আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের পর বিপাকে পড়েছেন চিকিৎসাধীন রোগীরা। ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তাঁদের স্বজনেরা।
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের পর হাসপাতাল ছাড়ছেন চিকিৎসাধীন রোগীরা। তবে যেসব রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন, তাঁদের এখনো চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। আগামী রোববারের মধ্যে লাইসেন্স বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালটির জনসংযোগ বিভাগের শুক্রবারের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার লাইসেন্স বাতিলের সময় পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ৪১৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এর পর থেকে আজ বিকেল পর্যন্ত ১৭৩ জন রোগী হাসপাতাল ছেড়েছেন। ২৪৩ জন রোগী এখনো ভর্তি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এনআইসিইউতে ৫০টি নবজাতক, আইসিইউতে ১৩ জন এবং সিসিইউতে ৬ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন।
আদ্–দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল শুক্রবার রাতে বলেন, ‘যেসব রোগী এখনো চিকিৎসাধীন, তাঁদের বেশির ভাগের অবস্থা সংকটান্ন। তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হঠাৎ তাঁরা অন্য কোথাও যেতে পারছেন না।’
গতকাল বিকেলে হাসপাতালটি ঘুরে দেখা যায়, নতুন করে কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। জরুরি বিভাগের সেবা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। অনেকে হাসপাতাল ছেড়ে যাচ্ছেন। তবে যেসব রোগীর অবস্থা গুরুতর, তাঁরা এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসাধীন রোগীদের কয়েকজন স্বজনকে হাসপাতালটির ২ নম্বর ফটকের সামনে জড়ো হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
তাঁদের একজন আলী হায়দার। পেশায় মুদিদোকানি। গত ৪ মে ফেনীর দাগনভূঞা থেকে এক দিন বয়সী নবজাতককে নিয়ে হাসপাতালটিতে ভর্তি করান তিনি। প্রায় দেড় মাস ধরে তাঁর বাচ্চা নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) ভর্তি রয়েছে।
আলী হায়দার বলেন, ‘আমার বাচ্চা খাদ্যনালি বন্ধ অবস্থায় জন্ম নেয়। দুই দফায় সার্জারি করতে হয়েছে। দেড় মাস ধরে এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এখন হঠাৎ করে কোথায় যাব? অন্য হাসপাতালে তো অনেক খরচ। এত খরচ আমার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে এখানে থাকতে হচ্ছে।’
বড় বোন নিতু রানী মণ্ডলকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া থেকে প্রতি সপ্তাহে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস করাতে আসেন আরতি রানী মণ্ডল। হাসপাতাল বন্ধ হওয়ার খবর শুনে শুক্রবার বিকেলে ডায়ালাইসিসের খোঁজ নিতে আসেন তিনি।
লাইসেন্স বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তে ক্ষোভ জানিয়ে আরতি রানী বলেন, ‘তিন বছর ধরে ২৫০ টাকায় আমার বোনকে এখানে কিডনি ডায়ালাইসিস করাই। লাইসেন্স বাতিল করায় এখন আমরা কোথায় যাব? এত কম টাকায় তো অন্য কোথাও সেবা পাব না। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও হাসপাতালের কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা যেন চালু রাখা হয়। সরকারের কাছে এটাই দাবি।’
গত ২৭ মে সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে রাজধানীর মগবাজারের আদ্–দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতক মারা যায়। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না, তা জানাতে প্রতিষ্ঠানটির মালিক শেখ মহিউদ্দিনকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এ জন্য তাঁকে ৭ জুন বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নোটিশের জবাব দিলেও সরকার তাদের দেওয়া ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয় বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। লাইসেন্স বাতিল হলেও পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপিল বা পুনর্বিবেচনা করার আইনি সুযোগ রেখেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পুনর্বিবেচনার আবেদন করার কথা জানিয়েছেন আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল। রোববারের মধ্যে তাঁরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করবেন বলে জানান তিনি।
তারিকুল ইসলাম বলেন, তাঁরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। যার কারণে সরকারের নির্দেশনা মেনেই হাসপাতালটির সব সেবা বন্ধ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের কথা বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী রোববারের মধ্যে আপিল করবেন তাঁরা। ইতিমধ্যে আইনজীবীর সঙ্গেও কথা বলেছেন। সরকার জনস্বার্থে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান রাখতে অনুমতি দেবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।



































