• ঢাকা
  • শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১, ৬ মুহররম ১৪৪৫

সিলেটে যে কারণে ঘন ঘন ভয়াবহ বন্যা, জানাল গবেষণা


সিলেট প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৪, ০৮:০০ পিএম
সিলেটে যে কারণে ঘন ঘন ভয়াবহ বন্যা, জানাল গবেষণা
আকস্মিক বন্যায় গোটা শহর বুক পানিতে। ছবি: সংগৃহীত

সিলেটে ঘন ঘন আকস্মিক বন্যা হচ্ছে। একেবারেই ডুবে যাচ্ছে গোটা মহানগরী। গত কয়েক বছর ধরে ভয়াবহ এমন বন্যার পেছনে কী কারণ তা খোজার চেষ্টা করছেন অনেকে।

কেউ বলছেন, হাওরের ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়কই সিলেটে আকস্মিক বন্যার জন্য দায়ী। সড়কটি হাওরের পানি প্রবাহে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে পানি ফুলে ফেঁপে বন্যা ডেকে আনছে সিলেটে।

অনেকে আবার সিলেটে বন্যার কারণ হিসেবে ওই অঞ্চলের নদ-নদীর নাব্যতা সংকটকে দায়ী করছেন। নদ-নদী খনন না করায় শহর থেকে দ্রুত পানি নামতে পারে না। ফলে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

আবার কেউ কেউ ভারতের অতিবৃষ্টির পানিকেও দায়ী করছেন। উজানের ঢল হয়ে যে পানি ভাটিতে নেমে নদ-নদী উপচে ফেলে। উপচে যায় সিলেট শহরও।

তবে সিলেটে ঘন ঘন বন্যার আসল কারণ অনুসন্ধান করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার, নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটি, ভারতের ইন্সটিটিউট অব ট্রপিক্যাল মিটিওরোলজি এবং বাংলাদেশের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের যৌথ গবেষণায়।

গবেষণার ফলাফল বলছে, গত চার দশকে ভারতের মেঘালয়-আসাম এবং বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমতে থাকলেও একদিনে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা চার গুণ বেড়েছে।

গত ডিসেম্বরে রয়্যাল মেটিওরোলজিক্যাল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সিলেট অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের ধরন পাল্টাচ্ছে। যা সিলেটে ঘন ঘন আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করছে। একদিনে অতি ভারী বৃষ্টিপাত বলতে গবেষণায় ১৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাতকে বলা হয়েছে।

বিগত ২০২২ সালের ১৭ জুন সিলেট অঞ্চলে যে প্রলয়ঙ্করী বন্যা হয় সেদিন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে একদিনে ৯৭২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল। সেই প্রবল বৃষ্টিপাতের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রবল পানির তোড়ে তলিয়ে যায় সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চল।

২০২২ সালে সিলেটের ৮৪ ভাগ আর সুনামগঞ্জের ৯৪ ভাগ এলাকা ভয়াবহ বন্যাকবলিত হয়। চলতি বছরে গত ২৯ মে চেরাপুঞ্জিতে একদিনে ৬৩৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। আর সেই রাতেই সিলেট জেলার পাঁচটি উপজেলা প্লাবিত হয় আকস্মিক বন্যার পানিতে।

সেই বন্যার প্রভাব থাকতেই গত ৯ জুন সিলেট শহরে তিন ঘণ্টায় ২২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এতে নগরীতে দেখা দেয় তীব্র জলাবদ্ধতা। এর চারদিন পর ১৩ জুন আবারও একদিনে ৩৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় চেরাপুঞ্জিতে। ফলে পরদিনই বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে দেখা দেয় সিলেটে। ৬ ঘণ্টার ব্যবধানে ২২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে আবারও জলাবদ্ধ হয় নগরীর বেশিরভাগ নিম্নাঞ্চল।

বন্যায় নগরীর রাস্তায নৌকা। ছবি: সংগৃহীত

একদিনে আবারও অত্যধিক বৃষ্টিপাতের ফলে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে প্রবল বন্যা দেখা দিয়েছে। যাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২১ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, “উজানে মেঘালয়ে একদিনে ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা ঘটলেই বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীব্যবস্থার এত স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ পানি পরিবহন করতে পারে না।”

সিলেটের সুরমা নদী উপত্যকায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত একটি ম্যাপিংয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক বলেছেন, সুরমা নদী নগরী এলাকায় প্রতি সেকেন্ডে ৩২১ দশমিক ৩৫ কিউবিক মিটার পানি পরিবহন করতে পারে। যা অতিবৃষ্টির পানি পরিবহনের জন্য যথেষ্ট নাব্য নয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, “শুধু নদী-হাওর নয়, নগরী ও শহর এলাকায় খাল দখল ও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে অতিবৃষ্টিতে চরম জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। এ ছাড়াও পাহাড়-টিলা কাটা ও অবাধে বৃক্ষনিধনের ফলে ভূমিক্ষয় দেখা দিচ্ছে, যা নদী-হাওরসহ সব ধরনের জলাভূমির তলদেশ ভরাট করে বন্যা পরিস্থিতি দুর্বিষহ করে তুলছে।”

Link copied!