাকা দরকার। অথচ দুই ব্রিজের ভার এক ব্রিজ নিলে, ব্রিজ ভালো থাকবে না। বেঁকে যাবে পিঠ। ব্রিজ পারছে কী করে? 

অবিনাশের বউ সুমিতা বলল, খুব খারাপ হলো, টিভিতে দেখাল গাড়ি নড়ছে না, তাহলে সে আর আসতে পারবে না।

বিদেশে আছে, আসবে দেশে এলে। অবিনাশ মিথ্যে বলল। বলে ঢোঁক গিলল। সুমিতা মিথ্যাটা ধরে ফেলবে। মুখখানি আরও ম্লান হবে ওর। তবু অবিনাশের মনে হয় ছেলেকে একটা ফোন করে। ফোন করে ব্রিজের কথাটা বলে দেয়। কিন্তু ব্রিজের সঙ্গে অভির আসার সম্পর্ক কোথায়? অভি আসবে বিমানবন্দর থেকে। বিমানবন্দর থেকে যশোর রোড ধরে, বেলগাছিয়া, টালা পার্ক। অভিকে কোনো ব্রিজই পার হতে হবে না। অভি আবার চলে যাবে বিমানবন্দর দিয়েই। অভিকে বাড়ি আসতে ভিআইপি রোডের বড় সেতু পার হতে হবে। তেঘরিয়া থেকে উঠে দমদম পার্কের কাছে এসে নামবে। তারপর লেকটাউন থেকে ঘুরে যশোর রোড হয়ে বাড়ি। ভিআইপি রোডের উড়াল পুল একেবারে নতুন। এখনো তার কোনো খুঁত ধরা পড়েনি। খুঁত আছে কি না, পরে জানা যাবে। যশোর রোডে বাঙ্গুর অ্যাভিনিউ পেরিয়ে কিছুটা গিয়ে একটি উড়ালপুল আছে, সেখানে কয়েকবার খুঁত ধরা পড়ে, ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বড় গাড়ি উঠছে না। বাস, ট্রাক নিষিদ্ধ। 

অবিনাশ শুনতে পাচ্ছে এই শহরের সেতুগুলো ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। সব সেতুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছে ইঞ্জিনিয়াররা। কয়েক বছরের ভেতরে পরপর ভেঙে পড়ল দু-তিনটি সেতু, কয়েকটা ভেঙে পড়বে পড়বে এমন অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছে। সুমিতা বিড়বিড় করতে থাকে, ব্রিজ যখন ভেঙে গেছে, আসার উপায় নেই, আসতে হবে না। 

আসবে। অবিনাশ আবার বলল। 

কই আসছে, ব্রিজ ভাঙা থাকলে আসে কী করে? 

চুপ করে থাকে অবিনাশ। টিভির সামনে বসে। টিভিতে একটা ধারাবাহিক সে দেখে, ময়নামতি। দেখেই। দেখতে দেখতে ঢুলতে থাকে। তখন সুমিতা ব্যালকনিতে চেয়ারে বসে থাকে। কাজের এক মেয়ে আছে। সে সকাল বিকেল এসে রান্না থেকে সব কাজ করে দিয়ে যায়। অবিনাশ গরম করে নেয় কোনো দিন। নাহলে সুমিতা। সুমিতা কিচেনে যেতে যেতে বলে, টিভির আওয়াজ কমিয়ে দাও, কলিং বেল শুনতে পাবে না। 

কলিং বেল মানে অভি আসবে। অভি হয়তো এসেছে। বালিগঞ্জে আছে। কাল ভোরে হয়তো চলে যাবে বিমানবন্দর হয়ে দিল্লি কিংবা জেনেভা। অভি ভুলেই গেছে তাদের কথা। অবিনাশ বলল, অনেক দিন সিনেমা দেখিনি, যাবে?

না, সারা জীবন অনেক সিনেমা দেখেছি, আর দেখতে হবে না। সুমিতা বলল।

অবিনাশ বলল, চন্দননগর যাবে?

কী করতে যাব? সুমিতা জিজ্ঞেস করল।

তুহিন ফোন করেছিল। 

তুহিন সুমিতার পরের ভাই। যেতে বলে, যাওয়া হয় না। চন্দননগরে দুদিন থেকে এলেই হয়। যে ছেলে আসবে না, তার জন্য অনর্থক অপেক্ষার দাম নেই। অবিনাশ বলল, চন্দননগর যেতে ব্রিজ পার হতে হবে না, আমরা এদিক দিয়েই চলে যেতে পারব ডানলপ ব্রিজ, দক্ষিণেশ্বর, বালি হয়ে।

ওদিকেও গঙ্গার ওপরে ব্রিজ আছে। বলল সুমিতা।

আছে তো কী হয়েছে? অবিনাশ পাল্টা জিজ্ঞেস করল। 

ভেঙে পড়বে গঙ্গার ভেতর। তীক্ষ্ণ গলায় বলল সুমিতা। 

কী সব বলছ! বিরক্ত হয় অবিনাশ, ভেঙে পড়বে কেন?

ভেঙে কি পড়ছে না, ফারাক্কায় ব্রিজ বানাতে বানাতে পড়ে গেল, ইঞ্জিনিয়ার মরে গেল। সুমিতা কথাটা বলে উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে। 

নকশায় নাকি গোলমাল ছিল। অবিনাশ বলল। 

নকশা সব ভুল, যাব না, ভেঙে পড়বে কোনটা কেউ জানে না, মনে হয়, ডানলপের ফ্লাইওভার বন্ধ ছিল ওই কারণে। 

অবিনাশ বলল, চেকআপের জন্য, মেরামত করে আবার খুলে দিয়েছে।

সুমিতা বলল, ভয় করে, যদি মাঝেরহাট ব্রিজের মতো ভেঙে গঙ্গায় পড়ে যায় ব্রিজটা, অভি আমাদের খুঁজেই পাবে না, কদিন বাদে টালার ব্রিজটা অমন হতে যাচ্ছিল তো। 

অবিনাশ যুক্তি সাজাতে পারল না। টালার হেমন্ত সেতু নাকি বন্ধ না করলে একদিন আপনাআপনি ভেঙে পড়ত রেললাইনের ওপর। সুমিতা বলল, ভেঙে পড়ুক, না পড়ুক, আমরা কোথাও যাব না, এখানেই থাকব। অবিনাশ বুঝতে পারছিল সুমিতাকে নিয়ে বেরন যাবে না। সুমিতাকে রেখেও যাওয়া যাবে না। পথঘাটে একা একা চলতে ইদানীং ভয় হয়। রাস্তায় এত গাড়ি যে রাস্তা পার হয়ে বাবলুর চা-দোকানে যেতে কত সময় লাগে। পার হতে বুক ঢিবঢিব করে। গাড়ি একবার ছাড় পেলে থামতে চায় না। তীব্র বেগে ঘুরে মুখ দেখায় পার্কের কাছের বাঁক থেকে। কত সব বিচিত্র নম্বরের বাস এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। সেই সব বাসের খোঁজই রাখত না অবিনাশ। ডানকুনি থেকে গড়িয়া, আরামবাগ, শিয়াখালা, চণ্ডীতলা... থেকে ধর্মতলা, চন্দননগর থেকে করুণাময়ী… তারা কত দিকে যেতে পারত এখান থেকেই। কিন্তু সুমিতা যাবে না। সুমিতা জেনে বসে আছে কোনো না কোনো ব্রিজ ভেঙে পড়বেই। কলকাতা শহরের ভেতরেও যে উড়ালপুলগুলো আছে সেগুলোর অবস্থাও নাকি ভালো নয়। উড়ালপুল ভেঙে পড়ার ঘটনা কি ঘটেনি? ইএমবাইপাস, ভিআইপি রোড জুড়েছে যে উড়ালপুল তা ভেঙে পড়েছিল তো। সুমিতা সব খবর রাখে। টেলিভিশন, খবরের কাগজ তাকে কত খবর দেয়। একদিন, তা প্রায় দেড় মাস বাদে, জিনস ও ফুল সোয়েটার, কাঁধে ব্যাগ, ব্যাগে ক্যামেরা, আবীরা ও দ্যুতিমান নেমে পড়ল বাস থেকে। দ্যুতিমানকে আগে আমরা দেখিনি। আবীরার কথা মনে আছে। সে ছিল একটা বাসের ভেতর, তখন ভাদ্রের শেষ, সবে ব্রিজ বন্ধ হয়েছে। এখন কলকাতায় শীত। 

দ্যুতিমান কৃষ্ণকায়, মাথায় চুল নেই তাই একটা হ্যাট থাকেই। কালো সায়েব। সাড়ে পাঁচ ফুট। তার মনে একটা নভেল লেখার পরিকল্পনা চলছে অনেক দিন। ভাষা ইংরেজি, পটভূমি কলকাতা। তার জন্য কলকাতাকে আরও চেনা দরকার। তারা আসছিল সিঁথি থেকে। সিঁথিতে একটা টু-রুম ফ্ল্যাট পেয়েছে দ্যুতিমান। সে নরহরি দাস রোড ছেড়ে এসেছে। জানালার পাশেই একটা বহুতল ওঠার কাজ শুরু হয়েছিল। সামান্য আলোটুকুও শুষে নেবে সেই কংক্রিট। সিঁথির ভেতরে ফ্ল্যাটের ভাড়া বেশি না। সেই ফ্ল্যাটে এসে উঠেছে কোচবিহারের আবীরা। নম নম করে তারা বিয়ে সেরেছে। আবীরা প্রস্তাব দিয়েছিল, মানুষ কেমন আছে তা জেনে একটা রিপোর্ট লেখা যায় আমাদের জার্নালে, হতে পারে না কি? 

হতেই পারে সেতুবন্ধে একরকম থাকে মানুষ, সেতু ভেঙে গেলে জীবন বদল হয়ে যায়। দ্যুতিমান সায় দিয়েছে প্রস্তাবে। 

তারা টালা পার্কের সামনে নেমে ইতিউতি ঘুরতে ঘুরতে বাবলুর চায়ের দোকানে গেল। বাবলু বলল, অবিনাশ ভাইয়ের কাছে যান, ব্রিজ ভাঙা শুরু হতে অবিনাশ আর বেরোতে চায় না আর, রাস্তা পার হতে ওর ভয় করে, আমারও ভয় করে ভাই। 

আমারও ভয় করে স্যার, কিন্তু রাস্তা তো দেখতে হবে, এত গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, ডেডবডির গাড়ি, বরযাত্রীর গাড়ি, বর কনের গাড়ি... বুড়ো ফলওয়ালা ইমতিয়াজ বলল, নিদ আসে না স্যার। 

আবীরার কি চেনা লাগে? বুড়ো হয়ে গেলে সব মানুষ একরকম! সে ইমতিয়াজের কথা শুনতে শুনতে জিজ্ঞেস করল, অবিনাশবাবুর বাড়ি কোথায়? 

বাবলু বলল, ইমতিয়াজ ভাই, তুমি নিয়ে যাও, চা-দোকান বন্ধ করা যাবে না।

ইমতিয়াজের ব্যবসা প্রায় বন্ধ। দুদিন ডালা নিয়ে বসে তিন দিন বসে না। সেই তিন দিনের এক দিন আজ। ব্যবসা বন্ধ করে চা-দোকানে এসে বসে থাকে আবার রাস্তায় নেমে পড়ে গাড়ির জট ছাড়ায় যখন পুলিশ হিমশিম খেয়ে যায়। পুলিশের কর্তা এলে সবুজ জামা পরা ছেলে সিভিক ভলান্টিয়ার দুজন পাগল হয়ে ছুটোছুটি করতে থাকে। তখন ইমতিয়াজ চাচা ভরসা হয়। 

আবীরা ও দ্যুতিমানকে নিয়ে বুড়ো ইমতিয়াজ অবিনাশের ফ্ল্যাটের ডোরবেল বাজায়। কে কে কে, করতে করতে সুমিতা এসে দরজা খুলল। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল তিনজনের দিকে। সুমিতার পেছনে অবিনাশ। ফিটফাট। শার্ট, ফুল সোয়েটার, ট্রাউজার, সুমিতা আটপৌরে শাড়িতেই।

এয়ারপোর্ট থেকে আসা সুবিধে, কোনো ব্রিজ না পার হলেও চলে। বলল অবিনাশ মজুমদার।

এঁরা কিছু কথা বলবে স্যার, আমি যাই, রাস্তায় গাড়ি আটকে গেছে, কেউ নিয়ম মানে না। ইমতিয়াজ বলল।

না, এস, এঁরা কারা?

এঁরা কি দিল্লির লোক? জিজ্ঞেস করল সুমিতা।

এঁরা কি সুইজারল্যান্ডের লোক? জিজ্ঞেস করল অবিনাশ। 

নো স্যার, আমরা ‘জার্নাল টু থাউজ্যান্ড’ থেকে আসছি, এইটার ওয়েব ভার্সন আছে, প্রিন্ট ভার্সন ও পাবেন ম্যাগাজিন স্ট্যান্ডে, আপনি কি কোথাও বেরোবেন ভাবছিলেন?

ভাবছিলাম, কিন্তু কোথায় যাব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বলতে বলতে অবিনাশ এগিয়ে এসে তিনজনকে জায়গা করে দিল ভেতরে আসার। সুমিতা একটি কথাও বলেনি। অভির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। এরা কি অভির খবর নিয়ে এলো? নাকি অভিই এলো?

ড্রয়িং স্পেস চমৎকার সাজানো। কোথাও একবিন্দু ধুলো নেই। দেয়ালে বুকসেলফে রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিক, শ্যামল, সুনীল...। কত কবিতার বই। আবীরার গা ছমছম করে উঠল, তার বই! চল্লিশ পাতার বইটি শোভা পাচ্ছে। সে ঘুরে তাকায় দ্যুতিমানের দিকে, ভাবল ডাকে তাকে, দেখায়। আবীরা তো ভুল দেখেনি। আবীরা সেনগুপ্ত, ‘হাওয়া যায় হাওয়া আসে’। ঘুরে ঘুরে বই দেখতে লাগল আবীরা। তখন দ্যুতিমান জিজ্ঞেস করল, আপনারা কেমন আছেন?

ভালো আছি, খুব ভালো আছি, আমরা প্ল্যান করছিলাম কোথাও একটা যাব। অবিনাশ বলল, আমাদের খুব সুবিধে হয়েছে, সব জায়গার গাড়ি বাড়ি থেকে বেরোলেই পাওয়া যাচ্ছে। 

সুমিতা বলল, কী ভালো লাগছে, চা করে আনি? উঠে গেল সুমিতা। যেতে যেতে বলল, আস্তে কথা বলো, টিভি চালিও না, কলিং বেল শুনতে পাবে না, কেউ এসেছে যখন কেউ আসবে ঠিক।

অবিনাশ বলল, আমি তো বলেই ছিলাম সুমিতা, বলেইছিলাম।

আবীরা জিজ্ঞেস করল, স্যার, এসব বই কার?

আমার আমার, সুমিতার সুমিতার, কিন্তু আমাদের পড়া শেষ হয়ে গেছে, তুমি নেবে? 

আবীরা বিষণ্ন হয়। আচমকা মন খারাপ হয়ে যায়। বই পড়া কি শেষ হয়? তার নতুন বই তাহলে পড়বে কে? 

কোন বইটা পছন্দ বলো।

নো স্যার। আবীরা এসে বসল অবিনাশের মুখোমুখি, বলল, আগে কেমন ছিলেন, এখন কেমন আছেন।

অবিনাশ বলল, আগের কথা ভুলে গেছি, ইমতিয়াজ আগে কেমন ছিলাম?

ইমতিয়াজ বলল, আপনি বলুন স্যার।

আমি ভুলে গেছি সব, গতকালের কথাও ভুলে গেছি মিস্টার, গতকাল কেমন ছিলাম জানি না। 

ব্রিজ বন্ধের আগে কেমন ছিলেন স্যার? দ্যুতিমান জিজ্ঞেস করল।

ব্রিজ! ব্রিজের আগে ব্রিজ ছিল না। অবিনাশ বলল, তার আগেও ব্রিজ ছিল না, নাথিং, এখন ভয়ে আছি, খুব ভয় করে রাস্তায় নামলে। 

আপনারা দুজনই থাকেন?

দুজন, না একজন, আমি একজন সে একজন। অবিনাশ বলল, আমাদের ছেলে একজন, তার বউ একজন, তাদের মেয়ে একজন…, সবাই একজন। 

দ্যুতিমান জিজ্ঞেস করল, আপনার কি কোনো কিছু বলার আছে ব্রিজ থাকা না থাকা নিয়ে।

তোমাদের কী বলার আছে শুনি, আচ্ছা একটা কাজ করা যায়, তোমরা রাজি আছ? অবিনাশের কথার ভেতরেই চা নিয়ে এল সুমিতা। ট্রে টি-টেবিলে রেখে সুমিতাও বলল, তোমরা কি রাজি আছ?

কিসে রাজি হব? আবীরা জিজ্ঞেস করল সুমিতাকে। সুমিতা বলল, আমি বলতে পারব না, তিনি জানেন।

তখন অবিনাশ বলল, আমি একবার চণ্ডীতলা যাব, শিয়াখালা, এখান দিয়ে শিয়াখালার বাস যায়, তোমরা রাজি আছ? 

আমরা রাজি না হলেই-বা কী? আবীরা জিজ্ঞেস করে। 

সুমিতার সঙ্গে থাকবে তোমরা, আমি চণ্ডীতলা যাব, শিয়াখালা...।

সেখানে কে থাকে আপনাদের?

জানি না, কেউ না কেউ থাকে, এত মানুষ থাকে, তাদের ভেতরে কেউ থাকে, আমি রেডি, তোমরা থাকো এখানে, দিল্লি বা জেনেভা থেকে কেউ এলে তোমরা যাবে, আমি বহুদিন কোথাও যাইনি, আমি চণ্ডীতলা গেলে কোনো আপত্তি আছে?

ইমতিয়াজ বলল, আমি তাহলে যাই স্যার।

নো, তুমিও থাকবে, সুমিতা এবার রাজি হবে, হবেই। অবিনাশ বলল, চা নাও, যতবার বলবে সুমিতা চা করে দেবে, একজন খুব চা খেত, শেষে ফ্লাস্কে চা ভর্তি করে রেখে দেওয়া হত, সে রাতভর পড়ত, চা খেত, তারপর সে জেনেভা চলে গেল, তারপর সে দিল্লি চলে গেল, তারপর সে বালিগঞ্জ গেল, আর আসতে পারল না, ব্রিজ বন্ধ তাই হয়তো, কিন্তু...। থেমে গেল অবিনাশ, ব্রিজ না ভাঙলে এসে যেত, কিন্তু ব্রিজ ভেঙেই যায়, কত ব্রিজ ভেঙে পড়ছে, কত!

ইমতিয়াজ বলল, এক ব্রিজ দুবার ভাঙল স্যার, আবার হবে, আবার ভাঙবে, আবার হবে, আবার ভাঙবে, রেললাইন থাকবে, টিরেন থাকবে কিন্তু বিরিজ ভেঙেই যাবে, মালগাড়ি ঝমঝম করতে করতে আসবে, মাল খালাসের পর গয়া বারানসী, আজমীর আগ্রা ফিরে যাবে, কিন্তু বিরিজ বন্ধ হয়েই যাবে, আমাদের গাঁ আছে, সেখেনে কানা নদী, নদীর ওপর ব্রিজ নাই, নাই বলে কত লোক এদিকে আসতে পারে না, আবার এলে ফিরে যেতে পারে না। 

তোমার গাঁ কোথায়? অবিনাশ জিজ্ঞেস করল।

কানা নদীর এপারে স্যার, সাতাশ সাল কি তার বেশি হয়ে গেল এখেনে, অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতাল এলাম, আর ফিরে যাইনি। 

আবীরার বুক ঢিবঢিব করল সাতাশ বছর মানে তার জন্মের আগে। দ্যুতিমানের জন্মের বছর। আবীরা দ্যুতিমানের দিকে তাকায়। দ্যুতিমান যেন বুঝেই কথা বদল করে দিল। বলল, সে জানে ব্রিজের নিচে রেললাইনে গুডস ট্রেন এসে যাত্রা থামায়। হুগলি নদী কাছেই। নদীর ধারে বড়বড় ওয়্যার হাউস, সেখানে মাল খালাস করে চাকা ঝমঝম করতে করতে সেই গাড়িগুলো রওনা হয় আবার রওনা হয় ভারতবর্ষের দিকে। 

ইমতিয়াজ বলল, ভাঙাভুঙি হলে ডর লাগে বাবু, তখন অ্যাম্বুলেন্স ডাক অ্যাম্বুলেন্স ডাক, সাতাশ বছর আগে অ্যাম্বুলেন্সে চেপে কলকাতা...। 

কিন্তু সে তো ভাঙেনি, ব্রিজ ছিল না তা। বলল অবিনাশ। 

বিরিজই বলা যায় বাবু, সবকিছু বিরিজই। ইমতিয়াজ মাথা নামায়, ডর লাগে, একদল মানুষ চায় ভাঙাভুঙি হোক, যেদিন বিরিজ ভাঙা শুরু হলো, কত মানুষ গেল, কী দেখবে, না হাতিকে মেরে দিয়া হচ্ছে, বিরিজ ভেঙে দিয়া হচ্ছে, মানুষ চায় তারাও ভাঙে, তারাও হাতুড়ি মারে...। 

তুমি গিয়েছিলে দেখতে? অবিনাশ জিজ্ঞেস করে?

নো স্যার, যাইনি, আমাদের মহল্লার কত মানুষ গেল, আমি যাইনি, ডর লাগে।

অবিনাশ বলল, আমি গিয়েছিলাম।

কী দেখলেন? জিজ্ঞেস করল আবীরা।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নেমে আসছেন ব্রিজ থেকে, লাস্টম্যান যে নেমে এলো। 

তারপর? আবীরা জিজ্ঞেস করল। 

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেমন লাগল, উনি বললেন...।

কী বললেন? দ্যুতিমান জিজ্ঞেস করল। 

মনে নেই। অবিনাশ বলল, আগের কথা সব ভুলে গেছি, এই যে আমার ছেলে অভি সেবার জেনেভা গেল, আর আসেনি, কী বলেছিল মনে নেই। 

আর কী দেখলেন? আবীরা জিজ্ঞেস করে।

মানুষ আনন্দ করছে, খুব আনন্দ, সবাই হাত নাড়ছে, কপালে সিঁদুর একটা মুস্কো মতো লোক বড় একটা হাতুড়ি সামনে রেখে ওঠবস করছে, সেই জল্লাদ, ফাঁসি দিতে সেই-ই যায়। 

হাতুড়ি মারা দেখলেন? আবীরা জিজ্ঞেস করল।

ইয়েস, দেখেছি, হাতুড়িটা তুলল, তারপর নেমে আসতে লাগল, তখন শাঁখ বাজতে লাগল, কাঁসি বাজতে লাগল, ঘণ্টা বাজতে লাগল, কেউ বলল, আল্লাহ হু আকবর, নারায়ে তকদির, কেউ বলল, জয় শ্রীরাম, হে ভগবান, তুমিই সেতুবন্ধ করেছিলে, হায় আল্লাহ, তুমিই যাযাবর জাতিকে ঘর বেঁধে দিয়েছিলে। বলতে বলতে অবিনাশ চোখ মুছতে লাগল, জীবন শেষ হয়ে এলো, এমন দেখতে হবে ভাবিনি, ব্রিজ ভেঙে পড়তে লাগল পরপর, জেনেভা, দিল্লি, বালিগঞ্জ, বাকি সব মিথ্যে...। 

না, মিথ্যে না স্যার, সব সত্যি, দুনিয়ায় সব সত্যি, স্যার আপনার ঘুম হয় রাত্তিরে? ইমতিয়াজ জিজ্ঞেস করল। 

দ্যুতিমান দেখছিল ফ্ল্যাটের দেয়ালে, তার মুখোমুখি হাসছে এক বালক। ওর কথাই বলছে অবিনাশ মজুমদার। ছেলে ত্যাগ করেছে বাবা-মাকে। বাবা মা বসে আছে তার অপেক্ষায়। ঘুম হয় কি? হ্যাঁ ঘুম হয়। অবিনাশ বলল, ঘুম হয়, তার জন্য ঘুমের ওষুধ খেতে হয়। এক ঘুমে রাত শেষ। ঘুম ভাঙলে সাইরেন। সারারাত সাইরেন।

ইমতিয়াজ বলল, অ্যাম্বুলেন্স। ডেডবডি। সাইরেন। 

আপনি শুনতে পান? আবীরা জিজ্ঞেস করল ইমতিয়াজকে, ঘুম হয়? 

মাথা নাড়ে ইমতিয়াজ, বলল, ঘুম হয় না। 

শুনে অবিনাশ বলল, ঘুমের বড়ি খেয়ে শোও, ঘুম হবে। তা শুনে ইমতিয়াজ বলল, তবু ঘুম হয় না, আপনার ঘুম হয় কী করে স্যার? 

কেন কী হলো? ভ্রু কুঁচকে অবিনাশ বলে উঠল, তোমার না হতে পারে, আমার না হবে কেন, ব্রিজ আমার দরকার নেই, কিচ্ছু দরকার নেই, আমি সুমিতাকে নিয়েই চণ্ডীতলা চলে যাব, অনেক চেনা মানুষের দেখা পাব, শুধু বালি ব্রিজ পার হতে পারলেই হয়। 

তখন ইমতিয়াজ আবীরাকে বলল, শুনতে পাচ্ছ দিদি?

কী শুনব, গাড়ির হর্ন? আবীরা ঘুরে তাকিয়ে বলল। 

না, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। ইমতিয়াজ কুণ্ঠিত স্বরে বলল। 

হ্যাঁ, হ্যাঁ, সাইরেন, সাইরেন...। আটকে পড়া অ্যাম্বুলেন্স। মনে পড়ে গেল আবীরার। সেই শববাহী গাড়ি, মনে পড়ে গেল। এই লোকটা কি সেই লোকটা, হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স পার করাচ্ছিল। 

অবিনাশ বলল, ভোরে সাইরেনেই ঘুম ভাঙে, হ্যাঁ, অ্যাম্বুলেন্স...অ্যাম্বুলেন্স, কী সাইরেন, কী সাইরেন! তাকে আটকে দাঁড়িয়ে থাকে বড় বড় পেট্রল ট্যাংকার আর খড়ের লরি। মর্নিংওয়াকে গিয়ে দেখেছে অবিনাশ। একদিন মনে হয়েছিল আগুনের গাড়ি আটকে আছে অ্যাম্বুলেন্স। 

ইমতিয়াজ বলল, সারা দিন সারা রাত অ্যাম্বুলেন্স আটকে থেকে সাইরেন বাজায়, পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে, দাঁড়িয়েই থাকে, রাতে তো পুলিশ থাকে না, অ্যাম্বুলেন্স ওপারের হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে না, নিদ আসে না বাবু, ঘাড়ে করে যদি দিয়ে আসতে পারতাম, আমাকে ছেড়ে দিন স্যার, আমি অ্যাম্বুলেন্স পার করাব, আমার ডিবটি এইটা আছে।

তখন অবিনাশ বলল, তাহলে আমিও যাই, চলো ইমতিয়াজ যাই...।

ইমতিয়াজ একদিন অ্যাম্বুলেন্সে করে এই শহরে ঢুকে আর বের হয়নি। সেই এক শীতে, খুব গোলমাল লাগল, ঘরে আগুন লাগল, বাজারে আগুন লাগল, গাড়িতে আগুন লাগল, কান্না গর্জন মিশে গেল, মানুষ ধেয়ে গেল মানুষের দিকে, তার ঘাড়ে কোপ পড়ল, কিন্তু কই মাছের জান তার, অ্যাম্বুলেন্সে করে রওনা হলো শ্বাস নিতে নিতে। একদল মারল, অন্য দল অ্যাম্বুলেন্সে তুলল। দুদলই এক ভগবানের নাম নিল। কত দিন হয়ে গেল তা। ইমতিয়াজের মনে পড়ে গেল সব। ইমতিয়াজ ঝুঁকে বসে আছে। তার গায়ে ময়লা র্যাপার। মনে হয়, ইমতিয়াজ পিঠ পেতে দিয়েছে। ব্রিজ। কাছিমের পিঠের মতো সেই ব্রিজ, যা দিয়ে শুধু অ্যাম্বুলেন্স পার হবে। শুধু মাত্র অ্যাম্বুলেন্স। ইমতিয়াজের পিঠ দিয়ে সমস্ত রুগ্ণ সেতু যাবে হাসপাতালে। অবিনাশ সেই পিঠে হাত রেখেছে। আবীরা, দ্যুতিমান হাত রেখেছে। ইমতিয়াজ এবার অ্যাম্বুলেন্স পার করাতে যাবে। অবিনাশ ডাকল সুমিতাকে, এস, দেখে যাও।

Link copied!