রুপালি পর্দার মহানায়ক থেকে বাস্তবের জননায়ক বনে যাওয়া থালাপাতি বিজয় হয়তো বুঝতে পারছেন সিনেমার মতো রাজনীতির পথটা অত সহজ নয়। এখানে পথে পথে ফুলের চেয়ে কাঁটা বিছানো থাকে বেশি।
পর্দার সামনে-পেছনে শত ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেই টিকে থাকতে হয় রাজনীতির ময়দানে। গত ১০ মে ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার দুই মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই তার সরকারকে উৎখাতের একটি ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়েছে।
বিজয় সরকারকে উৎখাতে অন্তত তার দলের ১৫ জন বিধায়কের পতদ্যাগ করানোর একটি নীলনকশা আঁকা হয়েছিল বলে দাবি রাজ্য গোয়েন্দাদের। এ জন্য বিধায়কদের মোটা অঙ্কের ঘুষ অফার করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
ষড়যন্ত্রে জড়িত সন্দেহে ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত ২২ জুন ৫২তম জন্মদিন উদযাপন করেছেন জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর, যিনি থালাপাতি বিজয় নামে বেশি পরিচিত। ভক্তরা ভালোবেসে তাকে ‘থালাপাতি’ ডাকে, যার অর্থ অধিনায়ক। তামিল সিনেমার সুপারস্টার বিজয়ের সবশেষ চলচ্চিত্র ‘জননায়গন’ দীর্ঘদিন নানা জটিলতায় আটকে থেকে গত ১৯ জুন মুক্তি পেয়েছে।
বিজয় দুই বছর আগে সিনেমা ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে) নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার মাত্র দুই বছরের মাথায় প্রথম নির্বাচনেই মুখ্যমন্ত্রী বনে গিয়ে সবাইকে চমকে দেন তিনি। তামিলনাড়ুতে ৫৯ বছর ধরে দুই দ্রাবিড়ীয় সংগঠন ডিএমকে আর এআইএডিএমকের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটত। প্রথম সুযোগে বিজয় সে দ্রাবিড়ীয় শাসনচক্রের অবসান ঘটান।
একজন টিভিকে বিধায়কের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে রাজ্যের গোয়েন্দারা।
তারা প্রথমে চেন্নাই থেকে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কারুর থেকে আরো দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে আগের ক্ষমতাসীন দল ডিএমকে বিধায়ক সেন্থিল বালাজির যোগসূত্র রয়েছে। গ্রেপ্তারদের অন্তত একজন সেন্থিল বালাজি ও তার ভাই অশোক বালাজির ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগ করা হয়। সেন্থিল বালাজির সঙ্গে বিজয়ের রাজনৈতিক বিরোধ পুরোনো। কারুর এলাকায় সেন্থিল বালাজির প্রভাব রয়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে কারুরে বিজয়ের এক র্যালিতে হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে ৪১ জন মানুষ মারা যান। বিজয় তখন এ ঘটনার জন্য সেন্থিল বালাজিকে দায়ী করেছিলেন।
উথানগারাইয়ের টিভিকে বিধায়ক এন ইলাইয়ারাজা গত ২৯ জুন চেন্নাই পুলিশের কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করার পর বিষয়টি সামনে আসে। তিনি অভিযোগ করেন যে, আইপিডিএস নামে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের এক ব্যক্তি তাকে তামিলনাড়ু বিধানসভার স্পিকার ও টিভিকে নেতা জেসিডি প্রভাকরের বিরুদ্ধে একটি অনাস্থা প্রস্তাব সমর্থন করার জন্য তাকে ৩৫ কোটি রুপি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
বিধায়ক আরো অভিযোগ করেন যে পরবর্তীতে তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল এবং এই প্রস্তাবের বিষয়ে কারো সঙ্গে আলোচনা করতে নিষেধ করা হয়েছিল। তামিলনাড়ুর গোয়েন্দারা বুধবার বিষয়টি প্রকাশ করেন।
তামিলনাড়ুর রাজ্য সরকার মন্ত্রী সিটি নির্মল কুমার এই কথিত চক্রান্ত নিয়ে ডিএমকে-কে তীব্র আক্রমণ করে বলেন, “সেন্থিল বালাজির সাথে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিরা এবং তথাকথিত ‘কারুর গ্যাং’-এর সদস্যরা এই ঘটনায় সরাসরি জড়িত। পুলিশের উচিত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার করা। এই ধরনের কুৎসিত কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটাতে হবে।”
তিনি আরো অভিযোগ করেন যে, বিজয়-এর নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটাতে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে প্রধান এডাপ্পাদি কে পলানিস্বামী জোট বেঁধেছেন।
তিনি দাবি করেন, বেশ কয়েকজন টিভিকে বিধায়ককে দলবদলের জন্য টাকার প্রলোভন দেখানো হয়েছে।
কুমার দাবি করেন, ‘এডাপ্পাদি পলানিস্বামী এবং অন্যরা অনৈতিক উপায়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করছিলেন। আজ আমরা তারই বহিঃপ্রকাশ দেখছি। এমকে স্ট্যালিন এবং উদয়নিধির নির্দেশে সেন্থিল বালাজির মতো শীর্ষস্থানীয় ডিএমকে নেতারা আমাদের অনেক বিধায়কের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তারা ১০ কোটি, ২০ কোটি বা এমনকি ৫০ কোটি রুপি পর্যন্ত দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। এমন একজন বিধায়কও নেই যার সঙ্গে তারা যোগাযোগ করেননি।’
তবে ডিএমকে মুখপাত্র এ সারাভানন এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘টিভিকে তদন্তের বিবরণ ফাঁস করে জনগণের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি করতে চাইছে। এটি প্রমাণ করে যে তাদের কাছে তথ্যের অভাব রয়েছে এবং তারা কেবল একটি গল্প বা ন্যারেটিভ তৈরি করতে চায়।’
তিনি টিভিকে সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘যদি তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকে তবে তারা যেন সেন্থিল বালাজিকে গ্রেপ্তার করা হয়।’
ফ্লোর ক্রসিঙের আইনি জটিলতা এড়াতে সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা না এনে স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনে সরকারকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। এরপর ১৫ জন বিধায়ক একসঙ্গে পদত্যাগ করলে বিজয়ের নেতৃত্বাধীন সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাত। গত নির্বাচনে ১০৮টি আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় টিভিকে। তবে ২৩৪ আসনের তামিলনাড়ু বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য দরকার ছিল ১১৮টি আসন। কয়েকটি ছোট দলের সমথনে বিজয় তালিনাড়ুর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জোট সরকার গঠন করেন।


































