• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১, ১১ মুহররম ১৪৪৫

শিল্পবর্জ্যের দূষণে অস্তিত্ব সংকটে খিরু নদী


ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০২২, ০৯:৪৬ এএম
শিল্পবর্জ্যের দূষণে অস্তিত্ব সংকটে খিরু নদী

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার প্রাণ বলে পরিচিত ছিল খিরু নদী। ছিল স্রোতস্বিনী। সেই নদী আজ শিল্পকারখানার বর্জ্য ও বালু ব্যবসায়ীদের আধিপত্যে হারিয়েছে পথ। উপজেলার প্রাণের খিরু নদী এখন বিষাক্ত নদীতে পরিণত হয়েছে।

ভালুকা পৌর এলাকায় শেফার্ড ও গ্লোরি ডায়িং ফ্যাক্টরিসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা শতাধিক কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ও বালু ব্যবসায়ীদের তাণ্ডবে ঐতিহ্যবাহী খিরু নদী নাব্যতা হারিয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে। এতে প্রায় ২৫ কিলোমিটার নদীপাড়ের সেচনির্ভর হাজার হাজার একর আমন ও বোরো জমির আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। মিল-ফ্যাক্টরির দূষিত বর্জ্য নদী-খাল-বিলে ফেলায় এলাকার মানুষ পেটের পীড়া, চর্মরোগসহ নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।

অবৈধ দখল ও শিল্পকারখানার বর্জ্য ফেলায় তৈরি হয়েছে এ অবস্থা। এলাকার কৃষক নিরুপায় হয়ে এ বিষাক্ত পানি দিয়েই চালাচ্ছেন চাষাবাদ। ফলে শুষ্ক মৌসুমে ফসল উৎপাদনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে নদীতে মাছ তো দূরের কথা ব্যাঙের দেখা মেলাও দুষ্কর।

valuka

সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর দিকে তাকালেই দখলবাজি স্পষ্ট হয়ে যায়। জবরদখল প্রক্রিয়া থামাতে মাঝেমধ্যে সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও নানা সীমাবদ্ধতায় থমকে দাঁড়ায়। প্রভাবশালী দখলবাজরা থাকে অপ্রতিরোধ্য।

নদীর পাশ দিয়ে গেলেই রাসায়নিক পদার্থের তীব্র কটু গন্ধ নাকে লাগবে যে কারও। শিল্পকারখানার বর্জ্য পড়তে পড়তে নদীর পানি একদম পচে গেছে। বহু দূর পর্যন্ত পানির এ দুর্গন্ধ গিয়ে নাকে লাগে।

এলাকার হাজার হাজার লোক এই নদীতে মাছ শিকার করে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার চালাতেন। আশপাশের কয়েক এলাকার জনসাধারণের চলাচলের একমাত্র বাহন ছিল খিরু নদীতে নৌকার যান। ভাটি এলাকার শ্রীপুর উপজেলার বরমী বাজার থেকে এ এলাকার ব্যবসায়ীরা পণ্য কিনে এই নদী দিয়ে নৌকার মাধ্যমে পরিবহন করে এলাকার চাহিদা মিটিয়ে আসছিল। কিন্তু ৯০ দশকের পর থেকে ভালুকার বিভিন্ন এলাকায় মিলকারখানা গড়ে ওঠার পর থেকে কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ও পলি জমে ঐতিহ্যবাহী খিরু নদীটি ভরাট হতে শুরু করে। বর্তমানে এ অঞ্চলে অর্ধশতাধিক ডায়িং ফ্যাক্টরির বিষাক্ত বর্জ্য এই খিরু নদীতে এসে পড়ছে। তা ছাড়া বেশ কয়েক বছর ধরে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নদীর দুই পাড়ে বালু স্তূপাকারে রেখে ব্যবসা করার কারণেও নদীটি ভরাট হচ্ছে।

ভালুকার খিরু ব্রিজের দক্ষিণ পাড়ে প্রায় ১৫ বছর আগে গড়ে ওঠা শেফার্ড গ্রুপের শেফার্ড ডায়িং ফ্যাক্টরির বিষাক্ত বর্জ্যে দূষিত হতে শুরু করে খিরু নদীর পানি। আর সম্প্রতি পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড খারুয়ালী গ্রামের গজারী খালপাড়ে গড়ে ওঠা গ্লোরি ডায়িংয়ে বর্জ্য শোধন যন্ত্র থাকলেও তা শুধুই যে লোক দেখানো, তা এখন সবারই জানা। পরিবেশ অধিদপ্তরের অসাধু লোকদের সঙ্গে ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষের সুসম্পর্ক থাকায় কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য খিরু নদীতে ফেলতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তারা সরাসরি মোটা পাইপের মাধ্যমে বর্জ্য খিরু নদীতে ফেললেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লোকজন যেন দেখেও না দেখার ভান করেন। 

valuka

শিল্পকারখানাগুলোর অব্যবহৃত বর্জ্যসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ভালুকার পরিবেশবাদী সংগঠন ও সমাজসেবকরা দীর্ঘদিন ধরে মানববন্ধনসহ নানা আন্দোলন করে হতাশ হয়ে পড়েছেন। নদীর ৩৫ কিলোমিটার পানি দূষিত হয়ে কালো কুচকুচে রং ধারণ করেছে। 

উপজেলার হবিরবাড়ি, ভরাডোবা, মেদুয়ারী ও মল্লিকবাড়ী ইউনিয়নে শতাধিক ডায়িং, ক্যামিকেল ও কীটনাশকের ফ্যাক্টরি রয়েছে, যা থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো বর্জ্য লাউতি খালসহ বিভিন্ন খাল-বিল হয়ে প্রতিনিয়ত খিরু নদীতে পড়ছে। বেশ কিছু ফ্যাক্টরিতে ইটিপি থাকা সত্ত্বেও তা বন্ধ থাকে বলে এলাকার লোকজন জানায়। ছোট ছোট খাল দিয়ে বর্জ্য পানি নামায় মাটি পুড়ে কালো বর্ণ হয়ে গেছে। এ ছাড়া কিছু কিছু এলাকায় যেমন ভরাডোবা গ্রামে কয়েকটি মিলের দূষিত বর্জ্য ভূগর্ভের পানির স্তরে মিশে যাওয়ায় টিউবওয়েলের পানির সঙ্গে প্রায় বিষাক্ত ময়লা পানি বের হচ্ছে। যে পানি খেয়ে ওই গ্রামে অসংখ্য মানুষ ডায়রিয়া ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

এ দিকে বেশ কয়েক বছর ধরে এলাকার কতিপয় বালু ব্যবসায়ী বর্ষা এলেই শত শত ট্রলার দিয়ে ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদী থেকে বালু আমদানি করেন। সেই বালু উত্তোলন করে রাখা হয় ভালুকা থানা সংলগ্ন নদীর চড়াসহ খিরু ব্রিজের উভয় পাড়ে। এসব বালু পাহাড়ের মতো স্তূপীকৃত করে রাখা হয়। আস্তে আস্তে এই বালু নদীতে নেমে ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে। এতে সেচকাজ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরা চাষাবাদে বেকায়দায় পড়ছেন। অথচ স্থানীয় প্রশাসন এর প্রতিকারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

ভালুকা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম পিন্টু বলেন, “ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলা একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা, বর্তমান সরকার কলকারখানার প্রতি বিশাল গুরুত্ব দিয়েছেন। ভালুকায় প্রায় ছোট বড় ৩০০ কলকারখানা চলমান রয়েছে। এখানে শিল্প বিপ্লব হয়েছে, মানুষের ভাগ্যর পরিবর্তন হয়েছে, পাশাপাশি এটাও স্বীকার করতে হবে, কলকারখানার কারণে মানুষের জীবন যাত্রার মান বেড়েছে কিন্তু অন্যান্য দিকে তেমন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। ভালুকায় স্কয়ার, গ্লোরি, এক্সপেরিয়ান্স, শেফার্ড গ্রুপ ভালুকাতে ফ্যাক্টরি করার শর্তে আসে তখন সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় পত্র নেয়। ডায়িং ফ্যাক্টরিগুলো ইটিপির মাধ্যমে বর্জ্যর পানি শোধন করে ব্যবহার করবে, কিন্তু তারা এগুলো না করে খরচ বাঁচানোর জন্য অসৎ উপায়ে বর্জ্যর পানি গুলো নদীতে ফেলছে। কালো, দূষিত-ময়লা যুক্ত পানি ভালুকা ঐতিহ্যবাহী খিরু নদীতে ফেলা হচ্ছে, এর কারণে পানি কালো মবিলের মতো হয়ে গেছে। আমরা এই বিষয় নিয়ে অনেকবার আন্দোলন করেছি। আমরা রাস্তা পর্যন্ত ব্যারিকেড দিয়েছি, কিন্তু দেখা গিয়েছে এই অসৎ ব্যবসায়ীরা মহামান্য হাইকোর্টকে ব্যবহার করে, একটা স্টে অর্ডার এনে এটি বন্ধ করে দিচ্ছে। বর্তমান সরকারের উচিত এই বিষটি বিশেষ ভাবে দেখা, আর যারা ব্যবসা করছে, তাদের অবশ্যই আইন মেনে নিয়মের ভেতর থেকে কলকারখানা পরিচালনা করা।”  

valuka

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ভালুকা আঞ্চলিক শাখার সদস্যসচিব কামরুল হাসান পাঠান জানান, ভালুকায় শিল্পবর্জ্য দূষিত খিরু নদী, এটির মূল কারণ হল ভালুকায় প্রায় ৩০টি ড্রাইং ফ্যাক্টরি রয়েছে ইটিপি ব্যবহার না করে সরাসরি শিল্প তরল বর্জ্যগুলো বিভিন্ন খালসহ সরাসরি খিরু নদীতে ফেলছে। গ্লোরি, শেফার্ড, এফএম ড্রাইংগুলো তাদের শিল্প বর্জ্য খিরু নদীতে সরাসরি ফেলছে। এর মধ্যে লাউতি খাল, বিলাইঝুড়ি খাল সহ প্রায় ৩০টি খাল আজ মৃত। এ সমস্ত শিল্প বর্জ্যর দূষিত পানিতে অনেক ধরনের কেমিক্যাল রয়েছে, যা আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, জীব-বিচিত্র প্রায় শেষ হওয়ার মত, আজ নদীতে মাছ নেই, আবহাওয়া সহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। 

সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল বাকিউল বারী বলেন, “পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে হবে, তাদেরকে আমরাও অভিযোগ করি, সামনে এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে। খিরু নদী শুষ্ক মৌসুমে পানি একদম কমে যায়, বর্ষা মৌসুমে পানিতে ভরপুর থাকে তখন নদীর অবস্থার চিত্র ভিন্ন হয়। কলকারখানার বর্জ্য বিষয়ে মিটিং এ আলোচনা করেছি, যে কয়েকটি কোম্পানি বেশি করে পরিবেশদূষণ করছে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই অভিযান করব।”  

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা খাতুন জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা মিলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য খিরু নদীসহ আশপাশ এলাকার খাল-বিল বা জলাশয়ে পড়ে তা অসহনীয়ভাবে পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় যা যা করণীয় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা করা হবে।

Link copied!