লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে রাস্তায় মানুষ


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২৬, ০২:০৫ এএম
লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে রাস্তায় মানুষ

অসহনীয় গরমের মধ্যেই ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদ এবং বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগে রবিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে মহাসড়ক অবরোধ, বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও এবং মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। ভাঙচুর করা হয়েছে পল্লী বিদ্যুতের অফিসও। এর মধ্যে লোডশেডিংয়ে বিশ্বকাপের ম্যাচ না দেখতে পেরে বিদ্যুৎ কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায়। আর সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে ঢুকে সংযোগ বন্ধ করে দেন বিক্ষুব্ধ একদল মানুষ।

এছাড়া শেরপুরে বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালে লোডশেডিং হওয়ায় বিভিন্ন এলাকা থেকে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা চেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চিঠি দিয়েছেন পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা।

উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণ হিসেবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, সারা দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি আছে। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের সরবরাহ না থাকায় বাধ্য হয়ে তাদের লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

লোডশেডিং হয়েছে রাজধানী ঢাকাতেও। দেশের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি ঢাকাতেও দিতে হচ্ছে লোডশেডিং। জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে এ তথ্য তুলে ধরেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

মন্ত্রী উল্লেখ করেন, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারের টিউবে লিক হওয়ায় বাধ্য হয়ে উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় কয়লা খালাস করা সম্ভব না হওয়ায় আরেকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তবে কেন্দ্র দুটির নাম উল্লেখ করেননি তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উৎপাদন বন্ধ থাকা কেন্দ্র দুটি হলো বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কক্সবাজারের এস এস পাওয়ার প্ল্যান্ট।

এ পরিস্থিতিকে জাতীয় সংকট হিসেবে উল্লেখ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সংকট মোকাবিলার আহ্বান জানান বিদ্যুৎমন্ত্রী। তার আশা, দুই দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। উৎপাদন স্বাভাবিক হলে কমে আসবে লোডশেডিংও।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলছে, কয়েক সপ্তাহ ধরেই দেশে লোডশেডিং বেড়েছে। ছুটির দিনেও বিদ্যুতের ঘাটতি কমেনি।

বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডে চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে বিতরণ সংস্থাগুলোকে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, তাৎক্ষণিকভাবে সংকট কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বৃষ্টিপাত। বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা কমবে, একই সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও হ্রাস পাবে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, আগামী কয়েক দিন দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে বৃষ্টি ও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।

টাঙ্গাইলে মহাসড়ক অবরোধ: আজ সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজটের। চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। অবরোধে অংশ নেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের ডুবাইল, নাটিয়াপাড়া, সেহড়াতৈল, ইসলামপুর ও পড়াইখালি এলাকার বাসিন্দারা। এছাড়াও ছিলেন মির্জাপুরের মহেরা, জামুর্কী ও পাকুল্লা এলাকার চার শতাধিক মানুষ।

বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো সমাধান না পাওয়ায় তারা মহাসড়ক অবরোধ করতে বাধ্য হয়েছেন। পরে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিলে তারা অবরোধ প্রত্যাহার করেন।

কেন্দুয়ায় বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুর: নেত্রকোনায় বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সময় লোডশেডিংয়ে ক্ষুব্ধ এলাকার মানুষ ভাঙচুর চালিয়েছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কেন্দুয়া জোনাল অফিসে। আজ সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আর্জেন্টিনা-জর্ডান ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমে ছিল। ম্যাচ চলাকালে বিদ্যুৎ না থাকায় সেই ক্ষোভ চরমে পৌঁছে এবং এর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অফিসে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, কেন্দুয়া উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ২৭ মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে ৭ মেগাওয়াট।

ঝালকাঠিতে মানববন্ধন: লোডশেডিং, গ্রাহক হয়রানি এবং বিদ্যুৎ অফিসের নানা অনিয়মের প্রতিবাদে আজ সকাল ১১টার দিক ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন হয় ‘মানব কল্যাণ সোসাইটি’ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে।

দোহারে বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও: অতিরিক্ত বিল আদায় ও লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে ঢাকার দোহারে পল্লী বিদ্যুত কার্যালয় ঘেরাও করে মানববন্ধন করেন ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। আজ দুপুরে দোহারের নুরপুর এলাকায় পালিত হয় এ কর্মসূচি। আন্দোলনকারীরা এ সময় ঢাকা-দোহার সড়ক অবরোধ করলে তৈরি হয় যানজট। পরে পুলিশ গিয়ে বিক্ষুব্ধদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়।

শেরপুরে হামলার হুমকি: শেরপুরে বিশ্বকাপের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয়ে হামলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সুপার ও থানার ওসিদের কাছে চিঠি দিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।

সিলেটে উপকেন্দ্রে ঢুকে সংযোগ বন্ধ করল বিক্ষুব্ধরা: সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে ঢুকে কর্মরত লাইনম্যানকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। এ সময় উপকেন্দ্রের বাইরে থাকা ৩৩ কেভি এসিআর (অটোমেটিক সার্কিট রিক্লোজার) বন্ধ করে দিলে কিছুক্ষণের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আজ শনিবার গভীর রাতে ঘটে এ ঘটনা।

রাজশাহীতে প্রচার গাড়ি আটকাল এলাকাবাসী: রাজশাহীর বাগমারায় লোডশেডিংয়ের বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচারের সময় পল্লী বিদ্যুতের গাড়ি আটকে দেন এলাকার মানুষ। আজ বিকেলে উপজেলার শুভডাঙ্গা ইউনিয়নের বাজারে ঘটে এ ঘটনা।

প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন টাঙ্গাইল, কেন্দুয়া (নেত্রকোনা), শেরপুর ও ঝালকাঠি প্রতিনিধি এবং সিলেট ও রাজশাহী অফিস।

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

Link copied!