বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এটা স্পষ্ট যে, মস্কো এবং বেইজিং উভয়ই এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের এক জটিল অধ্যায় পাড়ি দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির অনিশ্চয়তাই মূলত এ দুই পরাশক্তিকে একে অপরের আরো কাছে নিয়ে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার পরিপ্রেক্ষিতে দেশ দুটির এ কৌশলগত অংশীদারত্ব আরো গভীর হচ্ছে।
যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা এবং বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বেইজিং ও মস্কোর সম্পর্ক আরো নিবিড় হচ্ছে। এর মধ্যেই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নিতে দুই দিনের সফরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশটিতে পৌঁছেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের পরপরই পুতিনের এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এটি শি জিনপিং ও পুতিনের দ্বিতীয় মুখোমুখি সাক্ষাৎ। সেই সঙ্গে পুতিনের এ সফর ২০০১ সালের 'গুড-নেইবারলিনেস অ্যান্ড ফ্রেন্ডলি কোঅপারেশন' চুক্তির ২৫তম বার্ষিকীর সঙ্গে মিলে গেছে। কয়েক দশকের আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও পারস্পরিক সন্দেহের অবসান ঘটিয়ে এ চুক্তিই মূলত রাশিয়া ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এটা স্পষ্ট যে, মস্কো এবং বেইজিং উভয়ই এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের এক জটিল অধ্যায় পাড়ি দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির অনিশ্চয়তাই মূলত এ দুই পরাশক্তিকে একে অপরের আরো কাছে নিয়ে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার পরিপ্রেক্ষিতে দেশ দুটির এ কৌশলগত অংশীদারত্ব আরো গভীর হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ ঘিরে হরমুজ প্রণালি সংকট বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। এ পরিস্থিতি নিজেদের তেল ও গ্যাস তথা জ্বালানি সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে বেইজিংয়ের উদ্বেগ বহুগুণে বাড়িয়েছে। ফলশ্রুতিতে চীন এখন রাশিয়ার মতো একটি নির্ভরযোগ্য স্থলভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহকারীর দিকে ক্রমেই ঝুঁকছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে চীনে ট্রাম্প ও পুতিনের সফর কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। এর পেছনে শি জিনপিংয়ের বিশেষ কৌশল রয়েছে। এর মাধ্যমে অস্থির এ বিশ্ব ব্যবস্থায় নিজেকে বিশ্বস্ত ও প্রভাবশালী পক্ষ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে বেইজিং।
কেমন ছিল এ দুই দেশের সম্পর্ক?
দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের মধ্যে একটি জটিল সম্পর্ক বজায় রেখেছে চীন ও রাশিয়া। এক সময় কমিউনিস্ট আদর্শ এবং পশ্চিমা পুঁজিবাদের যৌথ বিরোধিতার ভিত্তিতে দুই দেশ এক সুতোয় বাঁধা থাকলেও, পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মাওবাদী চীন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়। এমনকি স্নায়ুযুদ্ধের সময় ৪ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এলাকার উত্তেজনা দেশ দুটিকে যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। তবে কালের পরিক্রমায় সেই অনিরাপদ সীমান্ত এখন কৌশলগত সহযোগিতা ও বাণিজ্যের করিডোরে রূপান্তরিত হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে শি বা পুতিন কেউই ঘন ঘন আন্তর্জাতিক সফরে যান না। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পুতিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। অন্যদিকে শি জিনপিং অত্যন্ত পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সফর ছাড়া সাধারণত চীন ত্যাগ করেন না। তা সত্ত্বেও দুই নেতাই পরস্পরের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় রাখাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এ দুই রাষ্ট্রপ্রধানই একে অপরকে একাধিকবার 'বন্ধু' বলে সম্বোধন করেছেন। বিশেষ করে ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে এ সম্পর্ক আরো জোরদার হয়েছে। সে সময় যুদ্ধের কারণে মস্কো আন্তর্জাতিকভাবে একরকম একঘরে হয়ে পড়ে। ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে ক্রেমলিন বাণিজ্যের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হয়।
চীন সফরের আগে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে পুতিন বলেন, রাশিয়া এবং চীন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের দিকে দেখছে। তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশ রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা বৃদ্ধি করছে।
পুতিন আরো বলেন, মূলত, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর করতে এবং উভয় দেশের কল্যাণে বৈশ্বিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে আমরা যৌথভাবে কাজ করছি।
চীন এখন রাশিয়ার অর্থনৈতিক লাইফলাইন
রুশ অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রূপ নেয়ায় দেশটির জন্য বড় অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি বা 'লাইফলাইন' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে বার্ষিক ২৩৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে এ বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় অসমতা রয়ে গেছে। চীন রাশিয়ার বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হলেও, চীনের সামগ্রিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রাশিয়ার অংশ মাত্র ৪ শতাংশের মতো। অন্যদিকে চীনের অর্থনীতি রাশিয়ার চেয়ে বহুগুণ বড় হওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যকার যেকোনো বাণিজ্যিক বা কূটনৈতিক আলোচনায় বেইজিং অনেক বেশি সুবিধাজনক ও নিয়ন্ত্রণকারী অবস্থানে থাকে।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতের জন্য চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে মস্কো। ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাশিয়া তার আমদানি করা নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত প্রযুক্তির ৯০ শতাংশের বেশি চীন থেকে সংগ্রহ করছে। এর মধ্যে সামরিক ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য উপাদান রয়েছে, যা ড্রোন উৎপাদন এবং অন্য প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়া এ যুদ্ধের জেরে ইউরোপীয় বাজারগুলো রাশিয়ার জন্য প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে রুশ তেল এবং অন্য জ্বালানি পণ্যের প্রধান ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। তাই চীনের বিশাল চাহিদার ওপর নির্ভর করা ছাড়া এই মূহুর্তে রাশিয়ার কাছে কার্যকর কোনো বিকল্প নেই।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ বাণিজ্যিক অসমতার কারণে বেইজিং সবসময়ই সুবিধাজনক অবস্থান থেকে আলোচনা করার সুযোগ পায়। ফলে তারা একদিকে যেমন কম বা ছাড়কৃত মূল্যে রুশ তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে মস্কোর অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর নিজেদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছে।


















