• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১, ৬ শাওয়াল ১৪৪৫

মুকেশ আম্বানির ছেলের বিয়ে ও এক গরিবের ভাবনা


জ. ই. মামুন
প্রকাশিত: মার্চ ৫, ২০২৪, ০৪:৩৫ পিএম
মুকেশ আম্বানির ছেলের বিয়ে ও এক গরিবের ভাবনা

কদিন ধরে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ নেট দুনিয়ায় ভারতের ধনকুবের মুকেশ আম্বানির ছোট ছেলে অনন্ত আম্বানির প্রাক-বিবাহ সংবর্ধনার ছবি, ভিডিও আর বিবরণ দেখে দেখে অসুস্থ বোধ করছি। টাকা থাকলেই এমন অপচয় করতে হবে, এমন যথেচ্ছাচার!

বিয়ে তো না যেন দুনিয়াশুদ্ধ সেলিব্রিটি, ক্ষমতাধর আর বড়লোকদের মিলন মেলা। যারা দাওয়াতে গিয়েছেন তাদের নিয়েও অনেকে কথা বলছেন। আমার মতে, তারা কোনো দোষ করেননি। এমন একটা অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাওয়া খুবই সম্মানজনক। যারা দাওয়াত পেয়েছেন, তাদের আন্তরিকভাবে সম্মানিত করেছেন মুকেশ আম্বানি পরিবার। কিন্তু কথা হলো এত বড় লোককে দাওয়াত করার কী দরকার ছিলো, কী দরকার ছিলো এত লোক দেখানো চাকচিক্যের, অভিজাত্য প্রদর্শনীর?

বিল গেটস, জাকারবার্গ বা ইভাঙ্কা ট্রাম্পের মতো যে সহস্রাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কি আছেন, যাকে আমন্ত্রণ না জানালে তিনি মন খারাপ করতেন বা অনুযোগ করতেন—আম্বানি সাহেব আমাকে কেন দাওয়াত দিলেন না!

টাকা কতভাবে, কত উপায়ে খরচের নামে নষ্ট করা যায়, বিশ্ব ইতিহাসে তার একটা নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এই বিয়ের অনুষ্ঠান। ভারতীয় মুদ্রায় নাকি ১০০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে এই অনুষ্ঠানে। আমি ভাবি, এই টাকায় কত লাখ নিরন্ন মানুষের অন্ন জুটতো। গাজার যুদ্ধে বাবা-মা হারানো কত লাখ অনাথ শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যেত, খোদ ভারতের কত লাখ কর্মহীন মানুষকে কাজ দেওয়া যেত, কতগুলো হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ বা অনাথালয় নির্মাণ করা যেত। কিন্তু আম্বানির মতো মানুষেরা হয়তো এভাবে ভাবেন না। ভাবেন, আমাদের চাঁপাইনবাবগঞ্জের দই বিক্রি করে নিরাশ্রয় মানুষকে ঘর করে দেওয়া, স্কুলের বাচ্চাদের বই কিনে দেওয়া, লাইব্রেরি, স্কুল তৈরি করা আজিজুল হকরা। অথচ ইতিহাস তাদের সালাম করে না, মনে রাখে আম্বানিদের।

অনেকে রতন টাটার সঙ্গে মুকেশ আম্বানির তুলনা করেন। আমার একবার সুযোগ হয়েছিলো জামসেদপুরে টাটানগর ঘুরে দেখার। তাদের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান, সেখানকার শ্রমিক-কর্মীদের আবাসন, তাদের বাচ্চাদের শিক্ষা-চিকিৎসার ব্যবস্থা এক কথায় অনন্য। দেখেছি টাটা মেমোরিয়াল ক্যানসার হাসপাতালও। বাংলাদেশ থেকেও কত মানুষ সেখানে চিকিৎসার জন্য যান। সেবার আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো রতন টাটাজির সঙ্গে অল্প সময়ের জন্য দেখা করা এবং কিছু কথাবার্তা বলারও। তিনি আমাকে JRD টাটাজির স্বাক্ষর অঙ্কিত একটি টাইটান ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন, সেটি আজও যত্ন সহকারে রেখে দিয়েছি। আমার কাছে তাকে মাটির মানুষ মনে হয়েছে। আমার ধারণা মুকেশ আম্বানির চেয়ে ১০ গুণ বেশি টাকার মালিক হলেও রতন টাটা ছেলের বিয়ের নামে এমন অপচয় করতেন না। যদিও তিনি যেহেতু বিয়ে শাদিই করেননি, তাই ছেলে-মেয়ের বিয়ের প্রসঙ্গ অবান্তর। আর রতন টাটা বিলিয়নিয়ার না হতে পারার মূল কারণ তার আয়ের ৬৫ শতাংশ যায় মানবসেবা বা চ্যারিটিতে। আমি এই মহান মানুষটিকে ভক্তিপূর্ণ প্রণাম ও ভালোবাসা জানাই।

আরেকটি কথা। আম্বানি সাহেব জগতের অনেক ক্ষমতাবান, বিখ্যাত বা সেলিব্রিটিকে ছেলের বিয়েতে দাওয়াত করেছেন। বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী দেশ। এই দেশের একজন মানুষকেও তিনি এই বিয়েতে দাওয়াত দেওয়ার যোগ্য মনে করলেন না? একজন মানুষও নেই বাংলাদেশে যাকে তিনি সম্মানিত, গুণী বা সেলিব্রিটি মনে করেন? একটা উদাহরণ দিয়ে বলতে চাই, আফগানিস্তানের ক্রিকেটার রশিদ খান বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের ডোয়ায়েন ব্রাভো যদি এই অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেতে পারেন, তাহলে আমাদের সাকিব আল হাসান কেন নয়? ক্রিকেটের কোন সূচকে সাকিব এদের চেয়ে পেছনে?

শেষ কথা হলো, যারা মনে করেন, আম্বানি খুব সৎ ব্যবসায়ী তাদের জানিয়ে রাখি, মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভারত সরকারের কাছে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করার অভিযোগে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মুকেশ আম্বানি এবং বর্তমান ও প্রাক্তন পেট্রোলিয়াম মন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তাই তাকে খুব সাধু ভাবারও কারণ দেখি না।

Link copied!