• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই, ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১, ১০ মুহররম ১৪৪৫

ডারবানে হারের মাঝে উজ্জ্বল জয়


অঘোর মন্ডল
প্রকাশিত: এপ্রিল ৫, ২০২২, ০২:৩৫ পিএম
ডারবানে হারের মাঝে উজ্জ্বল জয়

মানুষের স্মৃতি নাকি ক্ষণজীবী! বেডরুম থেকে চৌকাঠ পেরোতে পেরোতেই তার আয়ু ফুরিয়ে যায়। কিংসমিডে ৫৩ রানে বাংলাদেশের অলআউট হয়ে যাওয়াকে আরও তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে চাইবেন দেশের ক্রিকেটানুরাগীরা। কিন্তু চাইলেই কি পারবেন? ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় ধুলা জমতে একটু সময় তো লাগবে। তার আগে এই ৫৩ নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ কম হচ্ছে না। ডারবান টেস্ট হারের পরই বলাবলি শুরু হয়ে গেছে, ‘সামার অব ফিফটি থ্রি!’ যদিও দক্ষিণ আফ্রিকায় এখন সামার যাই যাই করছে। উইন্টারের আগাম শীতল হাওয়া বইতে শুরু করেছে।

পরের টেস্ট পোর্ট এলিজাবেথে। সেখানে ঘুরে দাঁড়াতে পারলে বাংলাদেশ দলের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের শিরোনামটা পাল্টে যেতে পারে। লেখা হতে পারে, ‘আ টেল অব উইন্টার’। প্রোটিয়ার মাটিতে প্রথমবার ওয়ানডে সিরিজ জয়। তারপর যদি টেস্ট সিরিজটা ড্র করে আসা যায়, সেটা তো একটা নতুন গল্প হবে বাংলাদেশ ক্রিকেটে।

কিংসমিডের এই অভিশপ্ত ৫৩-এর টেস্টে সন্তুষ্টির একমাত্র মুখ মাহমুদুল হাসান জয়। একটু কম বলা হলো। গৌরবের মুখ জয়। কী অসাধারণ একটা ইনিংস খেলেছেন তিনি। ৪৪২ মিনিট উইকেটে থাকলেন। ৩২৬ বল খেললেন। ১৩৭ রানের চোখকাড়া এক ইনিংস খেললেন। তর্কযোগ্যভাবে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের অন্যতম সেরা টেস্ট ইনিংস। দক্ষিণ আফ্রিকান সামারের চেয়ে উপভোগ্য ছিল তার ইনিংস। কিন্তু বাংলাদেশ দলের দ্বিতীয় ইনিংসে যেভাবে ‘স্পিন গ্রহণ’ লাগল, তাতে আড়াল হয়ে গেল ওই তরুণের তারুণ্যদীপ্ত কিন্তু পরিণত মস্তিষ্কের ব্যাটিংটা।

জয় বড় কোনো নাম নয়। বিশ্ব ক্রিকেটও তাকে সেভাবে হয়তো চেনে না। কিন্তু তার ইনিংস আভাস দিয়েছে আগামীর তারকা হওয়ার। টেস্টের জন্য দরকার মানসিকতা। সেটা ফুটে বেরিয়েছিল তার ইনিংসে। মানসিকতা বলতে শৃঙ্খলা, দায়বদ্ধতা, ধৈর্য এবং বিচক্ষণতা। সঙ্গে ছিল স্ট্রোক মেকিংয়ের অদ্ভুত ঔদ্ধত্য। সেই লোকটাই কিনা টেস্ট শেষে হয়ে গেলেন বিষণ্ণতায় আক্রান্ত এক পার্শ্বনায়ক। কারণ, কিংসমিডে শেষ দিনে রাজত্ব করলেন কেশব মহারাজ নামের এক স্পিনার। আর তাতেই রচিত হলো বাংলাদেশের জন্য, ‘দ্য ট্র্যাজেডি অব ফিফটি থ্রি!’ তারপরও জয়ের জন্য বারবার একটা কথা লিখতে ইচ্ছা করছে, ‘হাল ছাড়বেন না। কিংসমিডে হয়নি। পোর্ট অব এলিজাবেথে হতে পারে। সেখানে না হলেও অন্য কোথাও হবে। সংকল্প আর লড়াইয়ের মানসিকতাকে হারিয়ে যেতে দিয়েন না।’ সিরিজে বাংলাদেশ ০-১-এ পিছিয়ে। কিন্তু জয়, আপনি কিন্তু ১-০-তে এগিয়ে।

‘সামার অব ফিফটি থ্রি’ এই কালচে স্টিকারটা লেগে গেল বাংলাদেশের গায়ে, তাতে জয়ের সেঞ্চুরির গৌরবটা ঢাকা পড়ে গেল! কিন্তু এর কৃতিত্ব মহারাজ-হারমারদের যদি হয়, ব্যর্থতার দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে বাংলাদেশের থিঙ্কট্যাংককে। ডব্লিউ জি গ্রেসের থিওরির পিন্ডি চটকাতে চটকাতে অতি বিপ্লবী হওয়ার স্বপ্ন দেখলেন তারা। টস জিতে আগে ব্যাটিংয়ের পরিবর্তে ফিল্ডিং নেওয়ার দুঃসাহস দেখালেন। তার চেয়ে বড় চমক তারা তিন সিমার নিয়ে একাদশ সাজালেন। দলে স্পিনার বলতে একজন। হয় কিংসমিডের ইতিহাস জানেন না তারা, না হয় মাঝখানের বাইশ গজ পড়ে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না তাদের! কিন্তু এই দলে তো বেশ কয়েকজন দক্ষিণ আফ্রিকান আছেন। যাদের ডলার ডলার গুনে দিয়ে রাখা হয়েছে দলের সঙ্গে! তারাও কি জানেন না; কিংসমিডে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করা কঠিন হতে পারে। নাকি তারা ভেবেছিলেন; কিংসমিডে বাংলাদেশ টাইমলেস টেস্ট খেলতে নামছে। কোনো সমস্যা হবে না!’

বাংলাদেশ তো আসলে টেস্টে কোনো বল মাঠে গড়ানোর আগে আত্মহত্যার পথে হেঁটেছিল। এখন ম্যাচ শেষে তার হত্যাকারীর নাম কেশব মহারাজ না সাইমন হারমার, সেটা খুঁজে আর লাভ কী! সঙ্গে সন্দেহভাজন হিসেবে দেখছেন দুই আম্পায়ারকে! আর যে অস্ত্রে বিধ্বস্ত হলো বাংলাদেশ তার নাম ‘স্পিন’ না বলে বলার চেষ্টা হচ্ছে ‘স্লেজিং’! আরে বাবা, টেস্ট ক্রিকেটে স্লেজিং হবে। সেটা সহ্য করার ক্ষমতা না থাকলে পুরুষ হয়ে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে নামলেন কেন!

লেখক : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক
 

Link copied!