কেন ‘খেলা হবে’, কেন মানুষ প্রাণ হারাবে?


কবির য়াহমদ
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৮, ২০২২, ০৩:৫৮ পিএম
কেন ‘খেলা হবে’, কেন মানুষ প্রাণ হারাবে?

রাজনীতিতে বর্তমানে বহুল চর্চিত শব্দ ‘খেলা হবে’। অশ্লীল, অশোভন, অভব্য ও উসকানিমূলক ইঙ্গিতের এই শব্দদ্বয় রাজনীতিবিদদের মধ্যে বাসা বেঁধেছে। প্রকাশ্যে বলছেন তারা। ঠাট্টায় নয়, হুমকির স্বরেই প্রতিপক্ষকে বলছেন, চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন। কিসের খেলা, কেন খেলা, রাজনীতি কি ক্রীড়াক্ষেত্র কোনো? এত হালকা, এত মানহীন স্লোগান রাজনীতিবিদদের এভাবে আন্দোলিত করবে, এমনটা ভাবিনি।

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত-সমালোচিত রাজনীতিবিদ শামীম ওসমানের মাধ্যমে এই স্লোগান এসেছে। এটা কেবল দেশ নয়, দেশের গণ্ডি বেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশেও গেছে। গত নির্বাচনে দেশটিতে এর বহুল ও নির্লজ্জ প্রচার আমরা দেখেছি। এই স্লোগানকে একটা ব্র্যান্ড হিসেবে দেখার প্রবণতাও আমরা লক্ষ করেছি। দুঃখজনক হচ্ছে, নেতাদের মুখ থেকে আসা এই স্লোগানে লোকজন উত্তেজিত হচ্ছে এবং এই উত্তেজনাকে রাজনীতিবিদেরা প্রাপ্তি হিসেবে ধরে নিচ্ছেন। কেবল ভারত নয়, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশেও এর বহুল প্রচার আমরা লক্ষ করছি। শামীম ওসমান থেকে এই স্লোগান যখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকেও উচ্চারণ করতে দেখি, তখন সত্যি দুঃখিত হই, ভবিষ্যৎ নিয়ে বিচলিত হই।

কেবল ওবায়দুল কাদের নন, সরকারি দল ও সরকারবিরোধী দলের অনেককে এই ‘খেলা হবে’ স্লোগান দিতে এখন দেখা যাচ্ছে। দেশে কি স্লোগানের দৈন্য এতখানি প্রকট হয়ে উঠল। শোভন স্লোগান কি নেই দেশে?

আশার কথা, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও জাতীয় নেতা তোফায়েল আহমেদ প্রথম এই স্লোগানের বিরোধিতা করেছেন। এটা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান হতেই পারে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের কিংবদন্তি এক রাজনীতিক। তিনি যথার্থই অনুধাবন করছেন এমন স্লোগান অনুচিত। ৩ নভেম্বর রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ‘আমরা আজকাল একটা স্লোগান বের করেছি, খেলা হবে। আমার দৃষ্টিতে এটা রাজনৈতিক স্লোগান না, হতে পারে না। রাজনৈতিকভাবে আমার বক্তব্য আমি দেব। কী একটা কথা, খেলা হবে, খেলা হবে। আমার বিবেক বলে এই স্লোগানটা এভাবে না দেওয়াই উচিত।’

তোফায়েল আহমেদ যখন এই স্লোগান দেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করলেন, তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তোফায়েল আহমেদের মন্তব্যকে অগ্রাহ্য করার মতোই প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় দাবি করেছেন, এই স্লোগান নাকি জনগণ গ্রহণ করেছে। জনগণ যখন গ্রহণ করেছে, তখন তিনি এটা দিয়েই যাবেন। ভাবতেও কষ্ট হয় ওবায়দুল কাদেরের কাছে তোফায়েল আহমেদ এভাবে মূল্যায়িত হবেন!

‘খেলা হবে’ স্লোগান নিয়ে আমরা যে আশঙ্কা করেছিলাম, সেই আশঙ্কা এবার সত্যি হয়ে গেছে। রাজনীতির মাঠে ফের লাশ পড়তে শুরু করেছে। বুধবার (৭ ডিসেম্বর) রাজধানীর নয়াপল্টনে পুলিশ ও বিএনপির সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকেই। পুলিশ বিএনপির অফিসে অভিযান চালিয়েছে। বোমার সরঞ্জাম, চাল, ডাল ও পানির বোতল উদ্ধার করেছে। এর আগে দলটির শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কজন নেতাসহ অনেককে আটক করেছে।

নয়াপল্টনে নিহত ব্যক্তিটি রাজনীতি করতেন না বলে জানিয়েছে তার পরিবার। বিএনপি অবশ্য নিহতকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করছে। পরিবারের ভাষ্যমতে, মকবুল হোসেন নামের ওই ব্যক্তি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তিনি জুতার নকশারের কাজ করতেন। বুধবার সকালে তিনি কাজের জন্য বের হয়েছিলেন। মকবুল হোসেনের স্ত্রী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দশ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল। তাদের ৯ বছরের একটি মেয়েসন্তান রয়েছে। জুতার নকশার কাজ করতেন মকবুল হোসেন। ছোটখাটো এই ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। তার সঙ্গে কাজ করতেন স্ত্রীও। মার্কেট তাগাদায় সকালে বের হয়েছিলেন তিনি। এই ব্যবসার কাজেই সাভার যাওয়ার কথা ছিল তার। নিহত মকবুল কীভাবে নয়াপল্টন গেলেন, সেটাও জানে না তার পরিবার।

হতে পারে, দরিদ্র মকবুল বিএনপির কোনো নেতার মাধ্যমে সামান্য কিছু টাকার আশায় নয়াপল্টন গিয়েছিলেন। ১০ ডিসেম্বর বিএনপি ঢাকায় গণসমাবেশ করবে। এই গণসমাবেশ নিয়ে সরকারের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব রয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপিকে সমাবেশ করতে দেবে না, আবার বিএনপি এই জায়গা ছাড়া অন্য কোথাও সমাবেশ করবে না; এমনই পরিস্থিতি। ১০ ডিসেম্বর থেকে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কথায় দেশ চলবে, এমন একটা ঘোষণা কিংবা হুমকি দিয়ে রেখেছে বিএনপি। এই অবস্থায় শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি, সঙ্গে ‘খেলা হবে’ স্লোগানের মাধ্যমে হুমকিধমকি তো রয়েছেই।

নয়াপল্টনে যে লাশ পড়ল এটা কি ‘খেলা হবে-খেলা হবে’ স্লোগানের বাস্তবায়ন নয়? এই ‘খেলায়’ শুরুতেই প্রাণ হারানো মকবুল হোসেনের পরিবারের চোখের জলের মূল্য কি আছে আদৌ? মকবুল হোসেনের ৯ বছরের মেয়েটি ঢাকা মেডিকেলের মর্গের সামনে যে আহাজারি করল, তার কি মূল্য আছে কারও কাছে? মেয়েটি কি তার বাবাকে ফেরত পাবে আর? পাবে না, পাওয়ার কথাও না!

‘ওরে আল্লাহ আমি কী নিয়ে বাঁচব? আমার সংসার চালাবে কে? আমার মেয়ে এতিম হয়ে গেল, আমার মেয়ের কী হবে?’ এই আহাজারি মকবুল হোসেনের স্ত্রীর। তার মাথার ওপরের ছাদ সরে গেছে, তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে গেছে, তাদের মেয়ে আর তার বাবাকে কোনো দিনও ফেরত পাবে না। এর দায় কি কেউ নেবে?

এই মৃত্যুর দায়ভার কেউ নেবে না। কেবলই লাশ নিয়ে টানাটানি করবে, স্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থে। কিন্তু যে মেয়েটি তার বাবা হারাল, যে নারী তার স্বামী হারাল, যে ভাই-বোন তাদের ভাই হারাল; তারা তাদের মকবুলকে আর ফেরত পাবে না। মকবুল যদিও অন্যদের মতোই একজন মানুষ, তবু তিনি দূষিত চিন্তার রাজনীতিবিদদের কাছে কেবলই ‘খেলার’ উপকরণ। তার জীবনটা ‘খেলা’, জীবন্ত একটা মানুষকে লাশ বানিয়ে দেওয়াও একটা ‘খেলা’; তার লাশটাও একটা ‘খেলা’!

মানুষের জীবনকে নিয়ে এই ‘খেলা’ বন্ধ করুন। মানুষের জন্য যদি রাজনীতি হয়, তবে মানুষের ‘জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা’ বন্ধ করুন।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

Link copied!