আওয়ামী সরকারের পতনের পর গত বছরের ৫ আগস্ট গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দাম। বর্তমানে তিনি যশোর কারাগারে রয়েছেন।
গত শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ইউনিয়নের সাবেকডাঙ্গা গ্রামের বাড়ি থেকে সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পাশেই নিথর পড়ে ছিল তাঁর ৯ মাসের শিশুসন্তান সেজাদ হাসান নাজিফ।
ঘটনার পরদিন শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে মা-ছেলের মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে সাদ্দামকে দেখাতে যশোর কারাগারে নিয়ে আসেন স্বজনরা। সব কার্যক্রম শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে পরিবারের ছয় সদস্যসহ লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটিকে কারাগারে প্রবেশের অনুমতি দেয় কারা কর্তৃপক্ষ।
কারাগারের ফটকে স্ত্রী ও সন্তানের লাশ দেখার সুযোগ পান সাদ্দাম। সাদ্দামের ছোট ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন, "ভাই বাচ্চাকে কোলে নেননি। শুধু মাথায় হাত রেখে বলেছেন—আমি ভালো বাবা, ভালো স্বামী হতে পারলাম না। ক্ষমা করে দিও।"
আলোচনা-সমালোচনার ঝড়
মৃত্যুর দুই দিন পার হলেও সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পুরো জেলাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, সাদ্দাম জেলে থাকার কারণে অভাবের তাড়নায় তাঁর স্ত্রী ছেলেকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেছেন। আবার কেউ দাবি করেছেন, সাদ্দাম পলাতক থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করায় তাঁর স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন। এ ছাড়া স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য সাদ্দামকে প্যারোলে কেন মুক্তি দেওয়া হলো না—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই।
আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড
ঘটনার পরপরই স্বজন ও স্থানীয়দের ধারণা ছিল, স্বামীকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে না পারার হতাশা ও মানসিক অবসাদে শিশুসন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছেন স্বর্ণালী। নিহতের বাবা ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনও তখন এমনটাই বলেছিলেন।
নিহতের ভাই শাহ নেওয়াজ আমিন শুভ প্রথম দিন বলেছিলেন, "দীর্ঘদিন ধরে স্বামী কারাবন্দি থাকায় আমার বোন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। হতাশা থেকেই হয়তো এমন ঘটনা ঘটেছে।"
তবে দুই দিনের ব্যবধানে দুই পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ তৈরি হয়। আজ রোববার দুপুরে আবার কথা হলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শুভ বলেন, "আমার বোনকে হত্যা করা হয়েছে। এখানে অনেক গ্যাপ আছে। নামাজের পর ১টা ৪০-৪৫ মিনিটের দিকে খবর পাই। তখন বাড়িতে কেউ ছিল না। অনেক তথ্য মিলছে না।"
তিনি আরও বলেন, "আমার বোন ও দুলাভাই নিজেদের সিদ্ধান্তে বিয়ে করেছিল। শুরুতে দুই পরিবারের সম্পর্ক ভালো ছিল না। পরে মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু ফেসবুকে সাদ্দামের আরেকটি বিয়ে হয়েছে—এমন পোস্ট দেখেছি। এসব বিষয় সন্দেহ বাড়াচ্ছে।"
তবে সাদ্দামের ছোট ভাই প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, "আমাদের সংসারে কোনো অভাব-অনটন ছিল না। আর আমার ভাই দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, এমন কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। যারা এসব প্রচার করছেন, তারা হয়তো কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য করছেন।"
তিনি আরও বলেন, "ভাবি (কানিজ) আমাকে কয়েকবার বলেছেন, দুই মাস হয়ে যায়, তাঁর বাবা তাঁকে এবং তাঁর ছেলেকে দেখতে আসেননি। এ ছাড়া অনেকে ভাবিকে বলেছেন, তাঁর স্বামী (সাদ্দাম) আর কোনোদিন জেল থেকে বের হতে পারবেন না। এসব নিয়েও ভাবির মধ্যে হতাশা ছিল।"
পরিবারের পরিচয়
সাদ্দামের বাড়ি একতলা ভবন। তারা তিন ভাই ও তিন বোন। বাবা একরাম হাওলাদার মারা গেছেন ৫ বছর আগে। এই ভবনে সাদ্দামের মা, এক বোন ও সাদ্দামের স্ত্রী-সন্তান থাকতেন। সাদ্দামের এক ভাই সরকারি চাকরি করেন, আরেক ভাই প্রকৌশলী—তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
সাদ্দামের মা দেলোয়ারা একরাম বলেন, "শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভাতিজির বিয়েতে অংশগ্রহণের জন্য বাগেরহাট শহরের বগা ক্লিনিক এলাকায় আসি। তখন পুত্রবধূ, নাতি, এক মেয়ে ও মেয়ের ছেলে বাড়িতে ছিল। পুত্রবধূ কানিজের সঙ্গে কথা ছিল, দুপুরের দিকে তিনিও ওই বিয়েবাড়িতে যাবেন। কিন্তু ১টা ৪৫ মিনিটে পাশের বাড়ি থেকে মুঠোফোনে জানানো হয়, তাঁর পুত্রবধূ গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।"
সাদ্দামের মা আরও বলেন, "আমার খুব শান্তির সংসার, বউমা ও নাতনিকে নিয়ে আমি থাকতাম বাড়িতে। বউমার সঙ্গে আমার খুবই ভালো সম্পর্ক। আমার সংসারে কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু কেন যে ও এমন করল জানি না।"
হত্যা মামলা দায়ের
এ ঘটনায় নিহত স্বর্ণালীর বাবা ও জাতীয় পার্টির জেলা সহ-সভাপতি মো. রুহুল আমিন বাদী হয়ে শনিবার বাগেরহাট সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। তিনি বলেন, "আমার মেয়ে আত্মহত্যা করলেও নাতিটা কীভাবে মারা গেল? সেটাই বড় প্রশ্ন। পুলিশ তদন্ত করুক, সত্যটা বের হোক—এটাই চাই।"
এ বিষয়ে বাগেরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তি (ওসি) মো. মাসুম খান বলেন, "মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন
ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বর্ণালীর শরীরে বাহ্যিক কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। শিশুটির মস্তিষ্ক ও ফুসফুসে পানি এবং পাকস্থলীতে মায়ের বুকের দুধ পাওয়া গেছে—যা পানিতে ডুবে মৃত্যুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
হাসপাতালে নেওয়ার আগেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছিল বলে জানিয়ে জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. সাকিয়া হক বলেন, "শুক্রবার দুপুরে শিশুটিকে হাসপাতালে আনা হয়। তখন সে জীবিত ছিল না। পানিতে ডোবার রোগী এলে আমরা সাধারণত রেসকিউ ব্রিদিং ও সিপিআর দিয়ে চেষ্টা করি। প্রায় ৪৫ মিনিট চেষ্টা করা হয়। শিশুটির মুখ দিয়ে পানি বের হয়, তখনই বোঝা যায় পানিতে ডুবে থাকার ঘটনা। তবে শিশুটি নিজে পড়ে গেছে নাকি কেউ ফেলে দিয়েছে—এটি তদন্ত ছাড়া আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়।"
প্যারোলে মুক্তি না পাওয়া নিয়ে বিতর্ক
স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পরও সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। তবে যশোর জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্যারোলের জন্য কোনো আবেদনই করা হয়নি।
সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করেছিলেন জানিয়ে তাঁর মামা হেমায়েত হোসেন বলেন, "আমি আবেদন করেছিলাম। জেলা প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, যেহেতু যশোর জেলে তাই আমাদের প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। পরে বাগেরহাটের জেল সুপারের সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি বলেছেন, আমাদের কোনো সুযোগ নেই, আপনারা যশোরে মরদেহ নিয়ে দেখা করিয়ে আসেন। পরে আমরা যশোরে দেখা করিয়েছি। সেখানেও মাত্র ৪-৫ মিনিট সময় দিয়েছে।"
যশোর জেলা প্রশাসকের মিডিয়া সেলের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, "বন্দি জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো লিখিত আবেদন জমা পড়েনি। সময় স্বল্পতার কারণে পরিবার কারাফটকে লাশ দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়।"
যশোরের জেলা প্রশাসক আশেক হাসান বলেন, "প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে লিখিত বা মৌখিক কোনো আবেদন পাওয়া যায়নি।"
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, "যেহেতু বন্দি যশোর কারাগারে ছিলেন, প্যারোল দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। আইন অনুযায়ী যে জেলায় বন্দি, সেই জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটই সিদ্ধান্ত দেবেন।"
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, মানবিক দিক বিবেচনা করে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে জুয়েলের পরিবারের ছয় সদস্যকে কারা ফটকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।
১১ মামলার আসামি সাদ্দাম
২০২৫ সালের এপ্রিলে গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে ১১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মামলায় তিনি এজাহারনামীয় আসামি এবং বাকিগুলো রাজনৈতিক মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে পরিবারের দাবি। আটকের পর তিনবার জামিনে মুক্তি পেলেও অন্য মামলায় কারাফটকের সামনে থেকে পুনরায় গ্রেপ্তার হন সাদ্দাম।
জানাজা ও দাফন
শনিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে স্বর্ণালীর বাবার বাড়ির কবরস্থানে মা-ছেলেকে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। সাবেকডাঙ্গা স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে রাত ১১টা ২০ মিনিটে তাদের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।














