গত ৮ এপ্রিল ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই নতুন করে যুদ্ধে জড়াতে অনাগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে। সামরিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকলেও পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া শান্তি আলোচনা এখনো ভেঙে পড়েনি। তবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক এবং যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে।
মার্কিন প্রশাসন ইরানকে চাপের মুখে রাখতে বিমান ও নৌবাহিনীকে আঘাত হানার উপযোগী অবস্থানে রেখেছে। একই সময়ে ইরানও তাদের সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রেখেছে এবং সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
বিবিসির আন্তর্জাতিক সম্পাদক জেরেমি বোয়েনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সামরিক মুখোমুখি অবস্থান ভুল হিসাব বা ভুল বোঝাবুঝির মাধ্যমে দ্রুত বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপস্থিতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে চায়। বিপরীতে ইরানও জানিয়ে দিচ্ছে, প্রয়োজনে তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও আরব উপসাগরীয় অবকাঠামোতে আঘাত হানতে প্রস্তুত।
দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রথম ধাপ হিসেবে উভয় পক্ষ বর্তমান যুদ্ধবিরতি ধরে রাখা এবং আলোচনার কাঠামো নির্ধারণে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা বিবেচনা করছে। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে উঠেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে সীমিতসংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে। প্রণালি পুনরায় চালু করতে তেহরান কয়েকটি শর্ত দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা অবরুদ্ধ অর্থ ফেরত দেওয়া।
হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব লোহিত সাগরঘেঁষা বন্দর ব্যবহার করছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ওমান হয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে আংশিক তেল সরবরাহ বজায় রেখেছে। তবু বৈশ্বিক বাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি উপসাগরীয় তেলের ওপর আগের মতো নির্ভরশীল নয়, তবুও দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দাম বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতে দ্রুত ফল পাওয়ার প্রত্যাশা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি। ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ধারণা করেছিলেন, বিমান হামলার মাধ্যমে তেহরানের সরকারকে দুর্বল করা সম্ভব হবে। কিন্তু ইরানের প্রতিরোধ প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে।
বোয়েনের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সহজে বেরিয়ে আসার পথ সীমিত। একই সময়ে ইরানও নিজেদের অবস্থান অটুট রাখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রে ইরানবিরোধী যুদ্ধ জনমতেও ক্রমে অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে, ফলে নতুন সামরিক অভিযান রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এদিকে ২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের সময় ইরানের সঙ্গে হওয়া পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে নতুন কোনো সমঝোতায় গেলে তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক তুলনা ও বিতর্কের আশঙ্কা রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এমন পরিস্থিতি এড়াতে চায় বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের নেতৃত্ব বিষয়টিকে অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপ সত্ত্বেও তেহরান তাদের অবস্থান পরিবর্তনে অনাগ্রহী।
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোও এই সংঘাতের কারণে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তাদের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ নির্ভর করছে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর। চলমান উত্তেজনা সেই স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলছে।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান ও কাতার কূটনৈতিক মধ্যস্থতা অব্যাহত রেখেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করেছে এবং ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ সেখানে মোতায়েন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা ইরানি হামলার জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে, তবে তা মার্কিন-ইসরায়েল জোটের অংশ হিসেবে নয়।
সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও পরিস্থিতি এখনো অস্থির। ভুল পদক্ষেপ বা কৌশলগত ভুল হিসাব বড় সংঘাতের জন্ম দিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।











