কোটি বাঙালির হৃদয়ের ‘রানি’ শাবানা


সংবাদ প্রকাশ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২৬, ১০:১৬ পিএম
কোটি বাঙালির হৃদয়ের ‘রানি’ শাবানা

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম সময়কে অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। সেই নক্ষত্রদের অন্যতম বরেণ্য অভিনেত্রী শাবানা। যার নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সোনালি দিনের বাংলা সিনেমা, অসংখ্য কালজয়ী চরিত্র আর দর্শকের অগাধ ভালোবাসা। 


চার দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে শাবানা নিজেকে নিয়ে গেছেন এমন এক উচ্চতায়, যেখানে তাকে শুধু একজন অভিনেত্রী হিসেবে নয়, বরং বাংলা চলচ্চিত্রের একটি যুগের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন দীর্ঘ ২৬ বছর আগে, কিন্তু আজও কোটি বাঙালির হৃদয়ে অভিনয়ের রানি হয়ে আছেন। সোমবার (১৫ জুন) কিংবদন্তি এই শিল্পীর জন্মদিন। 

১৯৫২ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শাবানা। তার প্রকৃত নাম আফরোজা সুলতানা রত্না। চলচ্চিত্রে তার পথচলা শুরু হয়েছিল শিশুশিল্পী হিসেবে। পরিচালক এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান তিনি। পরবর্তীতে ‘চকোরী’ সিনেমার মাধ্যমে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নেন। 


এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি শাবানাকে। একের পর এক দর্শকনন্দিত ও ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করে হয়ে ওঠেন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকাদের একজন। আবেগ, মমতা, প্রেম, প্রতিবাদ কিংবা সংগ্রাম—প্রতিটি চরিত্র অভিনয় দক্ষতা দিয়ে জীবন্ত করে তুলতেছেন তিনি। 


বাংলা চলচ্চিত্রে জুটি হিসেবে শাবানা ও আলমগীর ছিলেন দর্শকের অন্যতম প্রিয় জুটি। একসঙ্গে প্রায় ১৩০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তারা গড়েছেন এক অনন্য রেকর্ড। এছাড়া রাজ্জাক, ওয়াসিম এবং উজ্জ্বলের সঙ্গে তার জুটিও ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়। পাকিস্তানি সুপারস্টার নাদিমের সঙ্গেও তার রসায়ন দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। 

শাবানা অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের তালিকাও বেশ দীর্ঘ। এর মধ্যে রয়েছে চকোরী, মধু মিলন, অবুঝ মন, চান্দ সুরজ, একই অঙ্গে এত রূপ, ছদ্মবেশী, ছন্দ হারিয়ে গেল, চৌধুরী বাড়ি, সমাধান, স্বীকৃতি, ওরা ১১ জন, অতিথি, ঝড়ের পাখি, জননী, মাটির ঘর, সখী তুমি কার, শেষ উত্তর, ছুটির ঘণ্টা, নাজমা, ভাত দে, দুই পয়সার আলতা, রজনীগন্ধা, লালু ভুলু, মা ও ছেলে, লাল কাজল, নালিশ, ঘরের বউ, সখিনার যুদ্ধ, নতুন পৃথিবী, হিম্মতওয়ালী, বাসেরা, হালচাল, চাঁপা ডাঙ্গার বউ, অশান্তি, বিরোধ, স্বামী স্ত্রী প্রভৃতি। 

ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৭৩ সালে পরিচালক ওয়াহিদ সাদিককে বিয়ে করেন শাবানা। তাদের সংসারে রয়েছে দুই কন্যা ও এক পুত্রসন্তান। 

অভিনয়জীবনের জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অবস্থায় ২০০০ সালে হঠাৎ করেই পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান শাবানা। শুরুতে নিউ ইয়র্কে বসবাস করলেও বর্তমানে স্বামী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে নিউ জার্সিতে বসবাস করছেন। 

শাবানা যখন অভিনয় থেকে বিদায় নেন, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগ শুরুই হয়নি। ফেসবুক ছিল না, ছিল না আজকের মতো ডিজিটাল স্মৃতিচারণের সুযোগও। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলালেও মানুষের ভালোবাসা বদলায়নি। জন্মদিন এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তরা তার পুরোনো ছবি, প্রিয় সংলাপ ও স্মৃতিময় মুহূর্ত ভাগাভাগি করে নেন। নতুন প্রজন্মও ইউটিউব ও টেলিভিশনের পর্দায় তার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়। 

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দর্শকের ভালোবাসা ধরে রাখা খুব কম শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব হয়। শাবানা সেই ভাগ্যবান শিল্পীদের একজন, যে শুধু একজন নায়িকা নন, বাংলা চলচ্চিত্রের গৌরবময় ইতিহাসের উজ্জ্বল এক অধ্যায়। অভিনয়ের আলো থেকে দূরে থেকেও কোটি বাঙালির হৃদয়ে অমলিন, অনন্য এবং চিরসবুজ।

Link copied!