বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে সড়ক!


ইশতিয়াক হোসেন
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১, ০১:০৪ পিএম
বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে সড়ক!

পুরো বিশ্বে বিদ্যুৎ উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম।বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যােগ নিচ্ছে সরকার। দেশের ভেতর নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে চাহিদা পূরণে চেষ্টা করছে খনিজ সম্পদ বিভাগ। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা সমুদ্রের বুকে থাকা সম্ভাব্য আরও নতুন নতুন খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণের চেষ্টা চালাচ্ছে।

বিশ্বে প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন কয়লা, গ্যাস, তেল ইত্যাদির মজুত অফুরন্ত নয়। চাহিদা বৃদ্ধি আর উৎপাদনে ভারসাম্য আনতে একসময় এই প্রাকৃতিক সম্পদের মজুত ফুরিয়ে যাবে। শক্তি উৎপন্নের জন্য এসব প্রাকৃতিক সম্পদের বিকল্প খুঁজতে হচ্ছে, যার বিকল্প হচ্ছে পরমাণু শক্তি ও নবায়নযোগ্য শক্তি।

পরমাণু শক্তি ব্যয়বহুল এবং অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ। আর নবায়নযোগ্য শক্তির মধ্যে আছে সৌর, বায়ু ও নদীতে বাঁধ দিয়ে জলশক্তি। এসব নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপন্নের জন্য বেশ খানিকটা জমির প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের মতো ছোট দেশের পক্ষে নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য বড় এলাকা  বরাদ্দ দেওয়া কঠিন। তবে যদি বাড়তি জায়গা ছাড়াই নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা যায়, তা অনেক সহজ ও গ্রহণযোগ্য হবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদা পূরণের এ বিষয়টি মাথায় রেখে ইতোমধ্যে নানা কৌশল অবলম্বন করছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। নানা কৌশলের অভিনব একটি  হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপন্নকারী সড়ক। মানে সড়ক থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে।

যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্সসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে এই পথে হাঁটছে। মাইলকে মাইল যে সড়ক দিয়ে প্রতিনিয়ত মানুষ চলাচল করছেন, সেই সড়কই নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করছে। এই সড়কগুলোতে যদি সৌর প্যানেল বসিয়ে দেওয়া যায়, তাহলেই বাড়তি জায়গা লাগবে না। সেই সঙ্গে বেশ কিছু বিদ্যুৎও পাওয়া যাবে। সৌর সড়কের স্থাপনা এসব দেশের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাকে কয়েক গুণ এগিয়ে দিয়েছে।

আমরা জানি, সৌর প্যানেল খুব পাতলা কাচের মতো হয়ে থাকে। এ জন্য় সৌর প্যানেল বিছানো সড়কে গাড়ি চলাচল করলে তা বেশি সময় স্থায়ী হওয়ার কথা নয়। সেই ভাবনা মাথায় রেখে সড়কে বসানোর জন্য এই সৌর প্যানেল  অত্যন্ত শক্ত খড়খড়ে কাচ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বাতিসহ কৃত্রিম  বুদ্ধিমত্তাও সংযুক্ত করা আছে। বাসাবাড়ির গ্রাহকসহ বিদ্যুৎচালিত যানবাহনকেও সড়ক থেকে প্রয়োজনমতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করাই হচ্ছে প্রস্তুতকারদের মূল উদ্দেশ্য। 

নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন চমকে দেয়, তেমনি তা নিয়ে সমালোচনাও থাকে। সমালোচকরা বলছেন, এই প্যানেলগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফ্রান্সের নর্মান্ডিতে অবস্থিত ১ কিলোমিটার সৌর সড়ক নির্মাণে খরচ পড়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।  আবার এই সৌর সড়ক রক্ষণাবেক্ষণও অত্যন্ত জটিল। সামান্য ধুলাবালুতে সৌর প্যানেলের কার্যকারিতা কমে যায় বলে দাবি তাদের।

সমালোচকদের মতে, এই সৌর সড়কের চেয়ে সাধারণ সৌর প্যানেল যদি সড়কের পাশে, ছাদে অথবা খোলা ময়দানে স্থাপন করা হয়, সেটা হবে অনেক বেশি সস্তা ও সহজ।

সমালোচনার মুখেও বিজ্ঞানীরা কিন্তু থেমে থাকেননি। কীভাবে সড়ক থেকেই প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, এর জন্য অন্য বিকল্প পদ্ধতিও বের করেছেন। যেমন পাইজোইলেক্ট্রিক ক্রিস্টাল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। চাপ প্রয়োগ করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করার কৌশলই হচ্ছে পাইজোইলেক্ট্রিক। এই পদ্ধতিতে সড়কে বিশেষ ধরনের স্ফটিক বসানো থাকে। যা গাড়ির চাপে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে এবং সড়কে বাতি জ্বালানোরও কাজে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু স্ফটিক দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ পর্যাপ্ত না হওয়ায় এই পদ্ধতি বাস্তবায়নে বিজ্ঞানীরা কিছু সময় আরও অপেক্ষা করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সূর্যের আলো হোক বা তাপ অথবা ছুটে চলা গাড়ির গতি শক্তি, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সড়ককে কাজে লাগানোর কার্যকরী পদ্ধতি বের করা গেলে বিদ্যুতের চাহিদা অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব।

সড়ক থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পর্যাপ্ত না হলে প্রয়োজনে একের অধিক কৌশল একসঙ্গে প্রয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারে পরিবেশ ও মানবদেহের ক্ষতি হয়। প্রচলিত নবায়নযোগ্য শক্তির সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহার করে সড়ক থেকে বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলে জীবাশ্ম জ্বালানি ওপর নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমবে। সেই সঙ্গে যানবাহন পরিচালনা ব্যবস্থা সহজ ও সাশ্রয়ই করা যাবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের আরো খবর

Link copied!