নীতিমালার শর্ত মানছে না ৭০ ভাগ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ


সংবাদ প্রকাশ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ১১:০৩ এএম
নীতিমালার শর্ত মানছে না ৭০ ভাগ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ

দেশের ৭৩টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অন্তত ৭০ শতাংশই নানা ঘাটতি নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। মানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের নির্ধারিত শর্ত ও নীতিমালা অনেক প্রতিষ্ঠানই পূরণ করতে পারেনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া মানহীন চিকিৎসকেরা দেশের স্বাস্থ্যসেবায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়ও পিছিয়ে পড়ছেন তারা।

 

বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে মেডিকেল শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তবে প্রতিষ্ঠার প্রায় চার দশক পরও কলেজটি পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কোনো ক্যাম্পাস নেই। পাশাপাশি শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি রয়েছে পর্যাপ্ত টিউটোরিয়াল কক্ষেরও অভাব।

 

নীতিমালা অনুযায়ী, একটি মেডিকেল কলেজ ও এর হাসপাতাল নিজস্ব কমপক্ষে দুই একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। একই ক্যাম্পাসে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের জন্য পৃথক ভবন থাকতে হবে। প্রতি শিক্ষার্থীর বিপরীতে হাসপাতালে পাঁচটি শয্যা, প্রতি ১০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আবাসনের ব্যবস্থাও বাধ্যতামূলক।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, পর্যাপ্ত ইকুইপমেন্ট নাই। পর্যাপ্ত শিক্ষক নাই, পর্যাপ্ত ল্যাব ফ্যাসিলিটি নাই আপনি তাদেরকে ডাক্তারের সার্টিফিকেট ধরায় দিলেন। সে নিজেকে ডাক্তার দাবি করছে। সে যখন ট্রিটমেন্ট করবে অর্থাৎ আপনার জীবনটা তার হাতে ছেড়ে দিলেন আপনি। কত ভয়ঙ্কর কথা। দিন শেষে এটার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তো দেশের মানুষ।


শুধু বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজই নয়, একই ধরনের ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ, শমরিতা মেডিকেল কলেজ, শাহাব উদ্দিন মেডিকেল কলেজ, সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, কিশোরগঞ্জের আবদুল হামিদ মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনূস মেডিকেল কলেজ, গাজীপুরের তায়েরুন্নেছা মেডিকেল কলেজ এবং রংপুরের নর্দান মেডিকেল কলেজের বিরুদ্ধেও।


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৩টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অন্তত ৫১টি সরকারি নীতিমালার সব শর্ত পূরণ করতে পারেনি। ফলে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় দক্ষ চিকিৎসক তৈরির লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে।

 

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, অনেক বেসরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষার মানের চেয়ে বাণিজ্যিক দিকটিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। এতে শিক্ষার মানের সঙ্গে আপস করতে হয়। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা চিকিৎসকেরা কাঙ্ক্ষিত মানের চিকিৎসাসেবা দিতে ব্যর্থ হতে পারেন, যা দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি।


সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) নিয়মিত তদারকি করলেও নীতিমালা লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার নজির খুবই কম।


বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক বেসরকারি মেডিকেল কলেজকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যেখানে শিক্ষার মানের চেয়ে বাণিজ্যিক দিকটি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এর ফলেই মানসম্মত চিকিৎসক তৈরির লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা চিকিৎসকেরা বিদেশের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাতেও পিছিয়ে পড়ছেন।

Link copied!