• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০, ১৩ শা’বান ১৪৪৫

ঋণ খেলাপি যারা বাদ পড়লেন


সংবাদ প্রকাশ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৫, ২০২৩, ০৯:২২ এএম
ঋণ খেলাপি যারা বাদ পড়লেন
ঋণখেলাপির অভিযোগে বাদ পড়লেন যারা

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঋণখেলাপির অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে এমন অনেকের মধ্যে আলোচিত রাজনীতিক, বর্তমান সংসদ সদস্য, সংগীতশিল্পীও রয়েছেন। বাতিলের তালিকায় নাম ওঠায় তাদের কেউ কেউ তড়িঘড়ি করে ব্যাংকে গিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য চেষ্টা-তদবিরও শুরু করেছেন। 

তবে ব্যাংকাররা বলছেন, ন্যূনতম অর্থের চেয়েও কম টাকা জমা দিয়ে ঋণ নিয়মিত করার প্রস্তাব তারা নিচ্ছেন না। যারা সব শর্ত পূরণ করতে পারছেন, কেবল তাদের ঋণই নিয়মিত করা হচ্ছে।

সোমবার (৪ ডিসেম্বর) মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের শেষ দিন খেলাপি ঋণের কারণে যারা প্রার্থী হওয়ার সুযোগ হারিয়েছেন তাদের বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব, ব্যবসায়ী মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী, নোয়াখালী-৩ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কিরণ, কক্সবাজার-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ, লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও তরিকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব এম এ আউয়াল, সংগীতশিল্পী ডলি সায়ন্তনী উল্লেখযোগ্য।

তারা মঙ্গলবার থেকে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন।

ইসির পরিপত্র অনুযায়ী, কমিশনকে সম্বোধন করে ইসি সচিবের কাছে স্মারকলিপি আকারে আপিল দায়ের করতে হবে। মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিলের তারিখ; আপিলের কারণ সম্বলিত বিবৃতি এবং বাতিল বা গ্রহণ আদেশের সত্যায়িত কপি সংযোজন করতে হবে।

আপিল দায়েরের সময় শেষ হওয়ার ছয় দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করবে ইসি। সেই অনুযায়ী আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে সব আপিল নিষ্পত্তি হবে।

যাদের প্রার্থিতা বাতিল হলো 
ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স করপোরেশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান থাকাকালেই বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ার একাধিক অভিযোগ রয়েছে। কয়েক হাজার কোটি টাকার সেসব কেলেঙ্কারির খবরের পর পরিচালক পদ হারনো মান্নান এখনও ঋণখেলাপি। যে কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন লক্ষ্মীপুর জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা।

এর আগে একই অভিযোগে নোয়াখালী-৪ আসনেও তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়।

মুন্সিগঞ্জ-১ (শ্রীনগর-সিরাজদিখান) আসনে প্রার্থী হতে চাওয়া বিকল্পধারার জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মহাসচিব মাহী বি চৌধুরীরর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রির্টানিং কর্মকর্তা আবুজাফর রিপন।

তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, খেলাপি হওয়া ঋণের জামিনদার থাকায় মাহী বি চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

এনসিসি ব্যাংক থেকে নেওয়া ক্রেডিট কার্ডে খেলাপি হওয়ায় প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে পাবনা-২ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের (বিএনএম) প্রার্থী সংগীতশিল্পী ডলি সায়ন্তনীর।

রোববার সকালে রিটার্নিং কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করে বলেন, “ডলি সায়ন্তনীর ক্রেডিট কার্ড সংক্রান্ত খেলাপি ঋণের কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।’’

পরে ডলি সায়ন্তনী বলেন, “ক্রেডিট কার্ডের বিষয়টি আমার খেয়াল ছিল না। বিষয়টি আমি দ্রুত সমাধান করে আপিল করব।”

একই অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের (আড়াইহাজার) স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফুল ইসলামের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। ব্যাংক প্রতিনিধি আপত্তি করায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহমুদুল হক।

কক্সবাজার-১ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর বাতিল করা হয়েছে।

কক্সবাজারের রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহম্মদ শাহীন ইমরান জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি তালিকায় গত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত খেলাপি থাকায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে ‘ফিস প্রিজারভারস’ নামের একটি কোম্পানি জনতা ব্যাংক থেকে ৪৭ কোটি টাকার ঋণ এখন খেলাপি হয়েছে। এ কোম্পানির পরিচালক থাকা অবস্থায় ঋণটির জামানতকারী (গ্যারান্টার) ছিলেন তিনি। জামিনদার হিসেবে তিনিও খেলাপির তালিকায় আছেন।

নৌকার প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এই আদেশের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করবেন। আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পাবেন বলে আশা করছেন তিনি।

ঋণখেলাপির অভিযোগে লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও তরিকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব এম এ আউয়ালের মনোনয়নপত্র স্থগিত রেখেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এবার তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।

খেলাপি হওয়ার কারণে নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসন থেকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কিরণের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

রিটার্নিং কর্মকর্তা দেওয়ান মাহবুবুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি তালিকায় ঋণ খেলাপি হওয়ায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।”

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের নওগাঁর সাপাহার শাখা থেকে ১৬ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেননি জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আইয়ুব হোসেন। তিনি ওই উপজেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।

ব্যাংকের শাখাপ্রধান মিলন কুমার সরকার জানান, ২০১১ সালে আইয়ুব ১৬ লাখ টাকা নিলেও শোধ না করায় সুদ-আসলে তা ৫১ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। তিনি দুই লাখ টাকা জমার বিপরীতে ঋণ নিয়মিত করার দাবি তুললেও রাজি হয়নি ব্যাংক।

খেলাপি হওয়ার কারণে পটুয়াখালী-১ (পটুয়াখালী সদর, দুমকি, মির্জাগঞ্জ) আসনের বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী নাসির উদ্দীন তালুকদার এবং জাকের পার্টির মিজানুর রহমান বাবুলের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।

নাটোর-১ আসনে ঋণ খেলাপির জন্য জাসদের (ইনু) মোয়াজ্জেম হোসেনের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

একই কারণে মানিকগঞ্জ-১ ও ৩ আসনের লাঙ্গলের প্রার্থী জহিরুল আলম, মানিকগঞ্জ-১ আসনে বিএনএমের মোনায়েম খান, মানিকগঞ্জ-২ আসনে লাঙ্গলের প্রতীকের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আব্দুল মান্নানের মনোনয়নও বাতিল হয়েছে।

যে কারণে বাদ পড়লেন

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর ১২ অনুচ্ছেদের ধারা-১ অনুযায়ী, ‘‘কোনো ব্যক্তি কৃষি কাজের জন্য গৃহীত ক্ষুদ্র কৃষি ঋণ ব্যতিত, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার তারিখের পূর্বে কোনো ব্যাংক হইতে গৃহীত কোনো ঋণ বা ঋণের কোনো কিস্তি পরিশোধে খেলাপি হইয়া থাকিলে, তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য হইবেন।’’

একই অনুচ্ছেদের ধারা-১ এর উপ-ধারা (এম) অনুযায়ী, “কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো কোম্পানির পরিচালক বা ফার্মের অংশীদার হন যা কোনো ব্যাংক হইতে গৃহীত কোনো ঋণ বা ঋণের কোনো কিস্তি তাহার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার তারিখের পূর্বে পরিশোধে খেলাপি হইলে, তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য হইবেন।’’

ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা জানান, মনোনয়নপত্র দাখিল করার পর প্রার্থীর তালিকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানো হয়; সিআইবি প্রতিবেদন অনুযায়ী বাছাই করা হয়। এক্ষেত্রে প্রার্থীরা ঋণ বা বিল খেলাপি কি না, তাদের দেওয়া আর্থিক তথ্যে অসঙ্গতি আছে কিনা—তা যাচাই করা হয়েছে। যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিধানগুলো দেখে প্রার্থিতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

Link copied!