• ঢাকা
  • রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০, ১৪ শা’বান ১৪৪৫

মুর্তজা বশীর ও শৈল্পিক জীবনের সাধনা


আরাফাত শান্ত
প্রকাশিত: আগস্ট ১৫, ২০২৩, ১১:০৩ এএম
মুর্তজা বশীর ও শৈল্পিক জীবনের সাধনা
ছবি : সংগৃহীত

মুর্তজা বশীরকে প্রশ্ন করা হলে সবসময় বলতেন, ‘আই এম পিপল আর্টিস্ট।’  মানুষের জন্য তার শিল্পের সাধনা কখনো পথ হারায়নি। বড় শিল্পী হওয়ার পরও বলতেন সমস্ত কৃতিত্ব আসলে জনগণের। কিশোর কালে তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে ছিলেন। ভেবেছিলেন রাজনীতি করে পরিবর্তন করবেন সমাজের। সেই সমাজকে পাল্টে দিতে এসেই তাঁর ছবি আঁকার জীবন শুরু। কেউ কখনো ভাবতে পারেননি ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কড়া নিষেধ উপেক্ষা করে তিনি একদিন সমাজে ও দেশের বিখ্যাত এক শিল্পীতে পরিণত হবেন। এত বাধার পাহাড় অতিক্রম করে তিনি কাজ করে গেছেন স্রোতের বিপরীতে।

মুসলমান এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ভাষাবিদ ও সর্বজন নমস্য ব্যক্তি। তার সব ভাই মোটামুটি শহীদুল্লাহ সাহেবকে ভীষণ ভয় পেতেন। তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। পিতা যত কড়া শাসনে তাকে বাঁধতে চাইতেন, তিনি তত স্বাধীন হতে চাইতেন। প্রচলিত যত কথাবার্তা সব কিছুকেই তিনি প্রশ্ন করার সাহস রাখতেন। এ নিয়ে টিচারদের সঙ্গে তার বাদানুবাদ লেগেই থাকতো। কিশোর বয়স থেকেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে যান, আর ঘর থেকে পালানো শুরু করেন। নানান জায়গায় ঘুরে টুরে মাসখানেক পর বাড়িতে ফিরতেন। বিপুল অভিজ্ঞতাই তার অন্যতম সম্বল। তার ছবি আঁকাকে প্রথম দিকে পছন্দ করতেন না ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। কিন্তু পিতার হুকুম অমান্য করাতেই তার আনন্দ। রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার জন্যই তিনি চারুকলায় ভর্তি হন পিতার নির্দেশ অগ্রাহ্য করেই। তার গুরু ছিলেন বিখ্যাত শিল্পী আমিনুল ইসলাম। ভারত থেকে আনা নানান বই আর ম্যাগাজিনই ছিল তার আরাধ্য। সিনেমারও ছিলেন ভীষণ পোকা। সে সময় তার মতো সব বিষয়ে পারদর্শী ছেলের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। খুব ভালো লিখতেনও তিনি। ছোট গল্প, প্রবন্ধেও সে সময়ে রেখেছেন মুন্সীয়ানা।

শিল্পী আমিনুল ইসলামের ইতালি যাত্রা তাকেও খুব অনুপ্রাণিত করে। তিনিও উচ্চশিক্ষার জন্য ইতালি যান। ইউরোপের চিত্রকলায় খুব প্রভাবিত হন। কিন্তু অন্তরে সব সময় থেকে যায় এ অঞ্চলের রূপ রস গন্ধ। ওনার ছবি সরল কিন্তু বিস্তৃত। কল্পনাপ্রবণতাই তার আসল জায়গা। বাংলাদেশের অনেক শিল্পীকে অ্যাবসট্রাক্ট পেইন্টিং করতে অনুপ্রেরণা দিতেন তিনি। পাকিস্তানের শিল্প আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিও ছিলেন তিনি। ডাকটিকেট সংগ্রহ ও প্রাচীন মুদ্রা সংগ্রহ ছিল তার আরেকটা নেশা। শুধুমাত্র সুলতানি আমলের মুদ্রা নিয়ে শিল্পী মুর্তজা বশীরের যে কাজ আছে, অনেক বড় বড় গবেষকদেরও তা নাই। বিখ্যাত উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ নাকি বলেছিল, “এখানে শুরু করো কাজ, ঢাকায় কাজ করলে পাকিস্তানের এদিকে কেউ চিনবে না তোমায়।” তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে ছোটবেলা থেকেই সবাই চেনে, যখন পাকিস্তানের জন্ম হয় নাই, আমি ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে।”

পেশায় তিনি অনেকদিন ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার অধ্যাপক হিসাবে। বিভাগ প্রধান হয়ে অবসর নেন। অনেক ধরনের কাজ করেছেন। মুসলমানের দেশে ছবি আঁকা যে কত বড় একটা চ্যালেঞ্জ এ কথা তিনি বারবার বলতেন। ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ পরে ওনার এই শিল্পী সত্ত্বাকে মেনে নিয়েছিলেন। পত্রিকায় কেউ তার ছেলেকে নিয়ে লিখলে খুশী হতেন। চিত্রকলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৮০ সালে একুশে পদক পান মুর্তজা বশীর, স্বাধীনতা পুরস্কার পান ২০১৯ সালে। বিমূর্ত চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ মুর্তজা বশীরের ‘দেয়াল’, ‘শহীদ শিরোনাম’ ছাড়াও বেশকিছু উল্লেখযোগ্য চিত্রমালা রয়েছে। পেইন্টিং ছাড়াও ম্যুরাল, ছাপচিত্রসহ চিত্রকলার বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন মুর্তজা বশীর।

৮৮ বছর বয়সে করোনাতে কেড়ে নেয় তাঁর প্রাণ, এছাড়াও আগে থেকে তাঁর কিডনি ও ফুসফুসের সমস্যা ছিল। তার মৃত্যু বার্ষিকী অবশ্য শোকের চেয়ে বেশি উদযাপনের। এরকম শিল্পের সাধনা ও  সফল শৈল্পিক জীবন খুব কম বাঙালি মুসলমানের হয়। ৯৩ বছর তিনি বাঁচতে চেয়েছিলেন। অল্পের জন্য হলো না।

Link copied!