• ঢাকা
  • বুধবার, ১২ জুন, ২০২৪, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

যে কারণে নৃশংসভাবে খুন এমপি আনার


সংবাদ প্রকাশ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২৪, ০৩:৪৭ পিএম
যে কারণে নৃশংসভাবে খুন এমপি আনার
আনোয়ারুল আজীম আনার । ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের অভিজাত হোটেলে খুন হওয়া ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যার মূল সন্দেহভাজন আক্তারুজ্জামান শাহিন দুবাই থেকে বাংলাদেশে সোনার বার পাচার করতেন। এমপি আনার সেই চালান ভারতে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতেন। গোয়েন্দা বিভাগের এমন তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিভিন্ন গণমাধ্যম।

গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সূত্র উল্লেখ করে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গেল বছরে এমপি আনার তার বন্ধু পার্টনার আক্তারুজ্জামানের কাছে সোনা চোরাকারবারির টাকার বড় অংশ দাবি করেন। আনারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে আক্তারুজ্জামানের সঙ্গে সম্পর্কে চিড় ধরে।

সেই ঘটনার কিছুদিন পর ১০০ কোটি টাকার বেশি দামের দুটি সোনার চালান পেয়ে যান আনা। তবে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে না দিয়ে নিজের কাছে রাখেন। এ ঘটনায় দুইজনের পার্টনারশিপ ভেঙে পড়ে।

এরপর থেকে আক্তারুজ্জামান তার পার্টনার আনারের কাছে টাকা চাইতে শুরু করেন। একইসঙ্গে আনারের পরিবর্তে ভারতে সোনা পৌঁছে দিতে পারে এমন লোক খুঁজে বের করেন।

এতে দুইজনের সম্পর্ক এমন জায়গায় দিয়ে দাঁড়ায় যে ফিরে আসার পথ থাকে না। তারপরও দ্বন্দ্ব নিষ্পত্তি করার জন্য দুইজনই গত ছয় মাস ধরে বেশ কয়েকবার দেখা করেন, বৈঠক করেন। তবে আনার প্রতিবারই আক্তারুজ্জামানকে টাকা দিতে অস্বীকার করেন।

বার বার বৈঠক করেও এমপি আনারের কাছ থেকে টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে এমপি আনারকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেন আক্তারুজ্জামান।

জাতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এমপি আনারকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় আজ থেকে দুই-তিন মাস আগে। মূল পরিকল্পনাকারী আনারের বাল্যবন্ধু পরে ব্যবসায়িক পার্টনার হয়ে ওঠা আক্তারুজ্জামানের মালিকানাধীন গুলশান ও বসুন্ধরার দুইটি বাড়িতে বিষয়টি নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়। আলোচনা পর্যালোচনা হয়।

তবে পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের কড়া নজরদারির কারণে এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের স্থান পরিবর্তন করে ঢাকা থেকে কলকাতায় ঠিক করা হয়। কারণ হত্যাকারীরা জানতেন যে, এমপি আনারের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ অনেক গভীর। প্রায়ই তিনি কলকাতায় গিয়ে থাকেন।

গোয়েন্দা সূত্রগুলোর তথ্য উল্লেখ করে বিভিন্ন খবরে বলা হয়, কলকাতায় আনারকে হত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে খুনিরা গত ২৫ এপ্রিল কলকাতায় ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। তার পাঁচদিন পর ৩০ এপ্রিল খুনের মূল পরিকল্পনাকারী আক্তারুজ্জামান, তার বান্ধবী শিলাস্তি রহমান এবং মূল খুনি সৈয়দ আমানুল্লাহ বিমানে করে কলকাতায় গিয়ে সেই ভাড়া করা ফ্ল্যাটে ওঠেন।

বলা বাহুল্য, মূল খুনি নিজেকে আমানুল্লাহ পরিচয় দিলেও তিনি আসলে খুলনা অঞ্চলের কুখ্যাত সন্ত্রাসী চরমপন্থী সংগঠন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম শীর্ষ নেতা শিমুল ভূঁইয়া।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী প্রকাশিত খবরে আরও বলা হয়, কলকাতার নিউ টাউনের ভাড়া করা সেই ফ্ল্যাটে বসেই আক্তারুজ্জামান জাহিদ ও সিয়াম নামে আরও দুইজনকে খুনের কাজে সহায়তার জন্য ভাড়া করেন। এরপর হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে গত ১০ মে আকতারুজ্জামান তার বান্ধবীসহ বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

এদিকে, চিকিৎসার কথা বলে গত ১২ মে কলকাতায় গিয়ে বহুদিনের বন্ধু গোপাল বিশ্বাসের বাসায় ওঠেন এমপি আনার। সেখানে রাত কাটানোর পর পরদিন ১৩ মে বাসা থেকে বের হলে খুনিদের একজন ফয়সাল তাকে একটি সাদা গাড়িতে করে নিউ টাউনের ভাড়া করা সেই ফ্ল্যাটে নিয়ে যান।

ঢাকা ও কলকাতার গোয়েন্দা সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওইদিন দুপুর ২টা ৫১ মিনিটে এমপি আনার সেই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন। খুনিরা পরবর্তী আধা ঘণ্টার মধ্যে পরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে হত্যা করে। তবে তারা এমপি আনারের মোবাইল ফোন চালু রাখে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিভিন্ন জনকে টেক্সট মেসেজ পাঠায়।

লাশ লুকানোর জন্য ভারতীয় ক্যাবচালক রাজুকে ভাড়া করা হয়েছিল। খুনিরা এমপি আনারের লাশটি এমনভাবে টুকরো টুকরো করেছে যে, মানুষের দেহাবশেষ হিসেবে শনাক্ত করা কঠিন।

পরিকল্পনা মোতাবেক সবকিছু ঠিকঠাক মতো সম্পন্ন হলে ১৫ মে মূল খুনি আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ভূঁইয়া এবং আক্তারুজ্জামানের বান্ধবী শিলাস্তি রহমান বাংলাদেশে ফিরে আসেন। 

প্রসঙ্গত, এমপি আনোয়ারুল আজীম গত ১২ মে ভারতের কলকাতায় গিয়ে তার ২৫ বছরের পারিবারিক সম্পর্কের বন্ধু গোপাল বিশ্বাসের বাসায় ওঠেন সন্ধ্যা ৭টার দিকে। পরদিন ১৩ মে বেলা ২টার দিকে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা বলে গোপালের বাসা থেকে বের হন। সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার কথা বলে যান।

তবে সেদিন থেকে বাসায় না ফেরায় ১৮ মে কলকাতার বরাহনগর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন গোপাল বিশ্বাস। এরপর ২২ মে এমপি আনোয়ারুল আজীম ভারতে খুন হয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশিরাই হত্যা করেছে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে তিনজনকে আটক করা হয়েছে।

Link copied!