বড় পরিবর্তনে যাত্রা শুরু বালেন্দ্র সরকারের


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: মার্চ ৩১, ২০২৬, ১২:২৭ পিএম
বড় পরিবর্তনে যাত্রা শুরু বালেন্দ্র সরকারের

বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে নেপালে। জেন–জি আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নেপালের কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বালেন্দ্র শাহ। শপথের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই শাসনব্যবস্থা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে ১০০ দফার উচ্চাভিলাষী কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন তিনি। বালেন্দ্র শাহর পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে কয়েকটি সিদ্ধান্ত যেমন প্রশংসা পেয়েছে, তেমনি কয়েকটি বিতর্কের মুখেও পড়েছে।

বালেন্দ্র শাহ প্রশংসা পেয়েছেন মন্ত্রিসভায় নারী সদস্যদের প্রাধান্য দিয়ে। নতুন মন্ত্রিসভার গঠন নেপালের রাজনীতিতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। বালেন্দ্র তাঁর ১৫ সদস্যের মন্ত্রিসভায় পাঁচজন নারী মন্ত্রী নিয়োগ করেছেন। এর মাধ্যমে নেপালের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভায় ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে, যা দেশটির সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পূরণে একটি বড় পদক্ষেপ। এই নারী মন্ত্রীদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলো দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইন, কৃষি, জনপ্রশাসন, বিচার ও সংসদবিষয়ক, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়।


বালেন্দ্রর সংস্কার সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধকরণ। তরুণ প্রজন্মের নেতা হলেও তাঁর এ সিদ্ধান্ত তরুণদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ রাজনীতিতে অনেকটাই নবীন। র‍্যাপার হিসেবে পরিচিত বালেন্দ্র ৫ মার্চের নির্বাচনে ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ থেকে অংশ নেন। এ দলটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বালেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনমনে চরম অসন্তোষ এবং দুর্নীতি ও অপশাসনের বিরুদ্ধে তরুণদের গড়ে তোলা আন্দোলনের ওপর ভর করেই তাঁর এই উত্থান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নেপালের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক খোলনলচে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।

নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ছিল ক্যাম্পাসগুলো থেকে রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলো সরিয়ে দেওয়া। এর পরিবর্তে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের মতো নির্দলীয় সংস্থা গঠন করা হবে। বালেন্দ্র যুক্তি দিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা উচিত নয়। তিনি প্রধান দলগুলোর ছাত্রসংগঠন এবং মাওবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে জড়িত সহিংসতা, ভাঙচুর, চাঁদাবাজি এবং একাডেমিক ক্যালেন্ডার বিপর্যয়ের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন।

সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকারি কর্মচারী এবং শিক্ষকদের কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এ ছাড়া সরকারি সংস্থাগুলোর ভেতরে পরিচালিত দলীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলোও বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সমর্থকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো শাসনব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করবে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমাবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি করবে। তবে সমালোচকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ শ্রমিকদের সুরক্ষা দুর্বল করতে পারে এবং সরকারি ব্যবস্থায় ভিন্নমতের সুযোগ সীমিত করতে পারে।

বালেন্দ্র শাহ শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নিচ্ছেন। স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এখন থেকে আর নাগরিকত্বের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। এ ছাড়া পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে একাডেমিক ক্যালেন্ডার মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রথাগত পরীক্ষা নেওয়া হবে না। এর পরিবর্তে বিকল্প মূল্যায়নপদ্ধতি চালু করা হবে।
সংস্কার কার্যক্রম চলার মধে৵ই নতুন প্রশাসনবিরোধী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। গত বছরের ‘জেন–জি’ বিক্ষোভ নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বাস্তবায়নের একদিন পরই গত শনিবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলিকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরেক সাবেক মন্ত্রী রমেশ লেখককেও। উভয়ের বিরুদ্ধেই গত সেপ্টেম্বরের গণজাগরণ দমনে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে, যেখানে অন্তত ৭৭ জন নিহত হয়েছিলেন। উল্লেখ্য, সেই বিক্ষোভ মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাময়িক নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে শুরু হলেও পরে তা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয় এবং অলি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এবারের নির্বাচনে অলি শর্মার দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (সিপিএন-ইউএমএল) সরাসরি ভোটে ১৬৫ আসনের মধ্যে ৯টিতে জয় পায়। কে পি শর্মা অলিকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে। সিপিএন-ইউএমএল কর্মী এবং পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে অনেকেই আহত ও গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা অলির মুক্তি ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন।

Link copied!