ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে রাজধানী তেহরানের রাজপথে লাখো মানুষের শোক মিছিল ও সমাবেশ হলেও, এর আড়ালে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট ও রাষ্ট্রীয় দমননীতিকে ঘিরে জমে থাকা অসন্তোষ এখনো প্রশমিত হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত খামেনির স্মরণে সপ্তাহজুড়ে শোকানুষ্ঠান, জানাজা, মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করেছে ইরানের সরকার। দেশজুড়ে এসব কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নিচ্ছেন।
সরকারি উদ্যোগে পরিবহন, খাবার ও আবাসনের বিশেষ সুবিধা দেওয়ায় অংশগ্রহণ আরও বেড়েছে। দেশটির এক শীর্ষ ধর্মীয় নেতা গত সপ্তাহে বলেন, এসব জনসমাগম ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনগণের সমর্থনের একধরনের গণভোট। সরকারের দাবি, এই উপস্থিতি বিদেশি প্রতিপক্ষ ও অভ্যন্তরীণ সমালোচকদের উদ্দেশে শক্তি ও ঐক্যের বার্তা বহন করছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, শোকানুষ্ঠানে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতিকে বর্তমান ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি নিঃশর্ত জনসমর্থন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ইতিহাসের অধ্যাপক আলী আনসারি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘কেউ যদি মনে করেন এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা, তাহলে ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। এটি একটি জানাজা, আর ইরানিরা জানাজার অনুষ্ঠানে সব সময়ই বড় পরিসরে অংশ নেন।’
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন অংশগ্রহণকারী জানান, তাঁরা রাজনৈতিক আনুগত্য প্রকাশের জন্য নয়; বরং ঐতিহাসিক একটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে বা ধর্মীয় দায়িত্ববোধ থেকেই সেখানে গিয়েছিলেন।
তেহরানের ৬৩ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হামিদরেজা বলেন, ‘আমি সরকারপন্থী বলে এখানে আসিনি। আমার দেশে এত বড় একটি ঘটনা ঘটেছে, তাই ইতিহাসের সাক্ষী হতে চেয়েছি।’
রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে জনসমাগমের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করতে না পারলেও ড্রোনচিত্রে কয়েক লাখ মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে।
বাবার জানাজায় অনুপস্থিত মোজতবা খামেনি, ইরানে নানা গুঞ্জন-জল্পনাবাবার জানাজায় অনুপস্থিত মোজতবা খামেনি, ইরানে নানা গুঞ্জন-জল্পনা
বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশে আদর্শগতভাবে সরকারের প্রতি অনুগত মানুষের হার মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টরপন্থী প্রার্থী সাঈদ জালিলি প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ ভোট পেয়েছিলেন, যা এই সমর্থনের একটি সূচক হিসেবে ধরা হয়।
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর এবারই প্রথম কোনো সর্বোচ্চ নেতার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন হচ্ছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের নেতা খোমেনির জানাজায় সে সময় লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি খামেনি নিহত হলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তাঁর দাফন বিলম্বিত হয়। ইসলামি বিধানে দ্রুত দাফনের নির্দেশ থাকলেও, এই সময়ের মধ্যে সরকার বৃহৎ পরিসরে রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। চার মাসের যুদ্ধ শেষে এটিই প্রথম বড় জনসমাবেশ।
ইরানের শিরাজ থেকে জানাজায় অংশ নিতে আসা ৫১ বছর বয়সী হুশাং দাবিরি বলেন, ‘আমরা যদি আমাদের নেতাদের সম্মান না করি, তাহলে বিশ্বও আমাদের সম্মান করবে না।’
একটি উচ্চ সরকারি সূত্র রয়টার্সের কাছে স্বীকার করেছে, শোকানুষ্ঠানে আসা সব মানুষের উদ্দেশ্য এক নয়। কেউ ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে, কেউ রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন জানাতে এবং অনেকেই নিয়মিত সরকারি সমাবেশে অংশ নেওয়া সমর্থক হিসেবেই এসেছেন।
অর্থনৈতিক সংকট ও ক্ষোভ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চার মাসের এই যুদ্ধ এমন সময়ে শুরু হয়েছিল, যখন দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই বিপর্যস্ত। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নে মানুষের প্রকৃত আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এর পাশাপাশি নানামুখী পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় দেশটির অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
তেহরানের ৩৩ বছর বয়সী গৃহিণী মরিয়ম রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি জানাজায় যাইনি। তাদের সাজানো অনুষ্ঠানের অংশ হব কেন? এমন আয়োজনের বদলে মানুষের অর্থনৈতিক দুর্ভোগের কথা ভাবা উচিত। আমরা কষ্টে আছি।’
অর্থনৈতিক সংকটই ইরানে সর্বশেষ বিক্ষোভের প্রধান কারণ ছিল। পরে সেই আন্দোলন ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পতনের দাবিতে রূপ নেয়। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নে হাজারো বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই বিক্ষোভ দমন করা হয়।
গত বছরের ডিসেম্বরের সেই আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে চলতি বছরও ইরানে কিছু মানুষের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, খামেনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর যুদ্ধের প্রথম দিন তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় উল্লাসধ্বনি শোনা গিয়েছিল।
ইরানের এক সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, যিনি চলমান শোকানুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন, তিনি বলেন—ইরানি সমাজে বিভিন্ন ধরনের মানুষ রয়েছে। সবাই সরকারপন্থী বা সরকারবিরোধী নন। তবে বেশির ভাগ মানুষের প্রধান উদ্বেগ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি।
সমাজের বিভাজন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একদিকে কট্টরপন্থীরা যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে অসন্তুষ্ট, অন্যদিকে সমালোচকেরা আরও স্বাধীনতা চান। একজন বাবার জানাজায় যেমন সব সন্তান একসঙ্গে আসে, কিন্তু দাফনের পর আবার তাদের নিজেদের বিরোধ শুরু হয়, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিও অনেকটা তেমন।’
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত জেনারেল কাসেম সোলাইমানির জানাজাতেও তেহরানের রাজপথে লাখো মানুষের সমাগম হয়েছিল। কিন্তু মাত্র দুই বছর পর পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযানে তখনো শত শত মানুষ নিহত হন।


































