ব্যাংক লুটের কারণে আমানত তুলতে না পারা গ্রাহকদের টাকা সুদসহ ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের ক্ষেত্রে কোনো ‘হেয়ারকাট’ হবে না। তবে এসব ব্যাংক লোকসানে থাকায় আমানত ফেরাতে সময় লাগবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধি ৭১ অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংক—এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ পিএলসি, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ‘ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে।
এর আগে সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু ‘দেশের কয়েকটি ব্যাংকের লুট হওয়া টাকা ৭৫ লাখ গ্রাহকের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ওই সব ব্যাংক লুটেরাদের কঠোর শাস্তি প্রদান’ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রীর মনোযোগ আকর্ষণ করেন। নোটিশে তিনি বলেন, কয়েকটি ব্যাংকে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং মালিকপক্ষের অর্থ পাচারের কারণে লক্ষ লক্ষ আমানতকারী তাঁদের টাকা তুলতে পারছেন না। ব্যাংক মানুষের আস্থার জায়গা। ব্যাংক থেকে যদি টাকা লুট হয়, মানুষ কোথায় যাবে?’
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পাঁচটি ব্যাংকের বিনিয়োগ অনিয়মে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বিশেষ ফরেনসিক অডিট চলমান রয়েছে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে সম্পদ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ব্যাংকের পাওনা আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে দায়ী ব্যক্তির সম্পদ অথবা তহবিলের সব আয়, সম্পত্তি অধিকার এবং সম্পদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে বিক্রি ও নিলামের গ্রাহকের টাকা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করি।’
দেওয়ানি মামলাও করা হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা খেলাপি ঋণের টাকা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংক তাদের ঋণের টাকা উদ্ধারের জন্য ‘নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষর করেছে। ৯টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানকে ‘নো উইন, নো ফি’ শর্তে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করেছে। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১ চুক্তির প্রথম পর্যায়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়েন্ট গ্রুপ নিয়ে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর রেহানা আক্তার রানু বলেন, ‘মন্ত্রীর চট্টগ্রামের বাসার সামনে গ্রাহকেরা মানববন্ধন করেছে এবং মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাদের আকুতি জানিয়েছে। আমি খুশি হয়েছি কারণ, গ্রাহকেরা জায়গামতোই পৌঁছেছে এবং জায়গামতোই গেছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জনগণের প্রধানমন্ত্রী, মাঝে মাঝে বিরোধী দলের মুডে চলে যান। আমিও এই মুহূর্তে বিরোধী দলের দ্বিতীয় সারিতে বসা কয়েকজন সংসদ সদস্যের মতে যেতে চাই। ৭৫ লাখ গ্রাহকের প্রাণের দাবির সঙ্গে সহমত প্রকাশ করছি; সেটি হচ্ছে, একদিকে মানুষ টাকা তোলার চিন্তায় আছে, আরেক দিকে এখানে যোগ হয়েছে “হেয়ারকাট” নামক এক “মরণকাট” সমস্যা।’
রানু আরও বলেন, ‘যারা গ্রাহকের টাকা লুট করেছে, ওই সমস্ত ব্যাংক ডাকাত, ব্যাংক লুটেরাদের কোনো ক্ষমা হতে পারে না। তারা পৃথিবীর যেখানেই থাকুক, ফিরিয়ে এনে তাদের “ডিম থেরাপি” দিয়ে এই টাকা আদায় করতে হবে। মন্ত্রীর কাছে আমার প্রশ্ন, “হেয়ার কাট” নামক “মরণকাট” প্রত্যাহার করে ৭৫ লাখ গ্রাহককে স্বস্তি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আপনার মন্ত্রণালয়ের আছে কি না?’
জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেন, ‘আমি ভীতসন্ত্রস্ত বোধ করছি। অলমোস্ট ওয়ার্নিংয়ের মতো বক্তব্য এসেছে। আমি আগেই বলেছি, এটা একটা হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। এবং একটি নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব এটার সঠিক সমাধান দেওয়া। ইতিমধ্যে আমি আগেও বলেছি সংসদে, যারা আমানতকারী, তাদের আমানত সুদসহ ফেরত দেওয়া হবে ইনশা আল্লাহ। তবে একটু ধৈর্য ধরতে হবে; কারণ, এই ব্যাংকগুলো সবগুলোই লোকসানের মধ্যে আছে। এবং লোকসান কিন্তু প্রতিদিন বাড়ছে। লোকসানি একটা ব্যাংকে আপনার যেখানে তার আমানত ফিরিয়ে দিতে পারছে না এবং তাকে সুদ দেওয়া যে কত কঠিন, সেটা আপনাদের বুঝতে হবে। জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণে নিশ্চিতভাবে তাদের আমানত এবং সুদ ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু এটার জন্য একটা সময়ের প্রয়োজন। এই ব্যাংকগুলো “হেয়ারকাট” থাকবে না।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি, তাদের অপেক্ষা করার সময় নাই। মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে। মানুষ তার মেয়ের বিয়ে দিতে পারছে না। প্রতিনিয়ত এই সমস্ত সমস্যার সঙ্গে সম্মুখীন হচ্ছে। এটার সমাধান একটু মধ্যমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে। তবে নিশ্চিতভাবে এটা বলতে পারি, আমানতকারীরা তাদের টাকা ফেরত পাবে, সুদসহ ফেরত পাবে। তবে একটু ধৈর্য ধারণ করতে হবে।’


































