কোরবানির ঈদের আগের দিন রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর যে ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে, সে ঘটনার তদন্ত চলছে তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছে।
বুধবার ভোরের দিকে হাসপাতালটির ‘পোস্ট অপারেটিভ’ ওয়ার্ডে এই শিশুদের মৃত্যুর ঘটনাটি তদন্ত করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, কাজ করছে পুলিশও।
এক শিশুর বাবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ‘অবহেলার’ অভিযোগে এনে রমনা থানায় মামলা করেছেন।
যেভাবে চলছে তদন্ত
মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার ‘পোস্ট ডেলিভারি’ ওয়ার্ডে ছিলেন ১১ জন প্রসূতি এবং তাদের ছয়জনের ছয়টি বাচ্চা। শিশুগুলোর বয়স এক থেকে তিন দিন। আরো পাঁচটি বাচ্চা চিকিৎসার কারণে আগে থেকেই এনআইসিইউতে (শিশুদের জন্য বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ছিল।
বাচ্চাদের ঠান্ডা লাগছে জানিয়ে রাতে এসি বন্ধ করতে বলেন কয়েকজন মা। ঘণ্টাখানেক পর আবার এসি চালু করা হয়। ভোরের দিকে শিশুগুলোর শ্বাসকষ্টের মত লক্ষণ ও বমিভাব দেখা দেয়। তাদের নেওয়া হয় এনআইসিইউতে। সেখানেই একে একে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়।
আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্ম সচিবকে (বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা) সভাপতি করে গঠিত এই কমিটিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালককে (হাসপাতাল-১) সদস্য সচিব এবং অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালককে (আইন শাখা) সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের আদেশে বলা হয়েছে, কমিটি আগামী তিন দিনের মধ্যে শিশুদের মুত্যুর কারণ অনুসন্ধান এবং প্রতিকারের জন্য করণীয় নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দেবে। এছাড়া প্রয়োজনে নতুন সদস্য যুক্ত করতে পারবে।
বুধবার গভীর রাত পর্যন্ত তদন্ত কমিটি কাজ করছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মূলত তিনটি বিষয়কে প্রধান্য দিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
ওয়ার্ডের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, হাসাপাতালের ওই ওয়ার্ডের যে অবস্থান সেটা অনেকটা ভিতরে। তাই সেখানে নানা ধরনের জটিলতা হতে পারে। সেটি এখুনি বলা সম্ভব নয়।
চিকিৎসায় অব্যবস্থাপনা, কারিগরি ত্রুটি এবং ভিন্ন রকমের গন্ধ-এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে, বলেন তিনি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, “আমরা গতকাল সেখানে গিয়েছিলাম। হাসপাতালে প্রবেশের পর যেমন বাতাসে গন্ধ ছিল, ওই ওয়ার্ডে কিছুটা ভিন্ন ধরনের গন্ধ পাওয়া গেছে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আমাদের তদন্ত কমিটি এমনভাবে গঠন করা হয়েছে, প্রয়োজনীয় যেকোনো বিশেষজ্ঞ সদস্যকে কমিটিতে যুক্ত করতে পারেন তারা। কমিটি গঠনের পর গতকালই তারা অনেক রাত পর্যন্ত ওই হাসপাতালে ছিল। আশা করছি ৭২ ঘন্টার মধ্যেই আমরা তদন্ত প্রতিবেদন পেয়ে যাব।”
বুধবার অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে বলেছেন, হাসপাতালের ‘পোস্ট ডেলিভারি’ ওয়ার্ডের যে অংশে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে, সেখানকার পরিবেশ ‘শ্বাসরুদ্ধকর’ ছিল।
আর অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান বলেছেন, চিকিৎসাজনিত কোনো জটিলতায় নয়, ‘কোনো একটা টেকনিক্যাল ফল্টের কারণে’ এ ঘটনাটা ঘটছে বলে তার ধারণা।
এসি থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়েছিল বলে কথা উঠলেও সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এসিতে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও তা বলতে পারেনি।
আদ-দ্বীন হাসপাতাল নির্ধারিত বিল্ডিং কোড এবং স্বাস্থ্যসেবা–সংক্রান্ত অবকাঠামোগত মানদণ্ড পুরোপুরি মেনে চলছিল কি না, সেই প্রশ্নও এখন সামনে আসছে।
শোকস্তব্ধ পরিবারগুলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবহেলা, গাফিলতি, এমনকি তথ্য গোপনের অভিযোগ এনেছিল সে দিন। এমনকি অভিভাবকরা এও বলেছিলেন-শিশুগুলো মারা যায়নি, তাদের ‘হত্যা’ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল সরাসরি আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করেছেন।
তিনি বলেছেন, “হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে ছয়টি প্রাণ ঝরে গেছে। এসি বন্ধ রাখার ফলে আর কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকায় অক্সিজেনের অভাবে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মত পরিস্থিতি হওয়ায় সম্ভবত তাদের মৃত্যু হয়েছে।”
আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেছেন, এ ঘটনায় তারা ‘অত্যন্ত দুঃখিত এবং ব্যথিত’।
তিনি বলেন, “আমি একজন মা হিসেবে বলতে চাই এর এর চেয়ে বড় ব্যথা বা পেইন আর কিছু হতে পারে না। যেই বাচ্চাগুলো মারা গেছে, তাদের বাবা-মার কষ্ট আমরা ফেরত দিতে পারব না। কিন্তু যেন এই ধরনের ঘটনা এখানে অন্য কোথাও যেন না হয়, এটা অবশ্যই আমাদের তদন্ত করতে হবে।”
বৃহস্পতিবার হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আসরাফুল ইসলাম বলেন, “আমরা হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ একটা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তারাও কাজ করছে। আসলে একটা দুর্ঘটনার পর এত দ্রুত সব কিছু বলা যায় না। শুধু আমাদের কমিটি নয়, পুলিশ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ অনেকে কাজ করছে। সবার রিপোর্ট আসলে আসল বিষয় জানা যাবে।
“তবে একটা কথা অনেক আগে থেকেই ওই ওয়ার্ড শিশুদের জন্য বরাদ্দ ছিল। এমন ঘটনা আগে ঘটেনি কখনো। এমনকি এসির বিষয় নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে, কিছুদিন আগে আমরা এসি মেরামত করেছি।”
হাসপাতালে গিয়ে যা জানা গেল
বৃহস্পতিবার আদ-দ্বীন হাসপাতালে গিয়ে যে ওয়ার্ডে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে সেটি বন্ধ করে রাখা হয়েছে। দুপুর ১২টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে দেখা যায়, হাসপাতালে মানুষজন কম। ডেলিভারি ওয়ার্ডের বাইরে কয়েকজন প্রসূতির স্বজন অপেক্ষা করছেন।
তারা বলছিলেন, আগে এই হাসপাতালের অনেক সুনাম শুনেছেন। তবে গতকালের ঘটনার পর তাদের মধ্যে ভয় ঢুকেছে। তাদের দাবি, অনেক রোগী চলেও গেছে।
নরসিংদী থেকে আসা অন্তর নামের এক যুবক বলেন, “আমার বোনকে এখানে ডেলিভারির জন্য গতকালই নিয়ে আসছি। আসার পর এই দুর্ঘটনার খবর শুনেছি। তারপর থেকে কিছুটা ভয় কাজ করছে। কিন্তু বোনের যে অবস্থা তাতে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নাই।”
হাসপাতালের কয়েকজন কর্মী ও রোগীর স্বজন বলছিলেন, ছয় শিশু মারা যাওয়ার পর থেকে সবার প্রশ্ন আসলে কী ঘটেছিল?
বোনের ডেলিভারি করাতে নিয়ে আসা অন্তর বলেন, “আমি গতকাল আসার পর বারান্দায় দুজন মহিলাকে কান্নারত অবস্থায় দেখি। তারপর শুনি তাদের বাচ্চা মারা গেছে। কিন্তু কেন মারা গেছে, সেটি জানেন না। পরে শুনি, এসির সমস্যা নাকি গ্যাসের কারণে বাচ্চারা মারা গেছে। কেউ বলছে ছয়জন আবার কেউ বলে ১১ জন মারা গেছে। আমার সঠিক জানা নাই।”
তিনি বলেন, ‘‘বোনকে নিয়া আইসা পরছি, তাই কিছু করার নাই। তবে ভয় লাগছে। আবার অন্য জায়গায় নিয়ে যেতেও ঝামেলা। সব মিলিয়ে এক ধরনের দ্বিধার মধ্যেই আছি।’’
তার দাবি, “আমি আসার পর অন্তত পাঁচজনকে দেখছি, ডেলিভারির রোগী চলে গেছে। তবে আশেপাশের পরিবেশ এমনিতে ভালো আছে। কোনো সমস্যা নাই।”
ভাগ্নে বউয়ের ডেলিভারি করাতে এসেছেন মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বাসিন্দা তাহেরা বেগম এসেছেন। তিনি বলেন, “আগেও আমার বউমার বাচ্চা এখানে হয়েছে, তাই আবার এখানে নিয়ে আসা। আমাদের বউমার নরমাল ডেলিভারি হয়েছে, তাই আজকেই চলে যাব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রোগীর স্বজন বলেন, “বিভিন্ন জায়গায় রেফারেন্সের মাধ্যমে এই হাসপাতালের নাম শুনেছিলাম। তারপর এখানে দুদিন হল আসছি। কিন্তু গতকালের ঘটনার পর থেকে ভয় কাজ করছে।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের একজন কর্মী বলেন, গতকালের ঘটনার পর অনেক রোগী চলে গেছে।
তিনি বলেন, “অনেকে বলতেছে এক ধরনের গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেছে, সেটি আসলে সত্য কিনা বলতে পারি না।”
সূত্র: বিডি নিউজ





















