• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১,

দেশজ ফুটবল স্বপ্ন জড়ানো ব্যর্থতার আখ্যান


অঘোর মন্ডল
প্রকাশিত: এপ্রিল ১০, ২০২৩, ১২:৫৫ পিএম
দেশজ ফুটবল স্বপ্ন জড়ানো ব্যর্থতার আখ্যান

ইতিহাস আর স্বপ্ন নাকি পাশাপাশি পথ চলে। কিন্তু বাংলাদেশ ফুটবলের ইতিহাস খুঁজতে স্মৃতি যখন পথে নামে, তখন দেখা যায় স্বপ্নগুলো অলীক! যে স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। আবার ইতিহাস বাস্তবের মতো একই সরলরেখায় চলে না। ইতিহাস রচনায়, তার ভাষায়, অনেক কিছু ঢুকে পড়ে। যার কিছু মৌখিক ঐতিহ্য। কিছু মিথ।

এই মিথকে সঙ্গী করে বাংলাদেশ ফুটবল নিয়ে বহু মানুষের আক্ষেপ। আবার অনেকের স্বপ্ন বুনন। সাবেক ফুটবলাররা ভাবেন, তাদের সময় বাংলাদেশ দারুণ ফুটবল খেলেছে। তাদের দাবি, দেশজ ফুটবলের একটা সোনালি সময় ছিল। কিন্তু পরিসংখ্যান বলে, গত শতাব্দীর সত্তর-আশি এমনকি নব্বই দশক পর্যন্ত এ দেশে ক্লাব ফুটবলের জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু জাতীয় দলের তেমন বড় কোনো সাফল্য ছিল না। সে সময় বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনার বড় অনুঘটক ছিল ‘মোহামেডান-আবাহনী-ব্রাদার্স’ এই নামগুলো। যে ক্লাবগুলোর নামের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কোটি কোটি মানুষের আবেগ। কিন্তু নব্য ফুটবলপ্রেমী করপোরেট পুঁজির মালিকরা যখন ক্লাব মালিক হওয়ার স্বপ্ন বুনতে শুরু করলেন, তখনই ক্লাব থেকে সাধারণ মানুষ দূরে সরতে বাধ্য হন। তাদের আবেগ হাওয়া হয়ে যেতে থাকে। একই সঙ্গে নব্বই দশকের শেষ দিকে তারা নিজেদের স্বপ্নকে বাস্তবে দেখার ঠিকানা খুঁজে পায় ক্রিকেটের মধ্যে।

এরপর ক্রিকেট আর ফুটবল নিয়ে শুরু হয় অর্থ আর রাজনৈতিক শক্তির খেলা। ৯৭ সালে ক্রিকেটাররা আইসিসি ট্রফি জিতে আসেন। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে এ রকম এক চৈতালি বিকেলে। আর নববর্ষে কুয়ালালামপুর থেকে দেশে ফেরানো হয় তাদের বিশেষ বিমানে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে ক্রিকেটারদের গণসংবর্ধনা দেওয়া হয় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে। লাখ লাখ মানুষের ঢল নেমেছিল। জনাবেগের স্রোতে ভেসে যান ক্রিকেটাররা। কিন্তু ক্রিকেটারদের সেই নাগরিক সংবর্ধনায় দুঃখজনকভাবে উপেক্ষিত থাকলেন ক্রীড়াবিদরা। মঞ্চে জায়গা দূরে থাক, দর্শক আসনে সামনের সারিতে বসার সুযোগও পাননি সেই সময়ের ফুটবল-হকিসহ অন্য খেলার তারকারা। পুরোটা দখলে চলে রাজনৈতিক আর রাজনৈতিক দলের সুবিধাভোগী সাংস্কৃতিক কর্মীদের। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে হাঁটতে হাঁটতে আবাহনী ক্লাবে পৌঁছে সেদিন এপার বাংলা-ওপার বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলার প্রয়াত মোনেম মুন্না ক্ষোভ আর আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন, ‘এই ক্রিকেটারদের সাফল্যও রাজনীতিবিদদের দখলে চলে গেল। ওরা টের পেল না। দেশের ক্রীড়াঙ্গন অর্থশালী আর রাজনীতিবিদের হাতে পুরোপুরি চলে গেলে তার ফল ভালো হবে না দেখবেন।’

ইতিহাস সে কথাই বলছে। ক্রিকেটে সাফল্য আসার পর থেকে রাজনীতিবিদ আর অর্থবিত্তের মালিকদের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়। শুধু ক্রিকেট কেন, ফুটবলসহ সব ফেডারেশনে রাজনীতিবিদের আনা হলো। অথবা রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট লোকজন কোনোরকম সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় না দিয়েই বিভিন্ন ফেডারেশনের শীর্ষ পদ পেয়ে গেলেন।

বড় খেলোয়াড় কিংবা তারকা খেলোয়াড় হলেই বড় সংগঠক হওয়া যায় না, তার প্রমাণ মিলছে দেশের একসময়ের জনপ্রিয় খেলা ফুটবলে। দেশজ ফুটবলে না আছে সাফল্য, না আছে দর্শক। একসময় যে ফেডারেশন ক্রিকেট বোর্ডকে ঋণ দিত, সেই বাফুফে নিজেরাই দেউলিয়া ঘোষণা করার পথে। বাফুফে সভাপতি বলেছেন, তার টাকা নেই। নারী দলকে প্রাক্‌-অলিম্পিক বাছাই খেলার জন্য মিয়ানমারে পাঠানোর টাকা তাদের নেই।

তাই যদি হয়, তাহলে বাংলাদেশ ফুটবলের এই দীনতার জন্য অন্য কাউকে দোষ দেওয়া যায় না। যে ভদ্রলোক নিজে দাবি করেন, তার একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। তিনি সবার মতো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার আলাপের কথা সাংবাদিকদের বলতে পারেন না। কিন্তু দিন শেষে পরিষ্কার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফুটবল নিয়ে কম কথাই হয় তার। তা না হলে সাত মাস আগে যে নারী ফুটবলাররা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে দেশের মানুষকে আনন্দে ভাসলেন, তারা পাশের দেশে খেলতে যেতে পারলেন না টাকার অভাবে। সেটা প্রধানমন্ত্রী জানলেন দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর।

সাংগঠনিক দক্ষতা, দূরদর্শিতা থাকলে ৫০-৬০ লাখ টাকার জন্য নারী ফুটবলারদের মিয়ানমার সফর বাতিল হতো না। নারীরা সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফেরার পর বিসিবি ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। সেই টাকাসহ ফুটবলারদের হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধিত করা যেত। কিন্তু সেটাও তারা পেলেন না। কারণ বাফুফে কর্তারা বিসিবিতে যাওয়ার মতো সময় পাননি। শেষ পর্যন্ত পাঁচ-ছয়জন ফুটবলার আর কোচ গিয়ে টাকাটা আনলেন।

যারা প্রায় দেউলিয়া, তাদের এত উজ্জ্বল ব্যাকগ্রাউন্ড আর আত্মসম্মান দিয়ে দেশের ফুটবলের কী হবে। শুধু স্বপ্ন দেখানো আর গল্প শুনিয়ে নিজেদের পদ-পদবি ধরে রাখা যেতে পারে। ফুটবলকে এক ইঞ্চি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

কিন্তু স্মৃতি ধীরে ধীরে মুছে যায়। ইতিহাস বাঁকে বাঁকে পাল্টে যায়। এই বদলে যাওয়া আর পাল্টে যাওয়ার মধ্যে এ দেশের মানুষ ভুলে যেতে পারে, উনিশ শতকে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সঙ্গে একই সময়ে এই ভূখণ্ডেও ফুটবল নামক খেলার প্রচলন হয়েছিল। ফুটবল কর্তাদের ব্যর্থতা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, আর অলীক স্বপ্ন দেখানো দেশের মানুষকে ফুটবল ভুলে থাকার প্রণোদনা জোগাচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক 

Link copied!