ডাচদের অভিশপ্ত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ১০:২৯ পিএম
ডাচদের অভিশপ্ত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

টাইব্রেকার এবং নেদারল্যান্ডস— ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এই দুটি শব্দ যেন একই সুতোয় গাঁথা এক চিরন্তন ট্র্যাজেডির নাম। মরক্কোর বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ডাচদের অতি-রক্ষণাত্মক কৌশল দেখে মনে হচ্ছিল, তারা হয়তো ম্যাচটি টাইব্রেকারেই নিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু পেনাল্টি শুটআউটের সেই পুরনো ভূত এবারও তাড়া করল কমলা বাহিনীকে। মরক্কোর কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের সবচেয়ে দ্রুততম বিদায়ের লজ্জায় ডুবল ডাচরা। বিশ্বকাপে এর আগে অংশ নেওয়া প্রতি আসরেই অন্তত শেষ ষোলোতে খেলেছে নেদারল্যান্ডস। কিন্তু এবারের আসরে শেষ ৩২ থেকেই তাদের বাক্সপেটরা গোছাতে হলো। বিদায়ের এই চিত্রনাট্য ডাচ সমর্থকদের জন্য নতুন কিছু নয়, বরং তাদের অভিশপ্ত ফুটবল ইতিহাসের নিষ্ঠুর পুনরাবৃত্তি।

নেদারল্যান্ডস আর মরক্কোর লড়াইটা শুধু মাঠের ভেতর আবদ্ধ ছিল না, বরং মন্তেরেইয়ের গ্যালারি রূপ নিয়েছিল এক টুকরো কাসাব্লাঙ্কায়। এক যুগ আগের এক পুরনো ক্ষোভ থেকে স্থানীয় মেক্সিকানরা এদিন সমর্থন দিয়েছে মরক্কোকে। ২০১৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে একটি বিতর্কিত পেনাল্টিতে মেক্সিকোর বিদায় ঘটেছিল। গতকাল রাতে সেই ডাচদের সামনে পেয়ে মেক্সিকানরা বিখ্যাত চ্যান্ট ‘নো এরা পেনাল’ (ওটা পেনাল্টি ছিল না) স্লোগানে মুখর করে তোলে গ্যালারি। ম্যাচ জুড়ে ডাচদের ওপর যে মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল তৈরি করা হয়েছিল, তা মরক্কোর খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। গ্যালারির এই অকুণ্ঠ সমর্থনকে শক্তিতে রূপান্তর করেই ডাচ স্বপ্ন চূর্ণ করে দেয় মরক্কো। ম্যাচ শেষেও মেক্সিকোর আকাশ কাঁপিয়েছে দুই দেশের সমর্থকদের সমবেত বিজয়োল্লাস।

পেনাল্টি শুটআউটের লড়াইয়ে নামলেই যেন স্নায়ু ধরে রাখতে পারে না নেদারল্যান্ডস। বিশ্বকাপে চারবার টাইব্রেকারে গিয়ে তিনবারই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেছে তারা। ২০১৪ বিশ্বকাপে কোস্টারিকার বিপক্ষে একমাত্র জয়ের পর আর কখনো পেনাল্টি ভাগ্যে হাসেনি দলটি। সেই আসরের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার শক্তিশালী আক্রমণভাগকে ১২০ মিনিট বেঁধে রেখেছিল ডাচরা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম গোলশূন্য সেমিফাইনাল হিসেবে ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ালেও শেষ রক্ষা হয়নি। রন ভ্লার ও ওয়েসলি স্নাইডারের শট আর্জেন্টিনার গোলকিপার রোমেরো আটকে দিলে ৪-২ ব্যবধানের হারে বিদায় নিশ্চিত হয় নেদারল্যান্ডসের।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের জাদুতে ২-২ সমতা ফিরিয়েও টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরেছিল নেদারল্যান্ডস। সেবার প্রথম দুই শট মিসের খেসারত দিয়েছিল তারা। এবার মরক্কোর বিপক্ষেও ডাচদের বিদায় ঘটল সেই একই পেনাল্টি শুটআউটে, তবে এবার দায়টা তাদের নিজেদের কৌশলের। গাকপোর গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর খেলা যখন ১-১ সমতায় অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়, তখন নেদারল্যান্ডস আক্রমণ ভুলে পুরোপুরি খোলসবন্দি হয়ে পড়ে। ম্যাচটি পেনাল্টিতে নিয়ে যাওয়ার এই আত্মঘাতী জেদই কাল হলো দলটির জন্য।

শুটআউটে পরের চার শটের তিনটিই মিস করে বসে ডাচরা। দুটি শট গোলপোস্টের বাইরে মারা ছাড়াও সামারভিলের শটটি রুখে দেন মরোক্কান গোলকিপার বুনো। তিনবারের রানার্সআপদের এই বিদায় প্রমাণ করল, মাঠের ফুটবল বদলালেও নেদারল্যান্ডসের ভাগ্যলিপি বদলায়নি। ম্যাচ শেষে ডাচ অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক হতাশ কণ্ঠে বললেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা ঠিকঠাক কাজ করছিল। কিন্তু ইনজুরি টাইমে আমরা পিছিয়ে পড়তে বাধ্য হলাম। এরপর টাইব্রেকার... এবং দুর্ভাগ্যবশত আমরা বিদায় নিলাম।’

ডাচদের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়ে মরক্কো এখন বিভোর কোয়ার্টার ফাইনালের ছক তৈরিতে। রাউন্ড অব সিক্সটিনে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন পরীক্ষা। শেষ আটে ওঠার লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ আসরের অন্যতম আয়োজক দেশ কানাডা। বিশ্বকাপে অ্যাটলাস লায়ন্সদের এই রোমাঞ্চকর যাত্রা কতদূর যায়, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।

Link copied!