ছয় দেশের সামনে কঠিন সমীকরণ


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: মার্চ ৩১, ২০২৬, ১১:৩০ এএম
ছয় দেশের সামনে কঠিন সমীকরণ

দ্বিতীয় মাসে গড়ানো ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) ছয় সদস্য রাষ্ট্রের ওপর।
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামা ছাড়া এই ছয় দেশের সামনে আর কোনো পথ কি খোলা আছে?
ইরানে স্থল অভিযানে বিভক্ত ট্রাম্পের দল, কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়ে বিতর্ক
চলমান যুদ্ধে ইসরায়েলের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোতেও সমান তালে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান।
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান— কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্র্যাফ্টের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান যতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে, তার ৮৩ শতাংশের নিশানা ছিল জিসিসিভুক্ত দেশগুলো। বাকি ১৭ শতাংশ ছোড়া হয় ইসরায়েলের দিকে।
সবচেয়ে বেশি ইরানি হামলার শিকার হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। গেল রোববার পর্যন্ত দেশটিতে ২ হাজার ১৮৭টি হামলা হয়েছে। এতে ৮ জন নিহত এবং ১৬১ জন আহত হয়েছেন।
ইরানের নিশানায় এর পরেই আছে কুয়েত। দেশটিতে ইরানের ৯৫১টি হামলায় ৫ জন নিহত ও ১০৩ জন আহত হয়েছেন। তৃতীয় স্থানে থাকা সৌদি আরব ৮০২টি হামলায় মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের; আহতের সংখ্যা ১৫।
জিসিসির বাকি তিন সদস্য রাষ্ট্র— বাহরাইন, ওমান ও কাতারেও দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে তেহরান।
রেসপনসিবল স্টেটক্র্যাফ্টের গবেষক অ্যানেল শেলাইন মনে করেন, ২০২০ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষোভে সম্ভবত সংযুক্ত আরব আমিরাতে সবচেয়ে বেশি হামলা চালিয়েছে তেহরান।
কুয়েত অবশ্য ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেনি। এরপরও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হামলার শিকার হওয়ার কারণ হিসেবে ‘ভৌগলিক নৈকট্যের’ কথা বলেছেন শেলাইন।
“জিসিসির সব দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদারত্ব বজায় রাখে। সব দেশেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, এসব সামরিক স্থাপনাই আরব দেশগুলোকে তেহরানের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে,” বলেন শেলাইন।

১৪ মার্চ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি প্রতিবেশীদের আহ্বান জানান, তারা যেন ‘বিদেশি আগ্রাসীদের’ বিতাড়িত করে। পশ্চিমাদের কাছে ইসরায়েলের নিরাপত্তাই মুখ্য— এমন কথাও বলেন তিনি।


অ্যানেল শেলাইন বলেন, আরাকচির এই বক্তব্য প্রচলিত একটা ধারণাকে উসকে দিতে পারে। সেটা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জিসিসি সদস্যদের চেয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

হামলার সংখ্যা বেশি হলেও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ায় জিসিসি রাষ্ট্রগুলো ইরানের আঘাত প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। ফলে খুব একটা ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

তবে আরব দেশগুলোর যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, তাতে এই হামলা বড় রকমের হুমকি তৈরি করছে।

কারো কারো আশঙ্কা, তেহরানের হামলা এসব দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি— লাখ লাখ বিদেশি শ্রমিককে ভীত করে তুলতে পারে। কারণ, এখন পর্যন্ত হতাহতদের বেশির ভাগই নিম্নআয়ের বিদেশি শ্রমিক।

অ্যানেল শেলাইনের ধারণা, কাজের সুযোগ হয়ত নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের ভবিষ্যতেও আকৃষ্ট করবে। কিন্তু ধনী প্রবাসীদের মধ্যে ফেরার আগ্রহ কমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।

“কারণ দেশ দুটি তাদের বিলাসিতা ও নিরাপত্তার সুনামের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এমন ভাবমূর্তির ফলে হাজার হাজার ধনী প্রবাসী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি সেখানে পাড়ি জমান। সহিংসতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী, পর্যটক ও ট্রানজিট যাত্রীরা পুরো অঞ্চলই এড়িয়ে চলতে পারেন।”

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে সৌদি আরবের জন্য। এমন সময় এই যুদ্ধ বাধল, যখন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তার ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনায় হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছেন।

মূলত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করতে এই প্রকল্প হাতে নিয়েছেন সৌদি যুবরাজ।

উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের অর্থনীতি সবচেয়ে বড়। জিসিসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তাদের জনসংখ্যাও সবচেয়ে বেশি। ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো সীমিত জনসংখ্যার ধনী দেশগুলোর তুলনায় সৌদির আর্থিক চাপটা বেশি।


মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি করে আসা শেলাইন মনে করেন, ‘ভিশন ২০৩০’ এর স্বার্থই ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে যুবরাজকে প্রভাবিত করেছিল। এমনকি ২০২৩ সালের মার্চে ইরান ও সৌদি আরবের তরফে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথাও বলা হয়।

কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর পরেই সংবাদমাধ্যমে খবর আসে, সৌদি আরবও নাকি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলার আহ্বান জানিয়েছিল।

সৌদি সরকার এ খবর অস্বীকার করেছে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান বিন আব্দুল্লাহ বলেছেন, “ধৈর্যের সীমা আছে এবং ইরানি আগ্রাসন প্রতিহত করার অধিকার সৌদি আরব রাখে।”

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামতে কিংবা তাদের ভূখণ্ড থেকে হামলার অনুমতি দিতে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জিসিসি দেশগুলো এখন তাতে রাজি হয়নি।

ফলে সৌদি যুবরাজ তেহরানে হামলা অব্যাহত রাখতে বলছেন, এমন খবর নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য নিয়েও ছড়ানো হতে পারে বলে ধারণা কোনো কোনো বিশ্লেষকের।

“আবার এমনও হতে পারে, শুরুতে সৌদি যুবরাজ যুদ্ধ ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরে হয়ত তার মনে হয়েছে, ইরানকে পঙ্গু করে দেওয়াই ভালো,” বলেন শেলাইন।

যদি সেটাই হয়, তাহলে কি উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় যোগ দেবে?

জবাবে শেলাইন বলেন, “সংযুক্ত আরব আমিরাত মনে হয় উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করতে উৎসাহ দিচ্ছে।”

সম্প্রতি আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেন, “আমার মনে হয়, ইরানের হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইসরায়েলের প্রভাবকে আরো শক্তিশালী করবে। আজ উপসাগরীয় অঞ্চলে আমাদের অনেকেই ইসরায়েল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র আসতে দেখছি না; আমরা দেখছি সেগুলো ইরান থেকে আসছে।”


ক্যাপশন: সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ শহরে গত ১৪ মার্চ হামলা চালায় ইরান। ছবি: রয়টার্স।

এর আগে গত ২৪ মার্চ একই সুরে কথা বলেন দুবাই পুলিশের উপপ্রধান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, “হে আরববাসী…ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করো, এটি পরামর্শ। এই অঞ্চলের দেশগুলোতে মোটেও ভালো কিছু নেই।”

তারে এ বক্তব্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সৌদি বিশ্লেষক তার্কি রুমাই লেখেন, “এই যুদ্ধে ইসরায়েল তার আঞ্চলিক মিত্রদের কী দিয়েছে?”

অন্যদিকে ইসরায়েলকে ‘নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও কৌশলগত বোঝা’ হিসেবে মন্তব্য করেন কুয়েতভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান আব্দুলআজিজ আল আনজেরি।

তার ভাষায়, “ইসরায়েলের ওপর আস্থা রাখা মানে হলো বিপদের কারখানার ওপর আস্থা রাখা।”

এমন কথাও ছড়িয়েছে যে, ইসলামিক রেভলুশনারি গার্ড কোরে (আইআরজিসি) মোসাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং তারাই নাকি উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে তাদের যুদ্ধে টেনে আনতে চাইছে।

বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, শেষমেশ যদি অধিকাংশ উপসাগরীয় দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক না করে, তাহলে নিজেদের দৃশ্যমান সামরিক দুর্বলতাগুলো তারা কীভাবে মোকাবিলা করবে?

গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের দোহায় বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। হামাসের অবস্থান লক্ষ্য করে এ হামলা চালানোর কথা বলে তারা।

হামলার আট দিন পর সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। এরপর গেল ৪ ফেব্রুয়ারি সামরিক সহযোগিতা চুক্তি হয় মিশর ও তুরস্কের মধ্যে।


ক্যাপশন: ইসলামাবাদে রোববার আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ে বৈঠকে বসেন সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ছবি: রয়টার্স।

সম্প্রতি সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা নিজেদের মধ্যে একটা নিরাপত্তা চুক্তি করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্র্যাফ্টের বিশ্লেষণ বলছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো যতটা না নিরাপত্তার উৎস, তার চেয়ে বেশি দায়ে পরিণত হয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার জন্য এত বেশি বিনিয়োগ করেছে যে, তাদের পক্ষে এখন সরে আসাটা হবে কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।

শেলাইন মনে করেন, “কঠিন হলেও বিকল্প পথ খুঁজে বের করাটা তাদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যেমনটি আমি যুদ্ধ শুরুর দুদিন পরেই বলেছিলাম।

“এই যুদ্ধ তাদের অর্থনীতি ও সমাজকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।”

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সহযোগীদের বলেছেন, তিনি আশা করেন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংঘাত শেষ হবে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে আরো হাজার হাজার সেনা ও সামরিক রসদ জড়ো করছেন।

ফলে যুদ্ধের ইতি টানা নিয়ে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটার উদ্দেশ্য তেলের বাজারের অস্থিরতা কমানো কিনা, তা স্পষ্ট নয়।

গত ২৩ মার্চ ইরান ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দেয়, যা প্রতিদিনের পড় ১৩৮টির তুলনায় খুবই কম।

শেলাইন বলেন, “এই যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। যদিও যুদ্ধের প্রভাব টের পাচ্ছে গোটা বিশ্বই।”

Link copied!