• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১, ৬ মুহররম ১৪৪৫

মুন্ডা সম্প্রদায়ের জমি দখলের চেষ্টা, নারীসহ আহত ৪


সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: আগস্ট ১৯, ২০২২, ০৯:৩৭ পিএম
মুন্ডা সম্প্রদায়ের জমি দখলের চেষ্টা, নারীসহ আহত ৪

জমি জবরদখলে বাধা দেওয়ায় আদিবাসি মুন্ডা সম্প্রদায়ের তিন নারীসহ চারজনকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম করা হয়েছে। এ সময় ভাঙচুর করা হয়েছে মুন্ডাদের দুটি বসত বাড়ি। লুটপাটেরও অভিযোগ করা হয়েছে।  

শুক্রবার (১৯ আগস্ট) সকাল সাড়ে সাতটা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ধুমঘাট অন্তাখালি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

আহতদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

আহতরা হলেন, শ্যামনগর উপজেলার ধুমঘাট অন্তাখালি পশ্চিমপাড়ার সনাতন মুন্ডার স্ত্রী রিনা মুন্ডা (৩৫), একই পরিবারের লক্ষীন্দ্র মুন্ডার স্ত্রী সুলতা মুন্ডা (৪০), ফণীন্দ্র মুন্ডার স্ত্রী বিলাশী মুন্ডা (৩৬) ও মুল্লুক চদি মুন্ডার ছেলে নরেন্দ্রনাথ মুন্ডা (৭০)।

শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন বিলাশী মুন্ডা জানান, তার স্বামী ও শরীকদের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সাড়ে ২৭ বিঘা জমির একাংশে শুক্রবার সকালে তিনিসহ রিনা মুন্ডা, সুলতা মুন্ডা ও কাকা শ্বশুর নরেন্দ্র মুন্ডা কাজ করছিলেন। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে উপজেলার শ্রীফলকাটি গ্রামের গফুর সরদারের ছেলে রাশেদুল ইসলাম ও এবাদুল ইসলামের নেতৃত্বে বংশীপুর গ্রামের মুনসুর গাজীর ছেলে ফিরোজ , সুজন, ছিদ্দিকের চেলে রইবুল, শ্রীফলকাটি গ্রামের ফারেজ মহাজনের ছেলে মকিমসহ শ্রীফলকাটি, বংশীফুর ও ঈশ্বরীপুর গ্রামের দুই শতাধিক ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী হাতে দা, বল্লভ, লাঠি, লোহার রড, বেলচা, কুড়াল ও একটি বড় পাওয়ার টিলার নিয়ে তাদের জমিতে ঢুকে পড়ে। এ সময় তারা তাদের এক বিঘা জমিতে লাগানো ধানের পাতা পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ করে নষ্ট করার একপর্যায়ে বাধা দিলে তাদের চারজনকে বিলের মধ্যে কাদার মধ্যে পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম করা হয়। তাদেরকে রক্ষায় এগিয়ে এলে নিরাপদ মুন্ডা, প্রদাস মুন্ডা, মণীষা মুন্ডা ও নমিতা মুন্ডা লাঞ্ছিত হন।

প্রত্যক্ষদর্শী নিরাপদ মুন্ডা ও নমিতা মুন্ডা জানান, হামলাকারিরা ফণীন্দ্র মুন্ডা ও সনাতন মুন্ডার এসবেস্টারের চাল ভাঙচুর করে। লুটপাট করা হয় ঘরের জিনিসপত্র। মারপিট ও ভাঙচুরের ছবি তুলতে গেলে রিনা মুন্ডার হাতে দা দিয়ে কোপ মেরে জখম করা হয়। কেড়ে নেওয়া হয় তার মোবাইল ফোনটি। এ সময় বিলাশী মুন্ডার কান থেকে সোনার দুল কেড়ে নিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালায় হামলাকারীরা।

তারা আরও জানান, প্রথমে থানায় উপ-পরিদর্শক তরিকুলের কাছে ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে মোবাইল ফোনে জানিয়েও কোনো লাভ না হওয়ায় ৯৯৯ এ ফোন করলে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপ-পরিদর্শক রিপন হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ এসে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করে।

ফণীন্দ্র মুন্ডা জানান, তার ঠাকুর দাদা মুল্লুক চাদ এর ধুমঘাট মৌজার ৯, ১০, ১৩ ও ১৪ দাগে ৯ একর ১৭ শতক বাদা বা বন কাটা সম্পত্তি রয়েছে। সাবেক ও এসএ খতিয়ানে ওই জমি মুল্লুক চাদের নামে রেকর্ড হয়। এরপর মুল্লুক চাদের কাছ থেকে শ্রীফলকাটি গ্রামের আব্দুল গফুর সরদার ১৯৫০ সালে দুই একর ৬৬ শতক বা ৫ বিঘা জমি পাট্টা দলিল মূলে কিনেছেন দাবি করে আসছে গফুর সরদারের দুই ছেলে রাশেদুল সরদার ও এবাদুল সরদার।

তিনি জানান, ২০১৭ সালে রাশেদুল ও এবাদুল জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে তাদের কোনো প্রকার নোটিশ না দিয়েই আদালত থেকে এক তরফা ডিক্রি করে নেয়। বিষয়টি তারা জানতে পেরে ওই বছরেই তার কাকা নরেন্দ্র মুন্ডা বাদি হয়ে ডিক্রি রদের মামলা করেন সাতক্ষীরা জজ আদালতে। বিবাদী রাশেদুল ও এবাদুল দীর্ঘদিন মামলায় হাজির না হলেও গত ২৫ জুলাই রায়ের দিনে হাজির হয়ে জবাব দেওয়ার জন্য সময় চায়। আদালত আগামি ২৯ আগস্ট বিবাদীদের জবাব দাখিলের জন্য দিন ধার্য করেন।

ফণীন্দ্র মুন্ডা আরও জানান, তাদের মোট জমি চারটি দাগে হলেও রাশেদুল ও এবাদুল ১৪ দাগে ৫ বিঘা জমি বর্তমান জরিপে রেকর্ড করিয়ে মামলা চলাকালিন সময়ে জবরদখলের চেষ্টা করে আসছিল। এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে ও থানায় শালিসী বৈঠক হয়েছে কয়েকবার। গত ৩ জুলাই শ্যামনগর থানার উপ-পরিদর্শক তরিকুল ইসলামের উপস্থিতিতে শালিসি বৈঠকে ওই জমিতে রাশেদুল ও এবাদুলকে যেতে মানা করা হয়। এরপরও তারা ওই জমি জবরদখলের চেষ্টা করার জন্য বিভিন্ন সময়ে তাদরে হুমকি-ধামকি দিয়ে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার সকালে রাশেদুল ও এবাদুলের নেতৃত্বে দুই শতাধিক ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী তাদের জমি জবরদখলের চেষ্টা চালায়।

শ্রীফলকাটি গ্রামের এবাদুল ইসলাম জানান, দলিলে ৫ বিঘা জমি তাদের দখলে ছিল দীর্ঘদিন। কয়েক বছর আগে মুন্ডারা ওই জমি দখলে নিলে শুক্রবার তারা জমি চাষ করে দখলে নিয়েছেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে।

শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. মো. শিরুজ্জামান জানান, মুন্ডা সম্প্রদায়ের চারজনকে শুক্রবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ভর্তি করা হয়। তাদের শরীরে ভারী জিনিস দিয়ে আঘাত ও ধারালো দা দিয়ে কোপানোর চিহ্ন রয়েছে।

শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী ওয়াহিদ মোর্শেদ জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। তবে শুক্রবার বিকেল ৬টা পর্যন্ত মুন্ডাদের পক্ষে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে মামলা নিয়ে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Link copied!