মাগুরায় বোনের স্বামীর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে আট বছরের শিশু ধর্ষণ ও হত্যার আলোচিত মামলার বিচার মাত্র ১৪ কর্ম দিবসে সম্পন্ন হয়েছিল। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল প্রধান আসামি হিটু শেখকে। কিন্তু তারপর এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও সেই রায় কার্যকর হয়নি।
যা নিয়ে সংক্ষুদ্ধ শিশুটির মাসহ গোটা পরিবার। শিশুটির মা বলেন, “সরকারের অনেক চাল ডাল আছে হিটু শেখকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াক। তার রায় কেন কার্যকর হচ্ছে না, আমরা বুঝতে পারছি না। তার ফাঁসি কার্যকর দেখতে আমাদের আর কত অপেক্ষা করতে হবে আমি জানি না।”
“তার দুই ছেলে তো খালাস পেয়ে গেছে। আমার মনে হয় অনেক দেরি হলে সেও এক সময় খালাস পেয়ে যাবে।”
সম্প্রতি মাগুরা শ্রীপুর উপজেলায় শিশুটির বাড়ি গিয়ে দেখা গেছে সুনশান নিরবতা। প্রথমে কথা বলতে চাননি শিশুটির মা।
পরে তিনি বলেন, “আমরা খুব গরিব। আমার স্বামী মানসিক ভারসাম্যহীন। প্রায় তাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। আমি তাকে সামলাব না কী রায় কার্যকর করার জন্য আইন আদালতে ঘুরব।”
“অনেক বলেছি, আমাদের আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই। এই একটা বছর আমরা কিভাবে আছি কেউ দেখতে আসেনি। গত বছর আমার মেয়ে মারা যাওয়ায় অনেকে এসেছিলেন। অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।”
অসহায় এ নারী বলেন, “এমন কী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে মোবাইল ফোনে সবসময় পাশে থাকার কথা বলেছেন। কিন্তু এখন আমি কারো কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না।কেউ আমাদের পাশে নেই। আল্লাহর উপর ভরসা করে আছি।
“একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে আমাদের একটি গাভি দেওয়া হয়েছিল। এখন সেটি লালন পালন করি। আর যা জোটে তাই খেয়ে বেঁচে আছি।”
সন্তান হারানো এ নারী বলেন, যে মেয়ের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে তার ছোট মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল তার সেই মেয়েকে অভাবের তাড়নায় অবশেষে আবার বিয়ে দিয়েছেন। কারণ নিজেদেরই খাওয়া জোটে না। সেখানে মেয়েকে কীভাবে রাখবেন সংসারের।
এদিকে ফাঁসির রায় হওয়া হিটু শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ঘটনার পর এলাকাবাসীর পুড়িয়ে দেওয়া ভিটায় সিমেন্টের বস্তা, পলিথিন ও পুরনো টিন দিয়ে ঝুপরি গড়া হয়েছে।
হিটু শেখের স্ত্রী জাহেদা খাতুন, তাদের দুই ছেলে রাতুল, সজিব আদালত থেকে খালাস পেয়ে পরিবারসহ সেখানে থাকেন। পাশে পুরনো ইট দিয়ে একটি পাকা ঘরের লিংটন গাঁথা হয়েছে।
হিটু শেখের মা রোকেয়া বেগম বলেন, “বাড়ির ঘর ভেঙে দেওয়ার পর কোনো রকমে একটি খুপড়ি ঘর করে আমরা রয়েছি। রাতুল ও সজিব নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করে।
তার দাবি, “আমার ছেলে হিটু শেখ র্নিদোষ। আমার শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। আমার ছেলে আমার মুখ আর দেখতে পাবে না।”
মাগুরার শ্রীপুরের ৮ বছরের শিশুটি ছিল তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। রোজার ছুটিতে ২০২৫ সালের ১ মার্চ সে মাগুরা শহরতলীর নিজনান্দুয়ালী গ্রামে বড় বোনের স্বামীর বাড়ি বেড়াতে যায়।
সেখানে ৬ মার্চ সে ধর্ষণের শিকার হয়। দীর্ঘ ৮ দিন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় শিশুটি।
পরে শিশুটির মা মাগুরা সদর থানায় মেয়ের শ্বশুর হিটু শেখ, জামাই সজীব শেখ, তার ভাই রাতুল শেখ ও তাদের মা জাহেদা খাতুনের নামে মামলা করেন। পুলিশ চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে।
প্রধান আসামী হিটু শেখ ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
এ ঘটনায় শুরু থেকেই সারা দেশের মানুষের মধ্যে তৈরি হয় ক্ষোভ। আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও মিছিল, মানববন্ধনের মত কর্মসূচি পালিত হয়।
পুলিশ তদন্ত শেষে ১৩ এপ্রিল আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ পত্র দেয়। ১৭ এপ্রিল এই মামলার নথি বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ২৭ এপ্রিল সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। স্বাক্ষ্য, পুলিশ রিপোর্ট ও তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ১৭ মে বিজ্ঞ আদালত হিটু শেখকে ফাঁসির আদেশ ও অন্য তিন আসামীকে খালাস দেয়।
তবে নিহত শিশুটির মা ও মামলার বাদী রায় ঘোষণার পরপর বলেন, ৩ আসামির খালাসে তিনি খুশি নন।
ঘটনার মাত্র দুই মাস ১১ দিনের মাথায় এই মামলার রায় হয়েছিল।তারপর একবছর পেরিয়েও সে রায় কার্যকর হয়নি।
বাদি পক্ষের আইনজীবী মনিরুল ইসলাম মুকুল রায় কার্যকর হওয়ার বিষয়ে বলেন, “হিটু শেখের পক্ষে মহামান্য উচ্চ আদালত আপিল করা হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করছি দ্রুত এ আপিল নিষ্পত্তি হয়ে ফাঁসির রায় কার্যকর হবে।”
মাগুরা জেলা গণ কমিটির সদস্য সচিব প্রকৌশলী শস্পা বসু বলেন, “এমন একটি চাঞ্চল্যকর নির্মম ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার আসামির ফাঁসির রায় এখনো কার্যকর না হওয়ায় আমরা ক্ষুব্ধ।
“বিচার কার্যক্রমের এই দীর্ঘসূত্রিতা অপরাধীদের অপরাধ প্রবণতা বাড়ায়। যার প্রমাণ সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীতে রামিসা নামের একটি শিশুর ধর্ষণ ও হত্যা। এ ধরনের শিশু নির্যাতন প্রতিনিয়ত ঘটছে। আমরা চাই হিটু শেখের দ্রুত ফাঁসি হোক। যা সারা দেশে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।”

















