স্বর্গীয় আনন্দের ফুটবলীয় এক ঝলক


অঘোর মন্ডল
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৬, ২০২২, ০৭:১৫ পিএম
স্বর্গীয় আনন্দের ফুটবলীয় এক ঝলক

মায়া! বিভ্রম! নাকি এটাই ফুটবলীয় আবেশ! হৃদয়ের আবেগ বলছে এটা মায়া নয়, বিভ্রম নয়, এটা এক ঝলক স্বর্গীয় অনুভূতি, যার নাম ব্রাজিলীয় ফুটবল। গতি, ছন্দ, সঠিক পাস আর নিখুঁত ফিনিশিং। এসবের মিশেলেই ব্রাজিলিয়ান ফুটবল সৌন্দর্য।

বাঙালির কাছে ফুটবল এক আবেগের নাম। ব্রাজিলিয়ানদের কাছে ফুটবল মানে সৌন্দর্য। আর ব্রাজিল মানে সুন্দর ফুটবল। সেই সৌন্দর্যের পূজারি হয়ে তারা ফুটবলচর্চাকে উপসনার পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ফুটবল ওদের কাছে শুধু খেলা নয়। ফুটবল একটা ধর্ম, সেটাকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেই নাকি ফুটবল ঈশ্বর যুগে যুগে একেকজন ধর্মযাজককে পাঠিয়ে দেন ব্রাজিলে! পেলে, গ্যারিঞ্জা, জিকো, সক্রেটিস, রোমারিও, বেবেতো, কাকা, রোনালডো, রিভালদো—তালিকাটা অনেক বড়। আর সেই তালিকায় সবশেষ সংযোজন নেইমার।

কাতার বিশ্বকাপে নেইমার-ম্যানিয়া শুরু হয়ে গেছে। ক্যামেরুনের কাছে হারের চিনচিনে যন্ত্রণা বুকে নিয়ে ব্রাজিল শেষ ষোলোর ম্যাচ খেলতে নামে  কোরিয়ানদের দৌড়-লাফ-ঝাঁপ শুরুর আগেই গোল। সেই গোলের পাশে নেইমার নামের কোনো ফুটবলারের নাম ছিল না। কিন্তু মাঝমাঠে যে তিনি ছিলেন ফিল্ডমার্শাল। সুপারসনিক গতিতে তিনি খেলাটার প্রান্ত বদল করে দিচ্ছিলেন। কখনো ডান দিক থেকে বাঁ দিকে। কখনো বাঁ দিক থেকে ডান দিকে। পাশাপাশি নিজস্ব ফুটবলীয় স্কিলের মোহ-মায়ায় আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন গ্যালারি থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকা ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের। আর ফুটবলের রাজসিংহাসনে সম্রাটের মুকুট মাথায় নিয়ে যিনি হাসপাতালে, তিনিও একটা বার্তা পাঠিয়ে দিলেন ব্রাজিল দলের খেলোয়াড়দের। ‍‍‘বাবাকে দেওয়া কথা রাখার জন্য সব চেষ্টা করো।’ ভদ্রলোকের নাম পেলে। আবেগের দমকা হাওয়া যার জীবনের শৃঙ্খলাকে দুলিয়ে দিয়েছে হয়তো। কিন্তু তাকে ছিটকে দিতে পারেনি। তার বড় কারণ, তার বাবার উপদেশ। আর বাবাকে দেওয়া তার কথা। সর্বকালের সেরার সিংহাসনে বসেও একটা আক্ষেপ আছে ভদ্রলোকের। কিছুদিন আগেও তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‍‍‘হাজাররে ওপর গোল করেছি, কিন্তু আমি আমার বাবার একটা রেকর্ড ভাঙতে পারিনি! যাকে নিয়ে একটা মিথ তৈরি হয়ে আছে, পেলে এক ডজ দুইবার দেন না! সেই তিনি  ভাঙতে পারেননি তার বাবার কী এমন রেকর্ড!’ আমার বাবা এক ম্যাচে পাঁচটা গোল করছিলেন।  তার সব কটিই করেছিলেন হেডে। আমি কোনো ম্যাচে পাঁচটা গোল করতে পারিনি হেডে! দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ব্রাজিল চারটা গোল করছে। কিন্তু তাদের কেউ একটার বেশি গোল করতে পারেননি! না, নেইমারও না। তার গোলটা এসেছে পেনাল্টি থেকে। নেইমার। রিচার্লিসন। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। এরা কেউ একটার বেশি গোল করেননি। কিন্তু তাতে ব্রাজিলের জয়ে অন্য এক মাত্রা পেয়েছে। এই দলে গোল করার লোকের অভাব নেই। গোল উদ্‌যাপনেও আছে ভিন্নতা। সেই উদ্‌যাপনটাও দারুণ। একটা দল যখন একটা সুতোয় বাঁধা পড়ে, তখনই ও রকম কিছু দেখা যায়! এই দলটা নাকি গোল কীভাবে উদ্‌যাপন করবে, তারও প্র্যাকটিস করেছে। ব্রাজিলের গোল উদ্‌যাপনের মাত্রা কতটা সুন্দর এবং অন্য রকম আবেদন তৈরি করে, স্মরণীয় হয়ে থাকে, তার জন্য আপনাকে ফ্ল্যাশব্যাকে কাতার থেকে যেতে হবে যুক্তরাষ্ট্রে। ২০২২ থেকে ফিরে যেতে হবে ১৯৯৪-এ। নেইমার-রিচার্লিসন থেকে ফিরতে হবে দুই ফুটবল সাধক বেবেতো-রোমারিওর কাছে। একটু স্মৃতি হাতড়ে দেখুন বেবেতো গোল করে সদ্যোজাত পুত্রকে সেই গোল উৎসর্গ করতে কীভাবে উদযাপন করেছিলেন। তার সঙ্গে কীভাবে যোগ দিয়েছিলেন রোমারিও! এই হচ্ছে ব্রাজিল। গোল করা থেকে গোল উদ্‌যাপন। সব জায়গায় একটা শিল্পের ছোঁয়া!

ব্রাজিল এবারও যদি কাপ নাও জিততে পারে, তারপরও আপনাকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বলতে হবে নিজের দেশ আর দেশের সীমান্ত ছাড়িয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে প্রচুর আনন্দ দিয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালে এই ব্রাজিল পাচ্ছে গত বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ক্রোয়েশিয়াকে। সেই ম্যাচেও ব্রাজিলিয়ানদের মরণপণ সমর্পণ সেই ফুটবলের কাছে। যা থেকে শিল্প আর সৌন্দর্য  ঠিকরে বের হয়। অমরত্ব দেয় সৃষ্টিশীলতাকে।

ব্রাজিলের এই দলের আরেকটা সংকল্প আছে। ব্যক্তি নয়; দলকে আগে রাখতে হবে। ব্রাজিলিয়ানরা স্বার্থপর নয়। তারা দলগতভাবে জিততে চায়। সেটা ম্যাচ আর মানুষের মন। দুটোই। সমর্থকদের সঙ্গে আবেগ-প্রবাহে ভেসে যাবে গোটা দল একসঙ্গে। উন্মত্ত উৎসবে মাতবে তা-ও একসঙ্গে। কোচ তিতে সেই বার্তাটাও দিয়ে দিলেন কোরিয়া ম্যাচে। এবারের বিশ্বকাপে দলের সব ফুটবলারকেই মাঠে নামিয়েছেন তিনি। বোঝাতে চাইলেন ব্রাজিল কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল দল নয়। আর এই দলে কেউ ফুটবল ঈশ্বরের সঙ্গে চুক্তি সই করে আসেননি, যে তিনি ব্রাজিলকে একা বিশ্বকাপ জিতিয়ে দেবেন।

ব্রাজিল মানে ফুটবলের রূপকথা নয়। বাস্তবতা। ফুটবল বিশ্বের দীর্ঘকালীন রাজত্ব করার ইতিহাস আছে। ফুটবল সভ্যতার প্রতি আছে আকণ্ঠ সমর্পণ। আর আবেদন? দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত পর্যন্ত। তা না হলে শীতের রাতে বাংলাদেশের কোনো প্রান্তিক জনপদে খোলা মাঠে কিংবা ঢাকার রাজপথে বড় পর্দায় খেলা দেখার জন্য হাজারো মানুষ জড়ো হবে কেন! কনকনে শীতের রাতে ব্রাজিল নামক আবেগের চাদর গায়ে চড়িয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবেন কেন তারা! ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের আবেদন সমাজের উঁচু থেকে নিচু সব জায়গায়। জমানা বদলায়। ফুটবলারদের নাম বদলায়। কিন্তু বদলায় না ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের মুগ্ধতা।

কাতারে সেই মুগ্ধতা ছড়াতে শুরু করছে ব্রাজিল। নেইমারের প্রত্যাবর্তন। ভিনিসিয়ুসের প্রতিভা। রিচার্লিসনের অসামান্য দক্ষতা। বাকিদের ছোট ছোট পাস। সব মিলিয়ে স্বর্গীয় ফুটবলের এক ঝলক দেখল বিশ্ব। তার রেশ এখনো আছে। কিন্তু বিশ্বকাপ? বিশ্বকাপে চুম্বন আঁকতে হলে এই ব্রাজিলকে অনেক দূর যেতে হবে। শুধু নে-ই-মা-র, নে-ই-মা-র আওয়াজ নয়। রিচার্লিসন ম্যানিয়া নয়। ভিনিসিয়ুস-জনিয়াস দাবিতে চলবে না। সঙ্গে লাগবে প্রার্থনা। ঈশ্বর যেন নিষ্ঠুর না হন। ফুটবল ঈশ্বরের আশীর্বাদ ছাড়া বিশ্বকাপ কেউ কখনো জিতেছে নাকি! তবে ফুটবলই পারে স্বপ্নহীনকে স্বপ্ন দেখাতে। ব্রাজিলিয়ানদের স্বপ্নের আকাশে কিন্তু রং জমতে শুরু করেছে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Link copied!