• ঢাকা
  • শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯

প্রেমের টানে দেশান্তর : ভিন্ন ভাবনা


তানিয়া কামরুন নাহার
প্রকাশিত: আগস্ট ৯, ২০২২, ০৯:২৪ এএম
প্রেমের টানে দেশান্তর : ভিন্ন ভাবনা

সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে ডালিমকুমার এসেছে বন্দি রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে। কিসের টানে সে এত দূর পথ পাড়ি দিয়ে এলো? প্রেমেরই টানে। নইলে ব্যঙ্গমা আর ব্যঙ্গমীর কাছে বন্দি রাজকন্যার কথা শুধু কানে শুনেই সে এত দূর পাড়ি দিল কেন? প্রেম ছাড়া আর তো কিছু নয়। কিন্তু এ তো গেল রূপকথার গল্প। বাস্তবেও ইদানীং ভার্চুয়াল পরিচয়ের সুবাদে ভিনদেশের তরুণ-তরুণীরা সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে আসছে বাংলাদেশে। তাদের প্রেম ও বিয়ে নিয়ে বেশ ফলাও করে পত্রপত্রিকায় নিউজ হচ্ছে—প্রেমের টানে বাংলাদেশে এলেন অমুক দেশের তরুণ বা তরুণী। এলাকাবাসী থেকে শুরু করে পুরো দেশের মানুষ এমন সব খবরে চায়ের কাপে ঝড় বইয়ে দিচ্ছে।

প্রিন্ট ও ই-মিডিয়াতে এমন সব খবরে তরুণ-তরুণীরাও ভিনদেশি কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব ও প্রেম করায় আরও বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ছে। এ আগ্রহ অবশ্য বরাবরই ছিল। নইলে ‘ওগো বিদেশিনী, তোমার চেরি ফুল দাও, আমার শিউলি নাও’ গান হবে কেন? একসময় দেশে পত্রমিতালীর চর্চা ছিল। চিঠির মাধ্যমে অচেনা কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করার মধ্যে একধরনের রোমাঞ্চ ও অ্যাডভ্যাঞ্চার রয়েছে। সেই বন্ধুত্ব থেকে প্রেম বিয়ের ঘটনাও কম নয়। বিদেশিদের সঙ্গেও পত্রমিতালী হতো। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চিঠি লেখার অভ্যাস ও চল হারিয়ে গেলেও মানুষের যে সহজাত প্রবৃত্তি—বন্ধু ও প্রেমের সন্ধান করা, তা রয়েই গেল। শুধু বদলে গেল সন্ধান করার প্রক্রিয়া। মোবাইল ও ডিজুস যুগেও ভার্চুয়াল জগতে চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি প্রচুর বন্ধুর সন্ধান পাওয়া যায়।

প্রেম করে বিয়ের নজিরও রয়েছে। আবার প্রতারিত হওয়ার ঘটনাও আছে প্রচুর। প্রেমের ফাঁদে ফেলে ভিডিও করে ব্ল্যাকমেল করার উদাহরণও কম নয়। এমনকি নারী সেজে প্রেমের অভিনয় করে অর্থ প্রতারণার ঘটনাও রয়েছে। কিন্তু এসব ঘটনা এত দিন ঘটত দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। ভার্চুয়ালি দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব ও প্রেমের সন্ধান করা ঝুঁকিপূর্ণ ভেবেই হয়তো এখনকার তরুণ-তরুণীরা বিদেশিদের প্রতি ঝুঁকছে। এরই ফলাফল হিসেবে ইদানীং আমরা দেখি এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রেমের টানে তরুণ-তরুণীদের বাংলাদেশে ছুটে আসতে।

বিদেশি তরুণ-তরুণীদের প্রতি এত আকর্ষণ কেন বাংলাদেশিদের? কেউ ইংরেজি বা অন্য কোনো বিদেশি ভাষায় আরও দক্ষ হওয়ার জন্য বিদেশিদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি বন্ধুত্ব করেন। এখন তো বন্ধুত্ব করাও সহজ। আর সরাসরি দেখা না হওয়ার কারণে সহজে মনের অনেক কথাই শেয়ার করা যায়। কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘অন্তর্জাল’ বইটি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লং ডিস্টেন্স সম্পর্কের সুবিধা ও অসুবিধা একটিই, আর তা হলো—দূরত্ব। দূরত্বের কারণে অনেক দায়িত্ব ও চাপ ছাড়াই সম্পর্কে যেমন চালিয়ে নেওয়া যায়, আবার চাইলেই দুজন দুজনকে খুব একান্ত পেতে পারে না। এ ধরনের লং ডিসটেন্স সম্পর্কে শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়। কেননা এতে কেউ কারও ব্যক্তিস্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না। কাছাকাছি থাকলেই পরস্পরের দোষত্রুটিগুলো সরাসরি চোখে পড়ে আর এ কারণেই মানিয়ে চলায় সমস্যা হয়। এরপর সম্পর্কচ্ছেদে গিয়ে বিষয়টা গড়ায়। কিন্তু লং ডিস্টেন্স সম্পর্কে এ রকম দ্বন্দ্ব ঘটার সম্ভাবনা কম থাকে, ফলে ব্যক্তি চাপমুক্ত থাকতে পারে। আসলে দূর থেকে সবই একটু বেশিই সুন্দর লাগে। যারা সহজে কোনো কমিটমেন্টে জড়াতে চায় না, তাদের জন্য ভার্চুয়াল বা লং ডিস্টেন্স সম্পর্কে সুবিধাজনক। আর এ কারণেই বর্তমানে সারা বিশ্বেই এমন সম্পর্ক বাড়ছে। ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীরাও।

তবে বন্ধু, প্রেম ও বিয়ের ব্যাপারে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে কিছু মূল্যবোধ কাজ করে। প্রেম ও বিয়েকে মহান ও পবিত্র হিসেবে বিবেচনা করায় ভার্চুয়ালিও তারা কমিটমেন্ট বজায় রাখতে পারে। এ কারণেও বিদেশিরা প্রেমের টানে এভাবে বাংলাদেশে ছুটে আসছে। তবে নিজ দেশের মানুষের সঙ্গে যারা ভার্চুয়ালি প্রতারণা করতে পারে, তারা কি বিদেশি তরুণ-তরুণিদের সঙ্গেও একই কাজ করতে পারে না? এছাড়া বিদেশ গমনের পথ সুগম করার জন্যও অনেক বিদেশিদের বিয়ে করতে আগ্রহী হন। তবে যত যা-ই হোক, দু-পক্ষের সম্মতি থাকে বলেই প্রেম বা বিয়ের ঘটনাগুলো ঘটছে।

সংবাদপত্রে যেভাবে বিদেশিদের সঙ্গে প্রেম ও বিয়ের ঘটনাগুলো ফলাও করে দেখানো হয়, এতেও অনেকে উৎসাহিত হন। তবে এ দম্পতিদের অবস্থা দু-এক বছর পর কেমন হয়, তা নিয়ে কোনো ফলোআপ নিউজ হয় না। ফলে আমাদের আর জানা হয় না, সেই দম্পতিরা সুখে আছেন, নাকি বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। নাকি বিদেশি কোনো নাগরিক প্রতারণার শিকার হলেন। নাকি বাংলাদেশের তরুণ পেয়ে গেছে স্বপ্নের দেশের ভিসা কিংবা নাগরিকত্ব!

আবার উল্টো ঘটনাও ঘটতে পারে। নারী পাচার, মাদক ব্যবসা বা পর্নোগ্রাফির উদ্দেশ্যে বিদেশিরা বাংলাদেশে প্রেম ও বিয়ের ফাঁদ পাতছে! তাই বিদেশিদের সঙ্গে ভার্চুয়াল সম্পর্ক পাতানোর আগে সতর্ক থাকতে তো হবেই। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েরা প্রেমের জন্য বিদেশিদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি পরিচয়ের মাধ্যমে ব্ল্যাঙ্কডেট করতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হতে পারে। তাই এ ব্যাপারে অভিভাবকদেরও সচেতনতার দরকার আছে।

সম্প্রতি তামিলনাড়ু থেকে প্রেমকান্ত নামের একজন প্রেমিক প্রেমের টানে চলে এসেছিল বাংলাদেশে। প্রেমের জন্য তার স্ট্রাগলের গল্প শুনে যে কারোরই মায়া হবে। নেটিজেনেরা অনেকেই মন্তব্য করছেন, ইউরোপ আমেরিকার কোনো দেশের যুবক হলে হয়তো মেয়েটির অভিভাবক অপ্রাপ্তবয়স্ক হলেও মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিতেন। অথচ যথেষ্ট অর্থ, সময় ও শক্তি অপচয়ের পরেও শেষ পর্যন্ত প্রেমাকান্ত তার প্রেমিকার মন পেল না। একজন ভিনদেশি যুবক তো আর এমনি এমনি এভাবে অচেনা অজানা জায়গায় চলে আসে না। এ সত্যিই বড় প্রেমের টান। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটির অভিভাবকেরও এতে অবশ্যই দায় রয়েছে। আপনার সন্তানের অবিবেচনা আর খামখেয়ালির কারণে, কোথাও কেউ কষ্ট পাচ্ছে কি না, সেটুকুও বিবেচনায় রাখুন। প্রেমকান্তর ঘটনাটি আমাদের সবার জন্য হতে পারে একটি শিক্ষা।

লেখক : শিক্ষক ও লেখক

Link copied!