রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের পর নেপালের প্রথম ১৮ বছরে দেশটিতে ১৪ জন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তিত হয়েছেন—অর্থাৎ প্রায় প্রতি বছর নেতা বদলেছে। অনেক নেতা ক্ষমতায় এসেছেন, বহিষ্কৃত হয়েছেন এবং কয়েক বছর পর আবারও ফিরে এসেছেন।
তবে ২০২৬ সালের ৫ মার্চ নেপাল যেন এই ধারায় একটি সীমারেখা টেনে দিল। জেন-জি বা নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন এক গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি অপসারিত হওয়ার কয়েক মাস পর, লাখ লাখ ভোটার র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া বলেন্দ্র শাহ (যিনি ‘বালেন’ নামেই পরিচিত) এবং তার দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিকে (আরএসপি) দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ শুক্রবার (২৭ মার্চ) নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন ‘বালেন শাহ’। খবর আলজাজিরার।
আরএসপি’র বয়স মাত্র চার বছর এবং শাহ-র একমাত্র রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা হলো রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন। বিশাল জয়ের পর বিশ্লেষক ও ভোটাররা বলছেন, শাহ এবং আরএসপির সামনে ২০২৫ সালের জনবিদ্রোহের ওপর ভিত্তি করে তরুণ নেপালিদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের এক ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। তবে এই সুযোগের সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিষ্ণু সাপকোটা আলজাজিরাকে বলেন, ‘বিপুল ম্যান্ডেটের কারণে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। তার এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এটি একটি অভূতপূর্ব সুযোগ কারণ তার দল সংসদে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে প্রত্যাশা পাহাড়চুম্বী। আমার মনে হয় না তার পক্ষে সব প্রত্যাশা পূরণ করা বাস্তবসম্মত হবে।’
নির্বাচনে বালেন শাহ প্রবীণ নেতা কেপি শর্মা অলিকে এমন এক নির্বাচনি এলাকায় পরাজিত করেছেন যা দশকের পর দশক ধরে অলির দুর্গ ছিল। আরএসপি সরাসরি ভোটে ১৬৫টি আসনের মধ্যে ১২৫টিতে জয়লাভ করেছে। সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের আসনগুলোর পূর্ণাঙ্গ বন্টন এখনো বাকি থাকলেও সব ইঙ্গিত বলছে আরএসপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে।
এটি খোদ আরএসপি-র প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। আরএসপি নেতা শিশির খানাল আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমরা ৫০ শতাংশের কিছু বেশি আশা করছিলাম, কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ আমাদের ধারণার বাইরে ছিল।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘চ্যালেঞ্জ হলো এই ম্যান্ডেট মানুষের মনে দ্রুত ফলাফলের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। নেপালের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং স্থবির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সেই ফলাফল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে।’
বালেন শাহর জন্য প্রথম পরীক্ষা হবে 'কারকি কমিশন'-এর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা। গত বছর অলির পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সুশীলা কারকি সরকার এই কমিশন গঠন করেছিল। গত বছরের আন্দোলনে হত্যাকাণ্ড ও সম্পত্তি ধ্বংসের তদন্তের দায়িত্ব ছিল এই প্যানেলের ওপর। ২০২৬ সালের ৮ মার্চ তারা রিপোর্ট জমা দেয়। এখন বলেন্দ্র শাহ সরকারকে এই তদন্তের ফলাফল বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বালেন শাহ এবং আরএসপি-র প্রতিষ্ঠাতা রবি লামিচানের মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গেহেন্দ্র লাল মাল্লা এই জোটকে ‘সুবিধাজনক সম্মিলন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘বালেনের নির্বাচনের জন্য একটি দল দরকার ছিল, আর রবির দরকার ছিল বালেনের জনপ্রিয়তা। তবে পরে মতভেদ দেখা দিতে পারে।’
রবি লামিচানে নিজে একজন বিতর্কিত ব্যক্তি। তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি, সংগঠিত অপরাধ এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে নেপালি ও মার্কিন—উভয় দেশের পাসপোর্ট অবৈধভাবে রাখার অভিযোগ রয়েছে। মাল্লা মনে করেন, লামিচানের বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে শাহ-র ভূমিকা হবে বড় পরীক্ষা।
আরএসপি নেতারা বলছেন, সরকার দ্রুত কাজ শুরু করবে। প্রথম ১০০ দিনে তারা দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেবে, যার মধ্যে ১৯৯০ সাল থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের সম্পদের তদন্ত অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ২৩ বছর বয়সী অ্যাক্টিভিস্ট ইউজন রাজভাণ্ডারী বলেন, ‘যেহেতু সংসদে বিরোধী দল দুর্বল থাকবে, তাই রাজপথই বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে।’
সমালোচকরা শাহ-র কূটনৈতিক দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মেয়র থাকাকালীন তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং ‘বৃহত্তর নেপাল’-এর মানচিত্র প্রদর্শন করেছিলেন যা ভারতের সাথে টানাপোড়েন তৈরি করেছিল। তবে বিশ্লেষক সাপকোটা মনে করেন, শাহ-র কোনো পুরনো রাজনৈতিক পিছুটান নেই, যা নেপালকে একটি স্বাধীন কূটনীতি অনুসরণে সাহায্য করবে।
ইতোমধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন্দ্র শাহ-কে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের আশা প্রকাশ করেছেন। বলেন্দ্র শাহও ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।
অধ্যাপক মাল্লা পরিশেষে বলেন, “বালেনকে এখন গণমাধ্যমের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে হবে। আগে তিনি বলতেন ‘কাজ বেশি, কথা কম’, কিন্তু একজন জাতীয় নেতা হিসেবে যোগাযোগ এবং দায়বদ্ধতা অত্যন্ত জরুরি।”
































