কাজটা করতে হবে, জানেন। কাজটা জরুরি, সেটাও জানেন। তবু কেন যেন কাজটি শুরু করতে পারছেন না। ডেস্কে বসে আছেন, বই খুলে রেখেছেন, ল্যাপটপও অন করা; কিন্তু হাত উঠছে না। দিন, সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে যাচ্ছে, কাজটা আর শুরু করা হচ্ছে না। এমন অভিজ্ঞতা আমাদের প্রায় সবারই আছে। আমরা সাধারণত এটাকে আলস্য বা ইচ্ছাশক্তির অভাব বলে মনে করি। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি আদতে তা নয়।
মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তি এড়াতে, শক্তি সঞ্চয় করতে চায়। তাই কোনো কঠিন, বড় বা অনিশ্চিত কাজের মুখোমুখি হলে মস্তিষ্ক প্রতিরোধ তৈরি করে
মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তি এড়াতে, শক্তি সঞ্চয় করতে চায়। তাই কোনো কঠিন, বড় বা অনিশ্চিত কাজের মুখোমুখি হলে মস্তিষ্ক প্রতিরোধ তৈরি করেছবি: পেক্সেলস
স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার ইনস্টিটিউট ফর নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড কার্ডিওভাস্কুলার রিসার্চের ক্লিনিক্যাল পিএইচডি ফেলো ও স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. ডমিনিক এনজি।
তাঁর এক নিবন্ধে ব্যাখ্যা করেছেন কঠিন কাজ শুরু করতে না পারা সাধারণত অলসতা বা ইচ্ছাশক্তির অভাবের কারণে নয়। মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তি এড়াতে, শক্তি সঞ্চয় করতে চায়। তাই কোনো কঠিন, বড় বা অনিশ্চিত কাজের মুখোমুখি হলে মস্তিষ্ক প্রতিরোধ তৈরি করে।
ড. ডমিনিকের মতে, এই প্রতিরোধ মূলত দুই ধরনের।
১. আবেগগত প্রতিরোধ (ইমোশনাল রেজিস্ট্যান্স)
কাজটা বাস্তবে কতটা কঠিন, সেই হিসেবে নয়; বরং কাজটিকে কত বড় বা ভীতিকর মনে হচ্ছে, তার ভিত্তিতে মস্তিষ্ক প্রতিক্রিয়া দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘আমাকে পুরো বাড়ি পরিষ্কার করতে হবে’—এটা শুনলে চাপ লাগে। অন্যদিকে ‘আমি শুধু একটি প্লেট মাজব’—এটা শুনলে কাজটা সহজ মনে হয়। অর্থাৎ কাজ যত বড় মনে হয়, মস্তিষ্ক তত বেশি নেতিবাচক আবেগ তৈরি করে।
২. আত্মপরিচয় রক্ষার প্রতিরোধ (ইগো প্রটেকশন)
অনেক সময় কাজটি কঠিন বলে নয়, বরং ব্যর্থতার আশঙ্কা আমাদের পরিচয়বোধকে হুমকির মুখে ফেলে। যেমন ‘আমি গণিতে ভালো নই’, ‘আমি খেলাধুলার মানুষ নই’ বা ‘আমি পারফেকশনিস্ট’—নিজেকে নিয়ে এই ধারণা বা বিশ্বাসগুলো মস্তিষ্ককে কাজ শুরু করার আগেই পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে।
কাজ শুরু করার ৬টি কৌশল
নতুন কোনো অভ্যাস গড়ে তোলা, পরীক্ষার পড়া শুরু করা, ব্যায়াম করা কিংবা বহুদিনের ফেলে রাখা কোনো কাজ শেষ করা, অথবা করব করব বলেও করা হচ্ছে না, এমন কোনো কাজ—সবকিছুর ক্ষেত্রেই সবচেয়ে কঠিন ধাপটি হলো শুরু করা।
১. দুই মিনিটের নিয়ম
পুরো কাজের প্রতিশ্রুতি দেবেন না। মাত্র দুই মিনিট করার প্রতিশ্রুতি দিন। শুধু এক পৃষ্ঠা পড়ুন। শুধু একটা বাক্য বা প্রথম বাক্যটা লিখুন। পাঁচটি পুশ-আপ দিন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুরু করাই সবচেয়ে কঠিন অংশ। একবার শুরু করলে কাজ চালিয়ে যাওয়া সহজ হয়ে যায়।
২. কাজ নয়, প্রস্তুতি শুরু করুন
যদি কাজ শুরু করাও কঠিন মনে হয়, তাহলে শুধু প্রস্তুতি নিন। জিমের পোশাক পরুন। বই টেবিলে রাখুন। ল্যাপটপ খুলুন। এতে মস্তিষ্কের প্রতিরোধ কমে যায় এবং গতি তৈরি হয়।
৩. নিজেকে পুরস্কার দিন
মস্তিষ্ক পুরস্কার পছন্দ করে। নিজেকে বলুন, আপনি এই কাজটা শেষ করলে নিজেকে কফি খাওয়াবেন বা নেটফ্লিক্সের সিরিজটা দেখবেন। কঠিন কাজের সঙ্গে আনন্দদায়ক কিছুর সংযোগ তৈরি করুন।
৪. কাজটিকে মজাদার বানান
ব্যায়ামের সময় প্রিয় পডকাস্ট শুনুন। লেখার সময় প্রিয় চা বা কফি খান। ঘর গোছানোর সময় গান শুনুন। এভাবেও কঠিন কাজের সঙ্গে আনন্দদায়ক সংযোগ তৈরি করা যায়।
৫. নিখুঁত হওয়ার প্রয়োজন নেই
‘আমাকে নিখুঁত হতে হবে’—এমন চিন্তার বদলে ভাবুন, ‘আমি একটা পরীক্ষা চালাচ্ছি বা চেষ্টা করে দেখছি’; তাহলে ব্যর্থতার ভয় কমে যায় এবং কৌতূহল বাড়ে।
৬. আগে পরিচয় বদলান
‘আমাকে ফিট হতে হবে’—বলার বদলে ভাবুন ‘আমি ব্যায়াম করতে পছন্দ করি। ব্যায়ামকে আমি জীবনযাপনের অংশ বানাতে চাই।’ মস্তিষ্ক নিজের পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করতে বেশি আগ্রহী হয়।





































