কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে আকাশ থেকে সমুদ্রে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন অক্ষর শৌভিক রায় (৩০) নামের একজন পর্যটক। তিনি খুলনা সিটি করপোরেশনের বানিয়াখামার এলাকার স্যার ইকবাল সড়কের বাসিন্দা শেখর রায়ের ছেলে।
শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর সৈকতে এ ঘটনা ঘটে। ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেলিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ এক যুগ ধরে দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করে আসছে। প্রায় সময় প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে পড়ে পর্যটক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় প্রশাসন পর্যাসেইলিংয়ে নিষেধাজ্ঞা দিলেও প্রতিষ্ঠানটি এটি চালু রেখেছিল। এ প্রসঙ্গে জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করেও ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেলিং প্রতিষ্ঠানের মালিক ও শহরের বাহারছড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ ফরিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি ফোন ধরেননি।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিহত শৌভিকরায়সহ ৯ জন যুবক খুলনা থেকে কক্সবাজার বেড়াতে আসেন। আজ দুপুর ১২টার দিকে অক্ষর শৌভিক তাঁর বন্ধুদের নিয়ে দরিয়ানগর সৈকতে যান। এরপর ২ হাজার টাকায় টিকিট কেটে আকাশে ওড়ার জন্য প্রস্তুতি নেন। দুপুর ১২টার সময় তাঁকে প্যারাসেইলিংয়ে বেঁধে আকাশে ওড়ানো হয়। প্যারাসেইলিং ৩০০-৪০০ ফুট ওঠার পর হঠাৎ শৌভিক রায় নিচে বঙ্গোপসাগরে ছিটকে পড়েন। কিছুক্ষণ পর প্যারাসেইলিং কর্মচারীরা সাগরের পানি থেকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
শৌভিকের সঙ্গে বেড়াতে আসা একজন যুবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্যারাসেইলিং থেকে যখন শৌভিক সমুদ্রের পানিতে ছিটকে পড়ছিলেন, তখন উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। দরিয়ানগরে কোনো লাইফগার্ড চোখে পড়েনি। একটি স্পিডবোট তখন শৌভিককে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়, ততক্ষণে সব শেষ।’
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ( ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, নিহত পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। বৈরী পরিবেশে প্যারাসেইলিং পরিচালনা এবং পর্যটকের মৃত্যুর বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
বৈরী পরিবেশের কারণে তিন দিন আগে দরিয়া নগরসহ সব প্যারাসেইলিং বন্ধ করা হয়েছিল বলে নিশ্চিত করেন জেলা প্রশাসক মো. আ মান্নান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সব ধরনের প্যারাসেইলিং বন্ধ ছিল। এর মধ্যে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্যারাসেইলিং করা হচ্ছিল। আজ এক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে, যা দুঃখজনক। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্যারাসেইলিং করার জন্য প্রশাসন থেকে কাউকে অনুমতি দেওয়া হয়নি।
সৈকতে গোসলে নেমে নিখোঁজ পর্যটকদের উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত বেসরকারি সি-সেফ লাইফ গার্ডের সুপারভাইজার সিফাত সাইফুল্লাহ বলেন, শহরের কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্টের পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে নিরাপত্তার জন্য ২৭ জন লাইফগার্ড কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু কলাতলী থেকে দক্ষিণ দিকে দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী, টেকনাফ পর্যন্ত ১১৫ কিলোমিটার সৈকতে কোনো লাইফগার্ড কিংবা ডুবুরি থাকে না।
নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই প্যারাসেইলিং
দরিয়া নগরসহ সৈকতের কয়েকটি পয়েন্টে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্যারাসেইলিং পরিচালনা করে আসছে বলে অভিযোগ করেন কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রায় সময় প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে পড়ে পর্যটক আহত হন। আজ একজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটল। কোনো প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই, নেই প্রশিক্ষিত অপারেটর, উদ্ধার জলযান ও প্রাথমিক চিকিৎসাব্যবস্থা। নিরাপত্তা মান যাচাই না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখা উচিত।
প্যারাসেইলিং করতে আসা ঢাকার পর্যটক কামাল উদ্দিন বলেন, প্যারাসেইলিংয়ের সঙ্গে থাকা মোটা রশি সমুদ্রের পানিতে রাখা একটি স্পিডবোটে বাধা হয়। এরপর প্যারাসেইলিং আকাশে উড়লে স্পিড বোট টেনে সেটিকে সমুদ্রের দিকে নিয়ে যায়। প্যারাসেইলিংয়ে উড়তে পারে একজন। ওঠানামার বিষয়টি যে উড়ছেন তার হাতে থাকে। অনেকে আকাশে উঠে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। তখন প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে পড়ার ঘটনা ঘটে। কিন্তু দ্রুত উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় লোকজন জানায়, ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে এক নারী পর্যটক ছিটকে ঝাউবাগানে পড়েন। গাছের ডগায় তিনি দীর্ঘক্ষণ আটকে ছিলেন। ওই ঘটনার পরদিন জেলা প্রশাসন সাময়িকভাবে সব ধরনের প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। ২০২৫ সালের ২০ মে দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং সময় আরেক পর্যটক সমুদ্রে ছিটকে পড়ে আহত হন।
























