ছায়া থেকে নেতৃত্বে কাসেমিরো


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ১১:৫০ পিএম
ছায়া থেকে নেতৃত্বে কাসেমিরো

ফুটবলে সব গল্প গোলের নয়। কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে অন্যদের উজ্জ্বল করে তোলেন। কাসেমিরোর পুরো ক্যারিয়ার সেই দর্শনেরই জীবন্ত উদাহরণ।


পুরো নাম কার্লোস হেনরিকে কাসেমিরো। জন্ম ১৯৯২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, ব্রাজিলের সাও জোসে দোস কাম্পোস শহরে। ফুটবলের ভাষায় তিনি ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার।এই পরিচয় তার জন্য খুব ছোট। কাসেমিরো মাঠে থেকে দলের গতি নিয়ন্ত্রণ,আক্রমণের ভিত্তি গড়া আবার বিপদ আসার আগেই সেটি থামিয়ে দেন।

সব নায়ককে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। কাসেমিরো সেই নায়ক যিনি,নীরবে পুরো যুদ্ধটাই জিতিয়ে দেন।

শৈশব খুব সহজ ছিল না। পরিবারের আর্থিক সংগ্রাম তার জীবনের অংশ ছিল। স্থানীয় মাঠে বল পায়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটি ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যায় ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সাও পাওলোর একাডেমিতে।

ড্রিবল দিয়ে পাঁচজন কাটিয়ে যাওয়ার নায়ক ছিলেন না।  বল কেড়ে নেওয়া, জায়গা বন্ধ করা, আক্রমণের পথ তৈরি করতেন।

পেশাদার ফুটবলে পথচলা শুরু সাও পাওলোতে। সেখান থেকে আসে ইউরোপের ডাক। ২০১৩ সালে যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদে। বড় ক্লাবে নাম লেখানো আর সেখানে নিজের জায়গা তৈরি করা এক নয়। শুরুর সময়টা সহজ ছিল না। সুযোগ সীমিত ছিল, প্রত্যাশা বড় ছিল। পরে ধারে পাঠানো হয় পোর্তোতে। অনেকেই ভেবেছিলেন, এটাই হয়তো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার শুরু। কাসেমিরো অন্যরকম ছিলেন। পোর্তোতে কাটানো সময় তাকে বদলে দেয়। তিনি আরও পরিণত হন, আরও আত্মবিশ্বাসী হন। ফিরে এসে রিয়াল মাদ্রিদে তৈরি করেন আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে সফল মাঝমাঠ ত্রয়ীর একটি। লুকা মদ্রিচ, টনি ক্রুস আর কাসেমিরো।

মদ্রিচ খেলাকে ছন্দ দিতেন। ক্রুস পাসে খেলার ভাষা লিখতেন। আর কাসেমিরো ছিলেন সেই অদৃশ্য শক্তি, যিনি পুরো কাঠামোকে দাঁড়িয়ে থাকতে দিতেন। মদ্রিচ বলেছিলেন,’কাসেমিরো আমাদের ভারসাম্য। আমরা সামনে যা করি, তার অনেক কিছু সম্ভব হয় কারণ পেছনে সে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।’

টনি ক্রুসের চোখেও কাসেমিরো ছিলেন অন্যরকম। তার ভাষায়,

“অনেকেই গোলদাতা আর সৃজনশীল খেলোয়াড়কে দেখে। কিন্তু যারা ফুটবল বোঝে, তারা জানে কাসেমিরোর মতো একজন ছাড়া বড় দল তৈরি হয় না।”

রিয়ালের সেই সময়টা ছিল সাফল্যের এক দীর্ঘ অধ্যায়। লিগ, কাপ, সুপার কাপের পাশাপাশি একের পর এক উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জেতেন।কাসেমিরোকে নিয়ে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোও একবার বলেছিলেন,

“দলের ভেতরে এমন কিছু খেলোয়াড় থাকে যারা সবসময় আলো পায় না, কিন্তু জয়ের জন্য অপরিহার্য। কাসেমিরো তাদের একজন।”

তার সাবেক কোচ কার্লো আনচেলত্তির কথাও যেন তাকে সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা করে।

“সে শুধু বল কেড়ে নেয় না, সে ম্যাচ পড়ে। একজন কোচ হিসেবে এমন খেলোয়াড় পাওয়া বড় সৌভাগ্যের।”

২০২২ সালে কাসেমিরো যোগ দেন ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। নতুন দলে এসে প্রমাণ করেন, অভিজ্ঞতা কখনও পুরোনো হয় না। খেলার বুদ্ধি, অবস্থান বোঝার ক্ষমতা আর নেতৃত্ব তাকে এখনও আলাদা করে রাখে।

ব্রাজিলের বয়সভিত্তিক দল থেকে শুরু করে মূল দলে তিনি ধাপে ধাপে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। ব্রাজিলের জার্সিতে তাকে সবসময় সবচেয়ে আলোচিত মুখ হিসেবে দেখা হয়নি, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তার গুরুত্ব নিয়ে খুব কম মানুষেরই সন্দেহ ছিল।

ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের কথা,’কাসেমিরোর সঙ্গে খেললে বোঝা যায়, নেতৃত্ব সবসময় চিৎকার করে আসে না। কখনও কখনও নেতৃত্ব আসে উপস্থিতি দিয়ে।’

চলতি বিশ্বকাপেও কাসেমিরো নিজেকে চিনিয়েছেন। শুরুতে ব্রাজিলকে নিয়ে প্রশ্ন ছিল, সমালোচনা ছিল, কিন্তু মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে তিনি আবারও হয়ে উঠেছেন দলের ভারসাম্যের কেন্দ্র। জাপানের বিপক্ষে নকআউট পর্বের ম্যাচে প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়া ব্রাজিল ফিরে আসে তার গোল থেকেই। ৫৬ মিনিটে কাসেমিরোর হেডার শুধু সমতা ফেরায়নি, বদলে দিয়েছিল পুরো ম্যাচের গতি। পরে শেষ মুহূর্তের গোলে জয় তুলে নেয় ব্রাজিল।

Link copied!