• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১, ১১ মুহররম ১৪৪৫

তিন জেলায় সাফজয়ী মেয়েদের সংবর্ধনা


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২, ০৯:৪১ পিএম
তিন জেলায় সাফজয়ী মেয়েদের সংবর্ধনা

নেপালের কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে গত ১৯ সেপ্টেম্বর ৩-১ ব্যবধানে জিতে বাংলাদেশকে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা এনে দেন মেয়েরা। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরে বাংলাদেশ ভাসে আনন্দের জোয়ারে। বিভিন্ন সংগঠন তাদের সংবর্ধনা দেয়। এরই ধাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাঙামাটির কাউখালী, ময়মনসিংহের ভালুকা ও টাঙ্গাইল গোপালপুরে নিজ এলাকার নারী ফুটবলারদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে।

রাঙ্গামাটি

কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ী দলের সদস্য বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ ফুটবলারকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। সকাল সাড়ে ৯টায় দিকে ঘাগড়া বাজারে তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেন স্কুলের শিক্ষার্থীরা। তারা ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ সময় ফুটবলাররা আজকের সাফল্যের পেছনে এই বিদ্যালয়ের কথা স্মরণ করে এটিকে সরকারি করার দাবি করেন।

উপজেলার পাহাড়ি এক গ্রামে অবস্থিত ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়। যাকে বলা হয় নারী ফুটবলার তৈরির সূতিকাগার। সাফ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের পাঁচ খেলোয়াড় উঠে এসেছেন ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। এখানে প্রতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ফুটবল খেলার হাতেখড়ি তাদের। তারা হলেন রাঙামাটির রুপনা চাকমা ও ঋতুপর্ণা চাকমা এবং খাগড়াছড়ির মনিকা চাকমা, জমজ বোন আনাই মগিনী ও আনুচিং মগিনী।

ফুটবলাররা বিদ্যালয়ে পৌঁছলে প্রথমে প্রধানশিক্ষক কেক ও মিষ্টি খাওয়ান। পরে তারা স্কুল প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়ান এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছবি তুলে সময় কাটান।

ঋতুপর্ণা চাকমা বলেন, “এই স্কুলের শিক্ষকরা অনেক কষ্ট করে আমাদের লেখাপড়া ও খেলাধুলা শিখিয়েছেন। আমরা তাদের কাছে ঋণী। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি, এই স্কুলটা যেন সরকারি করে দেওয়া হয়।”

রুপনা চাকমা বলেন, “আমাকে ঘর করে দেওয়ার জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ। এখন এই স্কুলটি সরকারি হলে আমরা পাঁচজন খুবই খুশি হব। এই স্কুলের কারণে আজ আমরা এই সাফল্য পেয়েছি।”

মনিকা চাকমা বলেন, “আমাদের এভাবে সড়কে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা দেওয়া হবে সেটা চিন্তা করতে পারিনি। এই স্কুলে কয়েক বছর আগে পড়ালেখা শেষ করেছি। তখন শিক্ষকরা কত শাসন করেছিলেন আর আজ তারাই বরণ করছেন, বিষয়টি চিন্তা করতেই অন্যরকম লাগছে।”

এ সময় ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক চন্দ্রা দেওয়ান, ইউপি চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন, কাউখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. পারভেজসহ স্কুলে চার শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। স্কুল শিক্ষার্থীরা বরণ করে নেওয়ার পরে  ঘাগড়া থেকে রাঙামাটি দিকে শোভাযাত্রা করা হয়।

ময়মনসিংহ

ভালুকায় সাফজয়ী আট নারী ফুটবলারকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। সকালে কলসিন্দুর যাওয়ার পথে ভালুকা উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে বাসস্ট্যান্ড চত্বরে তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

সংবর্ধনা প্রাপ্তরা হলেন সানজিদা, মারিয়া মান্ডা, শিউলী আজিম, মার্জিয়া আক্তার, শামছুন্নাহার সিনিয়র, তহুরা আক্তার, সাজেদা আক্তার ও শামছুন্নাহার জুনিয়র।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ কাজিম আহম্মেদ ধনু, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, ইউএনও আবিদুর রহমান, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন, ক্রীড়া সংগঠক ওমর হায়াত খান নঈম, ছাত্রলীগ সভাপতি ইফতেখার আহমেদ সুজন প্রমুখ।

টাঙ্গাইল

হাজারো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন কৃষ্ণা রানী সরকার। শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জয় করে গোপালপুর উপজেলার উত্তর পাথালিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে ঘরে ফিরছেন। তাই আনন্দের জোয়ারে যেন ভাসছে পুরো গ্রাম। সকাল থেকেই ওই গ্রামে সাজসাজ রব পড়ে যায়। কৃষ্ণাকে বরণ করে নেওয়ার জন্য তাদের বাড়িতে প্যান্ডেল তৈরি করা হয়। গ্রামের শত শত মানুষ অপেক্ষা করে কৃষ্ণাকে এক নজর দেখার জন্য। কখন আসবে তাদের মেয়ে। প্রতিক্ষার পালা যেন তাদের শেষ হচ্ছিল না। এছাড়াও কৃষ্ণাকে বরণ করার জন্য তৈরি ছিল গোপালপুর সূতী ভিএম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

কৃষ্ণার ছোট ভাই পলাশ চন্দ্র সরকারকে সঙ্গে নিয়ে বেলা আড়াইটার দিকে একটি প্রাইভেটকারে চেপে সূতী ভিএম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে আসেন। তখন স্কুলের শত শত শক্ষার্থী ও শিক্ষকরা তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও লাল গালিচা সংবর্ধনা দেন। এসময় বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক আতিকুর রহমান তার মুখে মিষ্টি তুলে দেন। কৃষ্ণাও সবাইকে মিষ্টি খাওয়ান। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ সময় তাকে অটোগ্রাফ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। কৃষ্ণাও তাদের অটোগ্রাফ দেন ও সঙ্গে ছবি তুলেন।

বিদ্যালয়ে সংবর্ধনা শেষ করে ক্রীড়া শিক্ষককে নিয়ে গ্রামের বাড়ি উত্তর পাথালিয়া গ্রামের বাড়িতে রওয়ানা হন। তখন রাস্তার দুই পাশ থেকে শত শত মানুষ হাত নেড়ে কৃষ্ণাকে শুভেচ্ছা জানান।

বিকাল চারটার দিকে বাড়িতে এসে পৌঁছালে প্রথমেই তার মা তাকে দুর্বা ও ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন। এ সময় তারা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। পরে তাকে প্যান্ডেলের মঞ্চে বসিয়ে সবাই ফুল দিয়ে বরণ করে নেন।

কৃষ্ণা রানী সরকার বলেন, “পৃথিবীর আলো দেখার পর কখনোই সুখের মুখ দেখিনি। যেদিন থেকে বুঝতে শিখেছি, সেদিন থেকেই বাবাকে কষ্ট করতে দেখেছি। মা অনেক কষ্ট করেছে। এই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে ফুটবল খেলতে হয়েছে। সব বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে আজ এখানে আসতে পেরেছি। আমার এই সাফল্য কোচ ও শিক্ষকদের সহযোগিতার জন্য হয়েছে। আমি তাদেরসহ গোপালপুরবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।”

আরও ভালো পরিসরে খেলে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনার জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন তিনি।

কৃষ্ণা আরও বলেন, “আমি চাই এই প্রতিকূলতা ভেদ করে এখান থেকে আরও নারী ফুটবল খেলোয়াড় বেড়িয়ে আসুক। যারা দেশেকে অনেক উপহার দিতে পারবে। পূজোতে আমি আমার মায়ের জন্য একটি বালা কিনে এনেছি। বাবার জন্য এনেছি পাঞ্জাবি ও পায়জামা। এছাড়াও আত্বীয়স্বজনের জন্য কিছু কাপড় এনেছি।”

কৃষ্ণার মা নমিতা রানী সরকার বলেন, “ফুটবল খেলার জন্য যারা মেয়েকে খারাপ বলত। আজ তারাই এসেছে সংবর্ধনা দিতে। আমি খুব খুশি ও আনন্দিত। আমি দেশবাসীর কাছে কৃষ্ণার জন্য আর্শীবাদ কামনা করি।”

কৃষ্ণার বাবা বাসুদেব চন্দ্র সরকার বলেন, “মেয়ের সাফল্যে খুব খুশি হয়েছি। এলাকার মানুষ ফুল নিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছে। কৃষ্ণা যেন দেশের জন্য আরো গৌরব বয়ে আনতে পারে সেই আশীর্বাদ চাই।”

গোপালপুর সূতি ভিএম পাইলট স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক ও কৃষ্ণার কোচ গোলাম রায়হান বাপন বলেন, “কৃষ্ণার সাফল্যের জন্য আমরা গর্বিত। দেশের জন্য আরও ভাল কিছু করবে এটাই প্রত্যাশা করি।” 
 

Link copied!