গণমাধ্যম কমিশন গঠনের লক্ষ্যে একটি পরামর্শক কমিটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রোববার (১৭ মে) দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পাদক পরিষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা বলেছেন পরিষদের সভাপতি নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবির।
প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠকের পরে নুরুল কবির সাংবাদিক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে দীর্ঘ আলাপ আলোচনা হয়েছে। প্রধানত বাংলাদেশের যে ‘মিডিয়া অ্যারিনা’ যেটা আছে, তাতে আইনকানুনের মধ্যে যে অগণতান্ত্রিকতার অংশগুলো আছে সেগুলো সম্পর্কে আমরা তাকে অবহিত করেছি। অনেকগুলো বিষয়ে যে ‘রিভিউ’করা দরকার সেগুলোতে তিনি সম্মত হয়েছেন। বাংলাদেশে একটা গণতান্ত্রিক ‘মিডিয়া রেজিম’ করবার জন্যে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বয়ে একটা পরামর্শক কমিটি করে জুন মাস ধরে কাজ করে জুলাইয়ের কোনো একটা সময়ে একটা চূড়ান্ত রিপোর্ট তৈরি করে তার আলোকে একটা গণতন্ত্রপরায়ণ আইন তৈরি করবার জন্য আমরা সম্মত হয়েছি।
বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের নয় সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে দেন নিউএজ সম্পাদক।
পরিষদের অন্য সদস্যরা হলেন, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দিন, সুপ্রভাত বাংলাদেশ সম্পাদক রুশো মাহমুদ, করতোয়া সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক ও সাধারণ সম্পাদক বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।
বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি বলেন, অন্য যে সমস্ত নানান ত্রুটি বিচ্যুতি ‘প্র্যাকটিসের’ মধ্যে আছে সেগুলো থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায় এবং সেইখানে সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক আচরণ করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সম্পাদকগণ তাদের সঙ্গে এনগেইজ থাকবে…এটা আমরা কথা দিয়েছি। ওনারাও (সরকার) এটাকে ‘ওয়েলকাম’ করেছেন, এটাই মূল কথা ধরুন।
ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো কী ধরনের জানতে চাইলে নুরুল কবির বলেন, ধরুন ‘সোশাল মিডিয়ার’ কথা বলুন বা অন্যান্য, এটা সংশ্লিষ্ট মাধ্যম নানান ধরনের ‘মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন’ সমাজে আছে, সেটা সমাজের সকল অংশকেই নানানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এমনকি সাংবাদিকদেরকেও করে। সেগুলো থেকে বেরিয়ে এসে পুরো মিডিয়া জগতের একটা গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা, নির্ভরতা এর ওপর জনগণের কাছে তথ্যগত বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করবার জন্য যে সমস্ত নানান বাধা বিপত্তি আছে, সেগুলোকে দূর করবার জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করবার একটা ঐকমত্য আমাদের রয়েছে।
সম্পাদক পরিষদ বলেছে, গণমাধ্যম কমিশন গঠনের লক্ষ্যে যে কমিটি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, এই কমিটি অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রতিবেদন দেবে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালীকরণ, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনের বকেয়া পরিশোধ ও সংবাদপত্রের ডিক্লারেশনের বিদ্যমান শর্তাবলীর সময়োপযোগী করা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং সংবাদপত্র শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা একটা তালিকা দিয়েছি। সেখানে আমরা বলেছি যে প্রায় ২৮২ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মামলা হচ্ছে। তার মধ্যে ৯৪ জন হত্যা মামলার তারা আসামি, সেটা আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলেছি।
তিনি বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে সেই তালিকা দিয়েছি এবং এই তালিকাটা যে একদম সস্পূর্ণ তা বলব না, অসম্পূর্ণ থাকতে পারে। কিন্তু আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী সেটা গ্রহণ করেছেন এবং তথ্যমন্ত্রীকে বলেছেন এবং এ ব্যাপারে ওনারা একটা উদ্যোগ নেবেন।
মাহফুজ আনাম বলেন, আমরা খুব দৃঢ়ভাবে বলেছি যে এই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা এবং এত ধরনের মামলা এটা গণতান্ত্রিক দেশের পরিবেশের জন্য ভালো নয়। এই সরকারের ভাবমূর্তির জন্যও ভালো নয়।
প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কী বলেছেন? জবাবে ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, উনি এটা খুবই আন্তরিকতাভাবে নিয়েছেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে উনি এটা গ্রহণ করেছেন এবং বলেছেন যে ওনারা পরীক্ষা করবেন এবং এই ব্যাপারে ওনারা আগ্রহী।
বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, সরকারের তিন মাস পূর্ণ হলেও এ সময়ে সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের বাধার সম্মুখীন হননি।
বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী সম্পাদক পরিষদের নেতাদের নিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সারেন।
এর আগে গেল ৩ মে ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’ উপলক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সভায় তথ্যমন্ত্রী গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ‘গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের লক্ষ্যে অংশীজনদের নিয়ে একটি পরামর্শক কমিটি করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করা হবে; যারা একটি গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর গণমাধ্যম কমিশনের কাঠামো নির্ধারণে কাজ করবে। সম্পাদক পরিষদ, সাংবাদিক সংগঠন, গণমাধ্যম মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপের মাধ্যমে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।







