যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন সমীকরণ


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ০১:০৭ এএম
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফার সমঝোতা চুক্তি পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনও মার্কিন ও ইরানি প্রেসিডেন্ট একটি চুক্তি সই করেছেন।

সমর্থকদের কাছে এটি ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো কাছে এটি উদ্বেগের কারণ হয়েছে।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অন্তর্বর্তীকালীন ওই সমঝোতা চুক্তি সই করেন। এর মধ্য দিয়ে তিন মাসের ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটে।

উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি সেভেন সম্মেলনের ফাঁকে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হয়, যাকে সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক সইয়ের ফলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং বিপুল পরিমাণ জব্দকৃত অর্থ অবমুক্তির পথ প্রশস্ত হয়েছে।

ইরান বছরের পর বছরের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের মুখে থাকার পর, এই চুক্তি দেশটির অর্থনৈতিক পুনর্বাসন ও আঞ্চলিক আধিপত্যকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এতে ইরান লাভবানই হচ্ছে।

তবে ইসরায়েল থেকে শুরু করে উপসাগরীয় দেশ এবং লেবাননের বিভিন্ন গোষ্ঠী, অর্থাৎ পশ্চিম এশিয়াজুড়ে তেহরানের প্রতিদ্বন্দ্বীরা

এই চুক্তিকে 'শতাব্দীর অভিশাপ' বলেই মনে করছে। কারণ, এর ফলে ইরান আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ হবে, আরও বৈধতা পাবে এবং দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।

ইরানকে একঘরে করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়ে উল্টো তেহরানের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার পথ সুগম হওয়ায় ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি দেখছে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও পশ্চিম এশিয়ায় এই নতুন সমীকরণ নিয়ে শঙ্কিত। তারা মনে করছে, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ছাড় আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

১৪ দফা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ৬০ দিন বাড়ানো হয়েছে। এর লক্ষ্য, একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য আলোচনার সুযোগ তৈরি করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সমাধান খোঁজা।

লেবানিজ রাজনৈতিক ভাষ্যকার সারকিস নাউম বলেন, “ওয়াশিংটন এবং তেহরানের জন্য এটি একটি বড় পারষ্পরিক চুক্তি- শতাব্দীর সেরা চুক্তি, যেখান থেকে আর ফেরার উপায় নেই।”

তিনি আরও বলেন, “এই চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকির চেয়ে সফল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, ইরান নিষেধাজ্ঞা কবলিত হয়ে আর কোনও অর্থনৈতিক ধকল সহ্য করার অবস্থায় নেই আর ট্রাম্পেরও নতুন কোনও যুদ্ধ শুরু করার তাড়না নেই।”

ইসরায়েলের জন্য ধাক্কা

ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিজ সমঝোতা চুক্তিটিকে একটি কৌশলগত 'মহাবিপর্যয়' বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, শুরুতে ইরানকে দুর্বল করা বা এমনকি দেশটির শাসনব্যবস্থাকে উৎখাতের লক্ষ্য ‍নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ অভিযান পরিচালনা করেছিল। সেই অভিযানই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানকে স্বীকৃতি দেওয়ার দিকে মোড় নিয়েছে।

ইসরায়েলের ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’ এর জ্যেষ্ঠ গবেষক সিট্রিনোভিচ বলেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইরান সরকারকে উৎখাত করতে গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র উল্টো সেই ইরান সরকারকেই বৈধতা দিচ্ছে এবং শক্তিশালী করছে যাদের পতন আমরা চেয়েছিলাম।”

তিনি বলেন, ইসরায়েলের প্রধান দাবিগুলোর কোনোটিই চুক্তিতে পূরণ হয়নি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর ওপর কোনও বিধিনিষেধ আরোপ হয়নি। এমনকি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলারও সুস্পষ্ট কোনও নির্দেশনা এতে রাখা হয়নি।

তাছাড়া, ইরানের দাবির মুখে লেবাননে ইসরায়েলের অভিযানও এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি কাঠামোর কারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

এর প্রভাব পড়েছে রাজনৈতিক এবং কৌশলগত উভয় দিক থেকেই। এই চুক্তি ইরান নিয়ে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের প্রচারকে দুর্বল করে দিয়েছে। সেইসঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর নেতানিয়াহুর প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও এতে স্পষ্ট হয়েছে।

ইসরায়েলি বিশ্লেষক সিট্রিনোভিজের মতে, ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। এই চুক্তি ইরানের অবস্থান আরও শক্ত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং ইসরায়েলকে আরও কোণঠাসা হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। তিনি বলেন, “সবকিছুই খারাপের দিকে যাচ্ছে এবং এটি কেবল আরও খারাপের দিকেই যাবে।”

চুক্তিটি টিকে থাকলে ইরানই সবচেয়ে সুবিধাজনক ফল পাবে বলেই প্রতীয়মান হয়। আর তা হল যুদ্ধের অবসান, ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি, পুনরায় তেল রপ্তানির সুযোগ এবং পুনর্গঠনের জন্য বিশাল তহবিল প্রাপ্তির সম্ভাবনা। পাশাপাশি ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও এক ধরনের পরোক্ষ স্বীকৃতি পাচ্ছে।

এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের অভিন্ন যেসব লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে- সেগুলো হল: ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো, পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা বা এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব কমানো। ইরানের অবস্থান রূপান্তরের বদলে এই চুক্তি মূলত তাদেরকে আগের অবস্থানেই ফিরিয়ে আনছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এবং প্রথমেই নিহত হয় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা।

পরে এই যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। এতে ইরান ও লেবাননসহ সব মিলিয়ে ৭,০০০’এর বেশি মানুষ প্রাণ হারান। যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়।

লেবাননে ইরানের প্রভাব আরও শক্তিশালী

লেবাননের ক্ষেত্রে এই চুক্তি ক্ষমতার ভারসাম্য ইরানের দিকেই ঠেলে দিয়েছে। চুক্তিটি ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ শক্তি হিজবুল্লাহর ভূমিকা যেমন আরও শক্তিশালী করছে, তেমনি বৈরুত-ইসরায়েল দ্বিপক্ষীয় আলোচনাকে একপাশে সরিয়ে লেবাননকে একটি বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কর্মকাঠামোভুক্ত করছে।

এই চুক্তি লেবাননকে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির আওতায় এনেছে, সেখানে সব পক্ষ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখতে অঙ্গীকারাবদ্ধ।

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন গত সপ্তাহে সতর্ক করে বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতি এবং দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের মতো লেবাননের অভ্যন্তরীন বিষয়ে ইরান বৈরুতের হয়ে দরকষাকষি করতে পারে না।

তবে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো এর উল্টো যুক্তি দিয়েছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি মূলত লেবাননের অবস্থানকেই শক্তিশালী করেছে, কারণ, বিষয়টি এখন অনেক উচ্চপর্যায়ের আলোচনার টেবিলে উঠে এসেছে। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের নিজ নিজ মিত্র হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলকে চাপ প্রয়োগ করে একটি সমাধান এনে দিতে পারে।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। ইরানের হামলার কারণে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা নষ্ট হয়েছে। ইরান যুদ্ধে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। তাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তের সময় তারা ছিল দর্শক। আর এখন এর নেতিবাচক প্রভাব তাদেরকেই বহন করতে হচ্ছে।

উপসাগরীয় সূত্রগুলো বলছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি ইতোমধ্যেই তাদের কৌশলগত চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষার ওপর তাদের আস্থা কমছে, অঞ্চলজুড়ে ইরানকে একটি স্থায়ী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং সংঘাতের বদলে সমঝোতার দিকে ঝোঁকার প্রবণতা বাড়ছে।

তবে ওয়াশিংটনের পশ্চিম এশিয়া ইনস্টিটিউট- এর জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যালেক্স ভাতানকা অবশ্য মনে করেন, বহু বছরের চাপ প্রয়োগের কৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর এই চুক্তি ‘সবচেয়ে কম খারাপ’ বা বাস্তবসম্মত সমাধান বয়ে এনেছে। তার মতে, বৃহত্তর যুদ্ধ হলে উপসাগরীয় অঞ্চল কয়েক দশকের জন্য অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারত।

ভাতানকা মনে করেন, আসল পরীক্ষা এখনও সামনে আছে। যেমন: চুক্তির বাস্তবায়ন, অমীমাংসিত পারমাণবিক আলোচনা এবং এর ফলে সৃষ্ট আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করবে চুক্তির প্রকৃত সাফল্য। তিনি বলেন, “এটি অনেক বড় বিষয়, কিন্তু এখানেই সব শেষ নয়। এটি কেবল শুরু।”


চুক্তির পথে বাধা হতে পারে ইসরায়েল

কিছু বিশ্লেষক ইসরায়েলকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা চুক্তির পথে প্রধান 'ওয়াইল্ড কার্ড' হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রক্রিয়া ভন্ডুল করা ইসরায়েলের পক্ষে সম্ভব না হলেও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ঝুঁকি এখনও আছে, বিশেষ করে লেবানন নিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্র এখন লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েল- দুইপক্ষের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার কথা বললেও ইসরায়েলের কট্টর-ডানপন্থিরা এখনও গোটা লেবাননকে পুড়িয়ে দেওয়ারই দাবি জানাচ্ছেন।

ফলে ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের সমঝোতা চুক্তির টিকে থাকা নির্ভর করছে দুই পক্ষেরই কট্টরপন্থিদের রাশ টেনে ধরা এবং সংযম দেখানোর ওপর। কিন্তু এর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে খুব কমই।

ওদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, “ইরান যুদ্ধের পর ইসরায়েল আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই একঘরে হয়ে পড়েছে।”

অন্য এক কর্মকর্তা বলেছেন, “ইরান যা চেয়েছিল সেটিই পেয়েছে। আমরা হিজবুল্লাহর মতো মিত্রদের পরিত্যাগ করিনি, বরং তাদের জন্য আমরা আলোচনার টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়া এমনকি আবার যুদ্ধে ফিরতেও প্রস্তুত ছিলাম।”

সূত্র: রয়টার্স

Link copied!