বাংলাদেশসহ ৬০ বাণিজ্য অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ২৪, ২০২৬, ০১:২২ পিএম
বাংলাদেশসহ ৬০ বাণিজ্য অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের

আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ, ব্রিটেন, কম্বোডিয়া, কানাডা, একুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘মোস্ট-ফেভার্ড-নেশন’ শুল্কের সঙ্গে মিলিয়ে মোট শুল্কহার ১০ অথবা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হবে। বাকি ৩৮টি দেশের পণ্যের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-সহ ৬০টি বাণিজ্যিক অংশীদারের পণ্যের ওপর ১০ ও ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে নতুন শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্পের প্রশাসন। আজ থেকে কার্যকর হওয়া এ শুল্কের আওতায় বাংলাদেশও রয়েছে। জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে শিথিলতার অভিযোগ এনে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী আরোপ করা অস্থায়ী ১০ শতাংশ মার্কিন শুল্কের মেয়াদও শেষ হচ্ছে। খবর রয়টার্স।

হোয়াইট হাউজের এ পদক্ষেপকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বৈশ্বিক শুল্কব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সর্বশেষ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় জরুরি অবস্থা আইনের আওতায় গত বছর আরোপ করা ট্রাম্পের ১০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত তথাকথিত রেসিপ্রোকাল শুল্ক বাতিল করে দেয় মার্কিন উচ্চ আদালত। ওই শুল্কের উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো।

গতকাল ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নতুন শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া মোট পণ্যের ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশের ওপর প্রযোজ্য হবে। তবে জ্বালানি তেল-গ্যাস, সার এবং কিছু খাদ্যপণ্যসহ বেশ কিছু পণ্য এর বাইরে থাকবে।

১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় এ শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। এর ফলে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরও যুক্তরাষ্ট্র কার্যত প্রায় সব আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ন্যূনতম শুল্ক বজায় রাখতে পারবে। এছাড়া সেকশন ৩০১ অতীতে আদালতে টিকে যাওয়ায় নতুন শুল্কের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জের ঝুঁকিও তুলনামূলক কম বলে মনে করা হচ্ছে।

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রায় এক শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্রে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং আমরা তা কঠোরভাবে কার্যকর করি। এখন সময় এসেছে আমাদের বাণিজ্যিক অংশীদাররাও একইভাবে ব্যবস্থা নেবে। আজকের পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিকৃত বাণিজ্যচর্চা সংশোধনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের কল্যাণে ভূমিকা রাখবে।

এর আগে গ্রিয়ার জানিয়েছিলেন, যেসব দেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের বাণিজ্য চুক্তিতে মার্কিন শুল্কের সর্বোচ্চ হার নির্ধারণ করা হয়েছে, নতুন ‘জোরপূর্বক শ্রম’ শুল্ক সেই সীমার ওপরে যাবে না।

বাংলাদেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ, ব্রিটেন, কম্বোডিয়া, কানাডা, একুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হবে।

অন্যদিকে ইইউ, তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘মোস্ট-ফেভার্ড-নেশন’ শুল্কের সঙ্গে মিলিয়ে মোট শুল্কহার ১০ অথবা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হবে।

বাকি ৩৮টি দেশের পণ্যের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে। এর মধ্যে রয়েছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, দেশটি উইঘুর সংখ্যালঘুদের শ্রমশিবিরে আটক রেখে কাজ করায়। যদিও বেইজিং এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা চীনা কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, গত নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধবিরতিতে যে ২০ শতাংশ শুল্কহারে সম্মতি হয়েছিল, সেটিই পুনর্বহাল করা হবে। এর বেশি বাড়ানো হবে না। শুক্রবারের নতুন ব্যবস্থা কার্যকরের আগে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শিল্পপণ্যের ওপর আরোপিত ২৫ শতাংশ শুল্ক বাদ দিলে চীনা পণ্যের ওপর কার্যকর শুল্ক ছিল ১০ শতাংশ।

ইউএসটিআরের নথিতে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিবেচনা করা হয়েছে এআরটি (এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড)-এর অধীনে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা। একইসঙ্গে জনমত, সাক্ষ্য, সেকশন ৩০১ কমিটি এবং উপদেষ্টা কমিটিগুলোর পরামর্শও বিবেচনা করা হয়েছে। এর পর প্রেসিডেন্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী নোটিশের অ্যানেক্স-১ এবং অ্যানেক্স-২, পার্ট এ ও জে অংশে উল্লিখিত ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাণিজ্য প্রতিনিধি ।

আরো বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী বাণিজ্য প্রতিনিধি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, তদন্তে ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত কার্যকলাপ, নীতি ও চর্চা দূর করার লক্ষ্যে নির্ধারিত শুল্কহার, শুল্কের আওতা এবং অব্যাহতিগুলো উপযুক্ত।

উল্লেখ্য যে নোটিশের অ্যানেক্স-১ এবং অ্যানেক্স-২, পার্ট এ ও জে অংশে কোনো দেশের জন্য আলাদা করে কিছু লেখা নেই। বরং সেখানে যেসব পণ্য ১০ শতাংশ শুল্ক থেকে অব্যাহতি পাবে, সেগুলোর তালিকা (এইচটিএসইউএস কোড অনুযায়ী) দেয়া হয়েছে।

বিভিন্ন দেশের প্রতিবাদ
নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ আইদে বলেন, নরওয়ের বিরুদ্ধে এ শুল্ক আরোপের কোনো ভিত্তি নেই। কারণ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য ঠেকাতে আমাদের আগে থেকেই সুস্পষ্ট নিয়ম রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিল এ শুল্ককে অযৌক্তিক বলে উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানায়। চলতি সপ্তাহে ২ হাজার কোটি ডলারের পণ্যের ওপর নতুন ট্রাম্প শুল্কের মুখে পড়া কানাডা তুলনামূলক সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একে ‘একতরফা’ পদক্ষেপ বলে অভিহিত করে।

ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট গভর্নর মওরা হিলিও এ শুল্কের সমালোচনা করে বলেন, ‘এতে ব্যয় বাড়বে, ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হবে। এর বোঝা বহন করার সামর্থ্য কারো নেই।’

একই হার, ভিন্ন আইনি ভিত্তি
ওয়াশিংটনের আইন প্রতিষ্ঠান উইলি রেইনের বাণিজ্য আইনজীবী টিম ব্রাইটবিল বলেন, প্রত্যাশিতভাবেই জোরপূর্বক শ্রমভিত্তিক শুল্ক বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তিতে নির্ধারিত বর্তমান শুল্কহারই মূলত বহাল রাখছে এবং শুক্রবার শেষ হওয়া সেকশন ১২২-এর ১০ শতাংশ শুল্কের জায়গা নিচ্ছে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ ধারণা নাকচ করে বলেন, সময়, হার ও প্রায় সব আমদানিপণ্যের ওপর প্রযোজ্য হওয়ার কারণে এটি আগের শুল্কের সরাসরি বিকল্প— এমন ধারণা সঠিক নয়।

তার ভাষ্য, জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় কঠোরভাবে কার্যকর হয়। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো যথাযথ ব্যবস্থা না নিয়ে অন্যায্য বাণিজ্যিক সুবিধা পেয়ে থাকে।

সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও বর্তমানে বাণিজ্য আইনজীবী রায়ান মেজেরাস বলেন, সেকশন ৩০১ অতীতে আদালতে টিকে থাকায় নতুন শুল্ককে আইনি চ্যালেঞ্জে বাতিল করা আরো কঠিন হতে পারে।

যেসব পণ্য শুল্কমুক্ত থাকবে

প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা জানান, জ্বালানি তেল ও গ্যাস, সার, কিছু খাদ্যপণ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সেকশন ২৩২-এর আওতায় আগে থেকেই শুল্কের মুখে থাকা গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামার মতো পণ্য নতুন শুল্কের আওতার বাইরে থাকবে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) শর্ত পূরণকারী পণ্যও শুল্কমুক্ত থাকবে। কারণ উত্তর আমেরিকার সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং এসব পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমাত্রার উপাদান ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

Link copied!