• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই, ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১, ১০ মুহররম ১৪৪৫

হারিয়ে যাচ্ছে ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরার ঐতিহ্য


নড়াইল প্রতিনিধি
প্রকাশিত: এপ্রিল ২২, ২০২২, ০২:৩৪ পিএম
হারিয়ে যাচ্ছে ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরার ঐতিহ্য

নড়াইল সদরের গোয়ালবাড়ি জেলেপল্লীর শ্যাম বিশ্বাসের ভোঁদড় পরিবারে একসাথে ৫টি বাচ্চা জন্ম নিয়েছে। শ্যাম আর স্ত্রী লকিতা মিলে ভোঁদড় শিশুদের খাবার জোগাড়ে ব্যস্ত। কয়েকদিন মানবশিশুর মতো ফিডারে দুধ খাইয়ে এখন প্রতিদিন দুইবেলা আলাদা মাছ খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শ্যামের ছোট্ট উঠানে বাঁশের চটা দিয়ে শিশু ভোঁদড়ের জন্য আলাদা বাসা তৈরির কাজ চলছে।

শ্যামের স্ত্রী লকিতা বিশ্বাস হেসে বলেন, “আমাদের ছেলেমেয়ে না খেলেও ভোঁদড়ের বাচ্চাদের জন্য পুঁটিমাছ কিনে খাওয়াতে হচ্ছে। পাঁচটি বাচ্চার একসঙ্গে মায়ের দুধে হয়নি, তাই মাসখানেক ফিডারে করে শিশুদের মতো এদের দুধ খাইয়েছি। দুমাস পর নিজে খাওয়া শিখবে।”

শ্যামের বাবা নিরাপদ বিশ্বাস, দাদা গদাধর বিশ্বাসসহ কয়েক পুরুষ ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার ধরে আসছেন। শ্যামের সঙ্গে আজো টিকে আছেন গোয়ালবাড়ি জেলেপল্লীর ধ্রুব বিশ্বাস, ভবেন বিশ্বাস, নবীন বিশ্বাস আর রবীন বিশ্বাস।

গোয়ালবাড়ি জেলে পল্লীতে দুপুর এগারটায়। ঘিঞ্জি পাড়ায় ঘরের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত। একজনের টিনের চাল অন্যজনের সাথে। এরই মধ্যে চিত্রানদীর কোলজুড়ে প্রায় দুশ প্রান্তিক জেলেদের বসবাস।

শ্যাম বিশ্বাসের তখন ব্যস্ততার শেষ নাই। নদীর পাড়ে গেলেন তার ভোঁদড়ের কাছে। নৌকার সামনের মাথায় একটি বাঁশের চটার তৈরি বাক্সের মধ্যে ভোঁদড়গুলো বাঁধা। ডালা খুলতেই বড় ৩টা ভোঁদড় লাফিয়ে পানিতে চলে গেলো। শ্যামের ছেলে ভোঁদড়ের দড়ি ধরে রেখেছে। শিশু ৫ ভোঁদড়কে মাছ খাইয়ে দিলেন ঘরের ভিতর, আর বড়দের মাছ দিলেন পানিতে।

ভোঁদড় দিয়ে রাতে মাছ ধরার প্রস্তুতি চলছে। প্রতিরাতে চারজনের একটি দল করে মাছ ধরতে বের হন জেলেরা। নৌকায় লম্বা রশিতে বাঁধা থাকে ভোঁদড়। নদীর কূল ঘেঁষে শোলপুর, তারাপুর, খড়ড়িয়া, কদমতলা, জামরিল হয়ে পেড়লী প্রায় ২০ কিলোমিটার পাড়ি দেন তারা ভোঁদড় নিয়ে। আবার অপর পাড় দিয়ে জাল ফেলতে ফেলতে আসেন।

ভোঁদড়ের প্রধান খাদ্য মাছ। এছাড়া কাঁকড়া বা পানির অন্য কীট ও তারা খেয়ে থাকে। ভোদড়ের মাছ শিকারকে কাজে লাগাতে নৌকায় থাকা ভোঁদড় পানিতে ছাড়া হয়। ভোঁদড়ের তাড়া খেয়ে মাছ পাড়ে চলে আসে। কূলে জাল টেনে সেই মাছ ধরেন জেলেরা। আবার কেউ কেউ বলেন, ভোঁদড়ের গায়ের উৎকট গন্ধে মাছ ছোটাছুটি করে। এইভাবে নির্ঘুম মাছ শিকারে প্রতিরাতে দেড় থেকে ২ হাজার টাকা আয় হয়। তা ভাগ হয় ৪ জনের মধ্যে। গড়ে তিন থেকে চারশ টাকা ভাগে পড়ে।

মাছ ধরার সহযোগী বিপ্লব বিশ্বাস বলেন, “সারারাত মাছ ধরে যা পাই তা দিয়ে সংসার চলে না। এরপর বর্ষায় পাট জাগ দেওয়ায় নদীর পানি পচে যায়। তখন মাছ পাওয়া যায় না। আমাদের নামে কোনো সাহায্য কার্ডও হয় না।”

অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই সময়টা ভোঁদড় নিয়ে দূরে পাড়ি জমান জেলেরা। ঘাটে ঘাটে মাছ বিক্রি করে এই সময়ের আয়ে প্রায় সারা বছর চলে। এক সময় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বিচরণ ছিলো ভোঁদড় জেলেদের, কয়েক বছর সুন্দরবনে যাওয়ার অধিকার হারিয়েছেন এই জেলেরা।

প্রবীণ জেলে কার্ত্তিক বিশ্বাস বলেন, “আমাদের কয়েকশ বছরের পুরোনো পেশা। আগে সুন্দরবন গিয়ে প্রচুর মাছ পেতাম। এখন আমাদের সেখানে ঢুকতে দেয় না।”

প্রতিকূল পরিবেশে টিকতে না পেরে দুশ পরিবারের পেশা এখন নেমে এসেছে ৫ পরিবারে। এর মধ্যে অনেকে পেশা ছেড়ে রাজমিস্ত্রীর কাজ ধরেছেন। অধিকাংশই বিভিন্ন জায়গা থেকে মাছ কিনে ফড়িয়া হয়ে বাজারে ব্যবসা করছেন। ছেলেরা লেখাপড়া শিখছেন কেউ কেউ। তারা বাপ দাদাদের কষ্টের পেশায় যেতে চান না।

গোপাল বিশ্বাসের স্ত্রী রূপসী বিশ্বাস বলেন, “আমার শ্বশুর, স্বামী ওরা সবাই ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরতো। ৫ বছর হলো এটা ছেড়ে দিয়ে মাছ বিক্রির কারবার করে। ছেলেটারে পড়াচ্ছি, অনেক খরচ।”

ভবেন বিশ্বাসের কলেজ পড়ুয়া ছেলে হৃদয় বিশ্বাস বলেন, “আমার বাবা আর ভাই এগুলো করেন। আমি এতে আসতে চাই না। তাহলে আমাদের আর কষ্টের শেষ থাকবে না।”

দুপর গড়াচ্ছে। জেলে পাড়ার নারীরা ভাঙা অস্বাস্থ্যকর রান্নাঘরে রান্নায় ব্যস্ত। ছোট্ট হাড়িতে খাবার চড়িয়ে দিয়েছেন। রাতভর জলে কাজ করা জেলেদের পেটে কিছু একটা দিতে ব্যস্ত তারা। তাই প্রতিবেদকের সাথে কথা বলার সময় নেই। আবার কিছুটা বিরক্ত হন সাংবাদিক দেখলে। কারণটা পরে বোঝা গেল।

প্রায় ৩০ বছর ধরে দেশী-বিদেশী পর্যটকের আনাগোনায় মুখরিত থাকে এই জেলেপল্লী। বিদেশী রাষ্ট্রদূত, দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা দেখতে আসেন। স্থানীয়-বাইরের সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত ছুড়ে যান হেরিটেজের খোঁজে। এরই মধ্যে ইতিহাসেও স্থান করে নিয়েছে ভোঁদড় জেলেপল্লীর কথা। কিন্তু তাতে এই প্রান্তিক জেলেদের ভাগ্যের ছিকে ছেড়েনি।

গৃহবধূ মৃত্তিকা বিশ্বাস বলেন, “এত অভাবের মধ্যেই আমরা টিকে আছি। মাথা গোঁজার ঠাঁই যা আছে তা দেখলেই বুঝবেন।”

শ্যাম বিশ্বাস,ভবেন বিশ্বাস বলেন, “আমাদের দেখতে কতজনই তো আসে। তাতে আমাদের কী লাভ? আপনারা কি আমাদের জন্য কোনো ভালো ব্যবস্থা করতে পেরেছেন? আমরা অন্যকিছু শিখিনি তাই এই কাজই করছি। কদিন পরে এটাও ছেড়ে দিতে হবে।”

সনাতন পদ্ধতির অসহায় জেলেদের জন্য কিছুই করেনি মৎস্য বিভাগ। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এইচ. এম. বদরুজ্জামান বলেন, “ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরা এই পল্লীর জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে এদের টিকিয়ে রাখতে নতুন করে প্রকল্প ডিপিপিতে সংযুক্ত করার প্রস্তাব রাখবো।”

Link copied!