প্রতিবারের মতোই সর্বনাশা পদ্মা কেড়ে নিয়েছে পাবনায় অর্ধশতাধিক বসতভিটা। ২৭টি পরিবারের দিশেহারা হওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামে মসজিদ, ঈদগাহ ও ইটের ভাটা। বাড়িঘর হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন।
অপরিকল্পিতভাবে বালুদস্যুদের বালু উত্তোলনের কারণে দেখা দিয়েছেন নদীভাঙন। সর্বশান্ত হচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ। এই বালুদস্যুদের বিরুদ্ধে বালু উত্তোলন বন্ধে এলাকাবাসীকে স্বোচ্ছার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য, জেলা আওয়ামী লীগ সম্পাদক গোলাম ফারুক প্রিন্স। পাশাপাশি নদী ভাঙন রোধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনবার্সন ও সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জেলার বেড়া উপজেলার কয়েকটি স্থানে পদ্মা নদীতে ভাঙন বেড়েছে। পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুরের আড়িয়া গোহাইলবাড়ি, বালিয়াডাঙ্গী, দিঘি-গোহাইলবাড়ি, কাফিপাড়া, ভাঁড়ারা ইউনিয়নের কাথুলিয়া, জোত কাকুরিয়া গ্রামে নদী ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আগস্ট মাসের শুরু থেকে নদী ভাঙন শুরু হয়। এখন পর্যন্ত তা অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে ২৫ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলোর টিন, কাঠসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র স্তুপ করে রাখা হয়েছে। আবার অনেকেই সব কিছু ভেঙে নিয়ে অন্যত্র বাড়ি বানাচ্ছেন। গরু ছাগল হাঁস মুরগিসহ যাবতীয় জিনিস বিক্রি করে দিয়েছে। কয়েকজনের আসবাবপত্র কিছু থাকলেও ভাঙন আতঙ্কে রাতযাপন করছে তারা। যাদের কিছুটা সামর্থ্য আছে তারা অন্য জায়গায় নতুন করে কোনোমতো ঘর তুলে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিচ্ছেন। আর সামর্থহীনরা খোলা আকাশের নিচে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এই ছয়টি গ্রামে প্রায় ১২০০ পরিবারের বাস। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র। অনেকেই কৃষি কাজ, ভাঙারি ব্যবসা, ইটভাটার শ্রমিক এবং মুদি দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কেউ বা নদীতে মাছ শিকার করে সংসার চালিয়ে থাকেন। এখানে একটি ইট ভাটা রয়েছে যা এখন ভাঙনের মুখে রয়েছে। ফলে এখানকার বাসিন্দাদের দিনরাত কাটছে আতঙ্কের মধ্যে।
খাইরুল ইসলাম, বাচ্চু আলী, ওহাব আলী, মনোয়ারা, সালমা খাতুনসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, আগস্ট মাসের শুরুতে গভীর রাতে প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে দেখি পদ্মার পানি ভয়ংকর বেগে ঘরের দিকে আসছে। চিৎকার করে আশপাশের লোকদের ডেকে তুলে ঘর ভেঙে সরাতে শুরু করি। এরই মধ্যে কয়েকটি ঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। মসজিদ, প্রাইমারি স্কুল, ঈদগাহ বিলীনের অপেক্ষায় আছে।
এলাকার প্রভাবশালী কিছু মহলের নেতৃত্বে পদ্মা নদী থেকে খড়া মৌসুমে অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদী ভাঙন বেশি হচ্ছে। বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে নদী ভাঙনরোধ করা সম্ভব নয় বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দাসহ সচেতন মহল।
নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে সর্বশান্ত মানুষগুলো কান্নাজড়িত কণ্ঠে তারা বলেন, এই মৌসুমেই তিনবার ঘরবাড়ি সড়িয়েছি। এখন আর কোথাও ঘর তুলার মত জায়গা নেই। হাতে টাকা পয়সাও নেই যেটা দিয়ে জায়গা জমি কিনে অন্যত্র বাড়ি করব। আমরা ঠিকমত সংসারই চলাতে পারি না। মোটা অংকের টাকা দিয়ে জায়গা জমি কিনে বাড়িঘর তৈরি সম্ভব নয়। ছেলে-মেয়েদের স্কুল খুলে দেওয়া হয়েছে। রাতে পড়াশুনা করতে পারছে না। সবাই নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছি। আমাদের ফসলি জমিতে আবাদ ছিল সেগুলোও তলিয়ে গেছে। জমিজমা সব কিছু হারিয়ে এখন আমরা সর্বশান্ত।
আক্ষেপ করে তারা বলেন, খেয়ে না খেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত-দিনযাপন করছি। স্থানীয় প্রতিনিধি বা সরকারের পক্ষ থেকে কোন ত্রাণ তো দুরের কথা ঠিকমত খোঁজখবর নেয়নি। কয়েকদিন আগে এমপি মহোদয় এসে নদী ভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধানের কথা বলে গেছেন। আমাদের জন্য কোন ব্যবস্থা হবে কিনা জানি না। তবে সরকারের দিকে আমরা চেয়ে আছি স্থায়ী সমাধানের জন্য। আমরা ত্রাণ চাইনা নদী ভাঙনরোধ চাই। স্থায়ী সমাধান দিতে হবে। বারবার ভাঙনে এখন আমরা পাখির মত।
চরতারাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম টুটুল জানান, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনে অত্র অঞ্চল নদীগর্ভে বিলিন হওয়ার আশঙ্কা করছি। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বসত ভিটা, গাছপালা ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। শতাধিক পরিবার নদী ভাঙন আতঙ্কে রাত-দিন পার করছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে অর্থ বরাদ্ধ পেলে তাদের মাঝে বন্টন করা হবে।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেন বলেন, চরতারাপুর এলাকায় প্রভাবশালী কিছু মহলের অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে পদ্মার তীর ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু বসত ভিটা বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয় এমপি মহোদয় ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে আমাদের হাতে একটি ডিও লেটার দিয়েছেন। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বরাবর। সেটার আলোকে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। ভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধানের বিষয়টি প্রাধান্য দেওয়ার কথা জানান এই কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে পাবনা সদর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে নদী ভাঙনরোধ করা সম্ভব নয়। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীকে সোচ্চার হওয়ার কথা বলেছি। বালুখোরদের বিরুদ্ধে গেলে প্রয়োজনে আমিও তাদের পাশে থাকব। পানি উন্নয়বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে নদী ভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধানের ব্যাপারে আলোচনা করেছি। আশা করি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নদী ভাঙনের স্থায়ী সমাধান হয়ে যাবে।





































