• ঢাকা
  • সোমবার, ১৫ জুলাই, ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১, ৮ মুহররম ১৪৪৫

ফ্লয়েড খুনের দিন


হাসান শাওন
প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২৩, ১১:০৮ এএম
ফ্লয়েড খুনের দিন

ইতিহাস মানেই কি কালো মানুষ খতমের পর্ব? এ প্রশ্ন আসে এই আজকের দিন ২৫ মে জর্জ ফ্লয়েড খুনের তিন বছর পর। শুধু জানা যায় এখনো গায়ের রংয়ে মানুষ বিভাজন। তাই বর্ণবাদ উৎখাত না হওয়া পর্যন্ত দুনিয়া কাঁপানো ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন জরুরি আজও।

মার্কিন রাষ্ট্রের পুলিশের চূড়ান্ত নৃশংসতায় ফ্লয়েড খুন হন। যদিও এ মুল্লুকের ভিত্তিই কালো মানুষ আর আদিবাসীদের রক্তস্রোত। ১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রার আগে ধারণা করা হয় আটলান্টিকের তীরে উত্তরের এ ভূখণ্ডে আদিবাসীদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ কোটি। ৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে আমেরিকার ইতিহাস মানে নির্মম দাসপ্রথা, কালো মানুষ আর আদিবাসী নিশ্চিহ্নের ইতিহাস। ট্রান্স-আটলান্টিক স্লেভ ট্রেড ড্যাটাবেজ মাফিক জানা যায়, ১৫২৫ থেকে ১৮৬৬ সালের মধ্যে ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন আফ্রিকান দাস উত্তর আমেরিকায় পাঠানো হয়। ভয়াবহ এ যাত্রা শেষে ১০ দশমিক ৭ মিলিয়ন দাসের প্রাণটুকু ছিল মাত্র।

সে খুনের ধারাবাহিকতায় এখনের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও কালো মানুষ নিধনের সত্যতা মেলে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় মাত্র ১৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ। বিলুপ্ত হয়েছে অন্তত ৯০ শতাংশ আদিবাসী। ২০১৩ থেকে ২০১৯ এই ৬ বছরে দেশটিতে পুলিশের হাতে মৃত্যু হয়েছে ৭ হাজার ৬৬৬ কৃষ্ণাঙ্গের।

কিন্তু হত্যাই শেষ কথা নয়। প্রতিরোধও চলেছে। মনে করা যাক, ৬০ এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ নাগরিক আন্দোলনের প্রবর্তক মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের প্রাণ বিলিয়ে দেওয়ার কথা। ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটনের লিংকন মেমোরিয়ালের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে যিনি বলেছিলেন ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’।

ওই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “আমি স্বপ্ন দেখি এই জাতি একদিন জেগে উঠবে এবং তারা তাদের ধর্মবিশ্বাসের সত্যকে জীবনে কাজে লাগাবে। আমরা এই সত্যগুলোকে প্রমাণিত বলে মানি। সব মানুষকে সমান করে সৃষ্টি করা হয়েছে। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন জর্জিয়ার লাল পাহাড়ে দাসদের সন্তানরা এবং দাস মালিকদের সন্তানেরা ভ্রাতৃত্বের টেবিলে একসঙ্গে বসতে পারবে। আমি স্বপ্ন দেখি, এমনকি মিসিসিপি প্রদেশ যেটা অবিচার এবং নিপীড়নের তীব্র তাপে জর্জরিত, তাও একদিন স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের আশ্রয়স্থলে পরিণত হবে। আমি স্বপ্ন দেখি আমার ছোট ছোট চার সন্তান এমন একটি দেশে বাস করবে যেখানে তাদের গায়ের রং দিয়ে বিচার করা হবে না, বরং তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে বিচার করা হবে।”

জর্জ ফ্লয়েড খুনের পর দীর্ঘ বিরতি শেষে মহামারির ভেতর আমাদের গ্রহ যেন জেগে ওঠে। চলে ইতিহাস বিনির্মাণের লড়াই। সেই সঙ্গে পথে পথে মিছিলের আগুনে স্রোত। “অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনের” চেয়ে “ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের” ব্যাপকতা ছিল বহুমাত্রিক।

শুধু জর্জ খুনের শহর মিনিয়াপোলিসে প্রতিবাদ সীমাবদ্ধ ছিল না। দাবানলের মতো বিক্ষোভ বিস্তৃত হয় দিকে দিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনপদে থেকে জনপদে মুক্তিকামী মানুষ পথে নেমে আসেন। দ্রোহে সংহতি প্রকাশ করে ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ। মিছিল নিয়ে লড়াইয়ে সামিল হয় তারাও।

দীর্ঘ দিনের চেপে রাখা ক্ষোভ কখনও শান্তিপূর্ণ হয় না। দিকে দিকে ভাঙচুর চলে। জনতা আগুন জ্বালায় জুলুমবাজদের স্থাপনায়। লুটপাটও হয়। মার্কিন প্রশাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দেয় “ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন”। দুশোটির বেশি শহরে জারি হয় কারফিউ। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিসহ ৩০টি স্টেটে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারায় অনেকে। ২০২১ সালের জুনের শেষে প্রায় ১৪ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবু বিক্ষোভ থামে না। খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা হাঁটু গেড়ে ফ্লয়েড খুনের বিচার চান। গণআন্দোলনের দাবানল ঠেকাতে মুক্ত চিন্তার প্রতিভূ মার্কিন রাষ্ট্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়।

তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন এই আন্দোলনকে ‘নৈরাজ্য’, ‘দাঙ্গা’, ‘লুটপাট’, ‘ভাঙচুর’ প্রভৃতি অভিধা দেয়। কিন্তু লড়াই ছিল ঔপনিবেশিকতার চিহ্ন মুছে ফেলে ইতিহাস বিনির্মাণ। আন্দোলনকারী জনতা গুড়িয়ে দেয় ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ভাস্কর্য, রানী ভিক্টোরিয়ার স্মারক। বাদ যায়নি নব্য রাজা প্রিন্স চার্লসের ছবিও। মানুষের মিছিল প্ল্যাকার্ডে-স্লোগানে পুলিশ বাহিনী বিলুপ্তকরণ ও অস্ত্রবাণিজ্যে ঠিকাদারত্বের মার্কিন শাসনব্যবস্থাকে এক মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।

২৫ মে তাই শুধু কালো মানুষ জর্জ ফ্লয়েডের শোকে কান্না করার দিন নয়। আমাদের সময়ের এক মহোত্তম আন্দোলন সূচিত হওয়ার সময়ও এটি। নিশ্চয়ই আমরা সুনির্দিষ্ট পথে চললে সাম্য ও সত্যের পৃথিবী নির্মাণ সম্ভব। আজকের দিন তাই আমাদের পৃথিবীকে স্বর্গে রূপ দেওয়ার স্বপ্ন দেখার দিন।

Link copied!