হোসে লুইস চিলাভার্ট প্যারাগুয়ের ফুটবল ইতিহাসে এক বিরল চরিত্র। গোলরক্ষক হয়েও যিনি গোলদাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মাঠে তার আগ্রাসী ও উত্তপ্ত মেজাজ ছিল তার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গোলবারের নিচে দৃঢ়তা তাকে এক অনন্য, প্রায় কিংবদন্তিতুল্য মর্যাদা দিয়েছিল। আজ জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচে ঠিক এই চিলাভের্তের ছায়াই অরল্যান্দো গিলে দেখতে পাচ্ছিলেন প্যারাগুয়ে সমর্থকরা। এই গোলকিপার যখন টাইব্রেকারে একের পর এক জার্মান শট রুখে দিচ্ছিলেন, তখন প্যারাগুইয়ানদের চোখে ভেসে ওঠে সেই পুরোনো উত্তরাধিকারের ছবি।
রাউন্ড অব ৩২-এ প্যারাগুয়ের অবিশ্বাস্য জয়ের মূল নায়ক গিল। টাইব্রেকারে জার্মানিকে হারানোর পর দীর্ঘ ১৬ বছর পর রাউন্ড অব ১৬ নিশ্চিত করে প্যারাগুয়ে। রাতারাতি দেশটির তারকা বনে যান গোলরক্ষক গিল। তবে বিশ্বকাপের এই মঞ্চে আসার পথটা মোটেই সহজ ছিলো না তার জন্য। একসময় পরিবারের ভরণপোষণের জন্য নিজের অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের জার্সি পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন ২৬ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক। পেনাল্টি স্পট আর নায়কোচিত ভূমিকার মধ্যেকার পথটা অরল্যান্দো গিলের আগে থেকেই চেনা। প্যারাগুয়ের সান লোরেনসো শহরে জন্ম নেওয়া হিল এখন খেলেন আর্জেন্টিনার আলমাগ্রোর আরেক সান লোরেনসোর হয়ে।
প্রায় সাড়ে ছয় ফুট উচ্চতার এই গোলরক্ষক তার শারীরিক গড়নের জন্য সবার নজর কাড়েন, আর আর্জেন্টিনায় রিয়াল মাদ্রিদের বেলজিয়ান গোলরক্ষকের নামের সঙ্গে মিলিয়ে তাকে ডাকা হয় ‘প্যারাগুইয়ান কোর্তোয়া।‘ তবে তিনি শুরু থেকেই গোলবারের নিচে ছিলেন না। ক্লাব ১৩ দে হুনিওতে মিডফিল্ডার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা গিলকে তার সাবেক সতীর্থরা দলের সেরা খেলোয়াড় বলে মনে করতেন। গোলরক্ষকের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি হোসে লুইস চিলাভার্টের সঙ্গে মিল রেখে আরেকটি বৈশিষ্ট্য রপ্ত করেন—ফ্রি-কিক নেওয়া শুরু করেন এবং প্যারাগুইয়ান ফুটবলে এভাবে চারটি গোলও করেন।
গিলের গল্পের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়টি আসে যখন তার ছেলে লাউতারোর জন্ম হয় এবং সে স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে। তখন প্যারাগুয়ের সাধারণ মানের ক্লাব স্পোর্তিভো সান লোরেনসোতে পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরু করেছিলেন গিল, আর সেই আয়ে পরিবারের খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। তার স্ত্রী মেলিসা আভালোসের ভাষ্যমতে, গিল তখন কাপড়, বুট, এমনকি প্যারাগুয়ে অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের সময়কার রেখে দেওয়া জার্সিটিও বিক্রি করে দেন। সেই সময়টা মনে করে তিনি বলেন, ‘ও সব বিক্রি করে দিয়েছিল।’
জীবন বদলে দেওয়ার সুযোগ আসে ২০২৩ সালের শেষ দিকে, যখন তিনি প্যারাগুয়ের ক্লাব সান লোরেনসো থেকে যোগ দেন তারই আর্জেন্টাইন প্রতিরূপ ক্লাবে। কোনো খ্যাতি ছাড়াই যোগ দেওয়া গিলকে প্রথমে রিজার্ভ দলে রাখা হয়, যেখানে মাঠে নামার আগে মাসের পর মাস অনুশীলন করেন। ২০২৪ সালের শেষ ম্যাচেই কেবল মূল দলের হয়ে অভিষেক হয় তার, তবে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ইনজুরির সুযোগ নিয়ে পরবর্তী প্রস্তুতি পর্বে জায়গা করে নেন এবং ২০২৫ মৌসুম শুরু করেন মূল গোলরক্ষক হিসেবে।
আর্জেন্টাইন ফুটবলেও তার প্রথম বড় রাতটি এসেছিল টাইব্রেকারেই। ২০২৫ সালের মে মাসে ম্যাক্সিমিলিয়ানো রোমেরোর পেনাল্টি ঠেকিয়ে আর্জেন্তিনোস হুনিয়র্সকে বিদায় করে সান লোরেনসোকে তোরনেও আপের্তুরার সেমিফাইনালে তুলতে সাহায্য করেন হিল। ততদিনে দেশের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়া গিল ডাক পান প্যারাগুয়ে জাতীয় দলে, এবং সেই বছরেরই সেপ্টেম্বরে পেরুর বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানের জয়ে অভিষেক হয় তার।
এক বছরও পেরোয়নি, এর মধ্যেই ছেলের চিকিৎসার জন্য নিজের ফুটবল স্মারক বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া এই খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন গুস্তাভো আলফারোর জাতীয় দলের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য গল্পগুলোর একটিতে। টুর্নামেন্টে কখনো টাইব্রেকারে না হারা জার্মানির বিপক্ষে হিল কেবল ‘প্যারাগুইয়ান কোর্তোয়া’ হয়েই থাকেননি। নিজের দেশের ইতিহাসে এখন তিনি বহন করছেন নিজস্ব এক নাম।

























