জন্মহারের ঐতিহাসিক পতন এবং ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকা কর্মক্ষম জনশক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চীন এখন রোবট ও অটোমেশনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিনের সস্তা শ্রমনির্ভর অর্থনীতির তকমা ঝেড়ে ফেলে বেইজিং এখন প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জন এবং একটি ‘হাই-টেক পাওয়ারহাউস’ হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
শি জিনপিং প্রশাসনের নেওয়া বিভিন্ন নীতি যেমন নগদ অর্থ সহায়তা, কর ছাড় কিংবা বিয়ে সহজ করার উদ্যোগগুলো জন্মহার বাড়াতে ব্যর্থ হওয়ার পর দেশটির উৎপাদন খাতকে রোবটনির্ভর করার প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত করা হয়েছে। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশ্লেষণে চীনের এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের চিত্র ফুটে উঠেছে।
চীনের এই জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সংকট দেশটির পেনশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, চীন যদি তার পুরনো অর্থনৈতিক মডেলেই পড়ে থাকে, তবে এটি ভবিষ্যতে একটি বিশাল জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অটোমেশনের সঠিক ব্যবহার এই সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
হংকং ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বিশেষজ্ঞদের মতে, রোবোটিক্স এবং ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে যদি উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা যায়, তবে তুলনামূলক কম কর্মী নিয়ে আরও বেশি শিল্প উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে চীন বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প রোবট বাজার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে যত রোবট ইনস্টল করা হয়েছে, তার অর্ধেকেরও বেশি হয়েছে চীনে। দেশটির অনেক কারখানায় এখন মানুষের পরিবর্তে রোবটিক হাত দিয়ে ওয়েল্ডিং, পেইন্টিং এবং অ্যাসেম্বলিংয়ের কাজ চলছে।
এমনকি সেখানে ‘ডার্ক ফ্যাক্টরি’ বা অন্ধকার কারখানার ধারণা ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে, যেখানে মানুষের সশরীরে উপস্থিতির প্রয়োজন নেই বলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে আলো পর্যন্ত জ্বালানো হয় না। এই উচ্চমানের অটোমেশনের কারণেই চীন বর্তমানে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং সোলার প্যানেল বিশ্ববাজারে সরবরাহ করে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখছে।
শিল্প রোবটের সাফল্যের পর চীন এখন হিউম্যানয়েড বা মানবসদৃশ রোবট তৈরির দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে। বর্তমানে দেশটির প্রায় ১৪০টিরও বেশি কোম্পানি সরকারি ভর্তুকি নিয়ে এ ধরনের উন্নত রোবট উন্নয়নে কাজ করছে। তবে ১৪০ কোটি মানুষের এই দেশে হঠাৎ এই দ্রুত প্রযুক্তিগত রূপান্তর স্বল্প মেয়াদে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা সামলানো বেইজিংয়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেষ পর্যন্ত শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে যে চীন এই জনসংখ্যাগত সংকট কাটিয়ে পুনরায় স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারবে কি না।
সূত্র: সিএনএন







































