• ঢাকা
  • রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১, ৪ শাওয়াল ১৪৪৫

মুশতাক-তিশার বিয়ে নিয়ে এত আপত্তি কিসে


আফরিদা ইফরাত
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৪, ০৬:৩৯ পিএম
মুশতাক-তিশার বিয়ে নিয়ে এত আপত্তি কিসে

‘অসম’ বিয়ের কারণে আলোচনায় রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সাবেক সদস্য খন্দকার মুশতাক আহমেদ ও তার স্ত্রী সিনথিয়া ইসলাম তিশা। বিয়ের পর নাটকীয় সব ঘটনায় একের পর এক পালাবদল আসতে শুরু করে ঘটনার। সারা দেশে বিষয়টি নিয়ে বহু তর্ক-বিতর্কও হয়েছে। সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় আসে এই দম্পতি।

বইমেলায় ‘তিশা অ্যান্ড মুশতাক’ নামের একটি বই প্রকাশ করে পাঠকসহ দেশব্যাপী অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হন তারা। সক্ষম বলতে হচ্ছে, কারণ বইটিকে সাহিত্যগুণসম্পন্ন বলা যাবে না। আত্মজৈবনিকও বলা চলে না। বরং নিজেদের বিষয়ে জানানোই বোধহয় তাদের উদ্দেশ্য ছিল। অসম বিয়ের কারণে প্রতিনিয়তই তাদের সমালোচিত হতে হচ্ছে। তাই বইয়ের মাধ্যমে জবাব দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হয়তো দুজনই দেখেছেন। কিন্তু বইমেলায় আপত্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয় দুজনকেই। বাধ্য হয়ে বইমেলায় দায়িত্ব নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের মেলা প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। তারপর শুরু হয় নানা বিতর্ক। এভাবে কাউকে বইমেলা থেকে বের করে দেয়ার বিষয়টি অনেকের কাছেই দৃষ্টিকটু লাগে। আবার অনেকে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রসঙ্গ টেনেও এমন বিষয়টিকে যৌক্তিক রায় দেন। পাঠক সমাজও এক্ষেত্রে কয়েকটি পক্ষে ভাগ হয়ে গেছেন। সামাজিক যোগাযোগ্যমাধ্যমে উত্তরহীনতা ও দিকনির্দেশনা না থাকার এমন চিত্র অনুধাবন করতে পারলে কিছুটা অসহায় লাগে তো বটেই।

তিশা ও মুশতাক গত বছর থেকেই ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত। ‘অসম বিয়ে’ এবং বাল্যবিবাহের স্পষ্ট পার্থক্য বোঝা কঠিন হওয়ার কথা না। দুজনের মধ্যে বয়সের পার্থক্য চওড়া হওয়ার পর ওই পার্থক্যটুকু আমাদের চোখে লাগে। এই চোখে লাগা যে কারো কাছেই স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। পার্থক্য চোখে লাগার পেছনে মানসিক অবস্থার প্রভাব রয়েছে। এ বিষয়ে ডেনমার্কের একটি গবেষণার কথা মনে পড়ছে। ভেন রেফাল তার ব্যক্তিগত ওই গবেষণায় দেখিয়েছেন, সচরাচর বর-কনের বয়সের ফারাক ২-৩ বছর হলে মানসিক সন্তুষ্টির জায়গা থাকে বেশি। যখনই দম্পতির বয়সের পার্থক্য সাত পেরিয়ে যায় তখন কিছু জটিলতা তৈরি হয়। এই জটিলতা ওই দম্পতির পরিবেশকে প্রভাবিত করে। প্রভাবিত করে সমাজকেও। ডেনমার্কের যাপিত জীবনের সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতির মিল নেই। তবে মানসিক প্রভাব ও সাংস্কৃতিক প্রভাবটিকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। তিশা-মুশতাকের ক্ষেত্রে সমস্যা প্রাথমিকভাবে এমনই। সমস্যা মূলত দুজনের বিয়েকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও সূক্ষ্মভাবে দেখলে বোঝা যাবে, তাদের বিয়ের প্রক্রিয়াটি সমাজ মেনে নিতে পারেনি। বাল্যবিবাহের বাস্তবতা এক রকম। এ নিয়ে আলোচনাও কম হয়নি। অসম বিয়ের ক্ষেত্রে দম্পতির মধ্যে মানসিক একতা থাকলেও পারিবারিক সম্মতি হয়তো থাকে না। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পারিবারিক সম্মতি না থাকার প্রসঙ্গও উঠে আসে। যেকোনো স্থানে কারো ব্যক্তিগত জীবন থেকে সামাজিক বিতর্ক পাওয়া গেলেই সাংবাদিকরা ভিড় জমান। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনুসন্ধানী হওয়ার তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়ে দাঁড়ায় বিতর্ক উপস্থাপন। এর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও থাকে। ২০২২ সালে এক কলেজ শিক্ষিকার সঙ্গে অন্য এক কলেজছাত্রের বিয়ের খবর দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। মামুন হোসেন নামের সেই কলেজ ছাত্রের বয়স ২২ বছর। কলেজ শিক্ষিকা খাইরুন নাহারের বয়স ছিল ৪০। শুরুতে এই আলোচনাকে অনেকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছিলেন। আবার ট্রলও হয়েছিল। বিষয়টি এতদূর গড়ায় যে ওই শিক্ষিকা একসময় আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার পেছনের খবরও আমাদের সামনে উঠে আসে। সবই জানা যায়। খাইরুন নাহারের পরিণতি মুশতাক-তিশার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলার কারণ নেই। তবে বিতর্ক দুজনের একইভাবে হয়েছে। মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতোই যেন। একটিতে নারী বয়সে বড়, অন্যটিতে পুরুষ। তবে মুশতাক-তিশার যে শ্রেণিগত অবস্থান, সেখান থেকে খাইরুন নাহারের মতো সংগ্রামও মিলিয়ে ফেলা যায় না। কিন্তু আমরা বিতর্কের দিকেই মনযোগী হতে চাই।

মুশতাক-তিশা আলোচনায় আসেন বইয়ের মাধ্যমে। এতদিনে তাদের জীবন আর ব্যক্তিগত নেই। বই লেখার পর তা আরও ব্যাপকভাবে সামাজিক পর্যায়ে চলে গেছে। হয়তো তা বাইরের দেশের আলোচনায়ও গেছে। বইমেলায় মুশতাক-তিশাকে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তা সামাজিক মতামতের খণ্ডিত একটি অংশ। বইমেলা থেকে কাউকে বের করে দেয়ার অধিকার কর্তৃপক্ষের নেই। তবে যদি মব নিরাপত্তা সংকট তৈরি করে তখন? সেক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই বের হয়ে যাওয়া প্রয়োজন ছিল। সেটাও পেশাদারিত্বের সঙ্গেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী করেছে। আলোচনায় এসেছে, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আক্রমণ করা ও সাহিত্য নিয়েও। আমাদের লক্ষ্য এই দম্পতি থেকে একটু বের হয়ে যাওয়া প্রয়োজন ছিল। প্রকাশনা ও মুদ্রণ নিয়ে এখনও আমাদের দেশে উদ্যোগ তেমন নেই। প্রতিবছর বইমেলায় মৌসুমী লেখকের আগমন ঘটে। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া সেলিব্রিটিরা বই লেখা শুরু করেছেন। সেটি লেখা মন্দ না। তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও জানা জরুরি। আমাদের জীবন ইবুক, মিডিয়ায় আটকে গেছে। তারপরও বইয়ের রয়েছে আলাদা আবেদন। বই লেখা হলে তার সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক ট্যাগ লাগে। তাই অনেকেই ফেরেন বই লেখার দিকে। বইয়ের পাঠক কমলেও বইয়ের কদর করেন এমন অনেকেই আছেন। আবার অনেকে বই সংগ্রহ করেন সেলিব্রিটিকে পছন্দ করে। মুশতাক-তিশা তাদের জীবনের ক্ষুদ্র সময় নিয়ে বই লিখেছেন। বইটির সাহিত্যগুণ বিচার করা জরুরি না। জরুরি হলো বইটিতে প্রকাশনীর মনোযোগ কতটা ছিল। তারা কতটা এডিট করেছে, প্রচ্ছদ কত ভালো করার চেষ্টা করেছে। আর বই প্রকাশ করার মানের প্রশ্ন এলে তারা বইটি ছাপালেন কেন? এমন অনেক প্রশ্ন আসে। যেকোনো আয়োজনে কিছু নীতিমালা ও শর্তাবলী প্রকাশনীর ক্ষেত্রে  থাকা উচিত। বইমেলার আয়োজনে যে কোনো বিষয়ে কেউ বই ছাপাতে পারেন। কিন্তু মান নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। লেখার মানোন্নয়ন, এডিটিং, প্রুফরিড এসবও ভালোভাবেই থাকা উচিত। অনেকের অভিযোগ, বই এখন পণ্য। বাণিজ্যিক ভাবনাই এখন প্রকাশনী ও লেখকদের ভাবনায়। তা হলেও সমস্যা কোথায়? বই সাংস্কৃতিক পণ্যই। কিন্তু বই বিক্রি করছে যে প্রকাশনী তারা এই পণ্যের পরিমার্জন ও সংশোধনে মনোযোগী হবেন না কেন? এই প্রশ্ন নিয়ে কেউ ভাবছে না কেন? প্রেক্ষাপট একটি হয়েছে।

অসম বিয়ে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হবেই। মুশতাক-তিশা নিয়েও বিতর্কের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় ভাবার সুযোগ থাকে। তবে এখানেও একটি বিষয় আসে। অসম বিয়েতে দম্পতির যেহেতু সম্মতি আছে সেহেতু তা আইন বহির্ভূত না হলে সমালোচনায় কিছু আসা-যাওয়ার কথা না। এদিকে মুশতাক-তিশা নিজেদের অসম বিয়ের বিষয়টিকে সঠিক প্রমাণিত করার চেষ্টা করছেন বেশি। এটিও অনেকের ভালো লাগছে না। লেবু বেশি কচলাতে নেই, এমন পরামর্শও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া যাবে। তেতো সত্য নিঃসন্দেহে। তবে গণমাধ্যমও এ বিষয়টিকে নিয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করছে না? টকশোতে ভিউ বাড়ানোর জন্য তাদের আহ্বান করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলার মঞ্চ আমরাও গড়ে দিচ্ছি। মুশতাক-তিশার কাছে এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে লোকদেখানো উদ্দেশ্য কি-না সে আলোচনা অবান্তর। বরং আমরা যে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছি তার দায় কার? আপনি তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এড়াতে পারছেন না। এর কিছুটা দায় ভিউবাণিজ্যের ওপরও বর্তায়। সবই এখন বাণিজ্যিক। তাহলে সাংস্কৃতিক-সামাজিক থাকে কি? এসব আলোচনাও জরুরি। মুশতাক-তিশা সাহিত্য করছেন কি-না অথবা কী বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন তা অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। তাদের ডাকা হচ্ছে, তারা বলছেন। আমরাও উপচে পড়ছি সমালোচনায়। চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছি বড় সংকট থেকে। ভাগ্যিস তিশা-মুশতাক সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। বিতর্ককে উস্কে দেয়ার মতো বক্তব্য তাদের পক্ষে কম। তবে তাদের অ্যাপ্রোচকে নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। সেটাও গঠনমূলক হোক, আমাদেরও তা-ই প্রত্যাশা। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা এত বিক্ষিপ্ত যে মবের সবাইকে ট্রল করা থেকে আর বিরত রাখতে পারবো না।

লেখক : সাংবাদিক

Link copied!