কখনো কখনো জীবনের গতি থেমে গেছে বলে মনে হয়। যা করছি, যা দেখছি বা শুনছি—কোনোটাই আর অনুভূতিকে নাড়া দেয় না। ভালো লাগা নেই, খারাপ লাগাও নেই। উৎসাহ, আশা—সবকিছু যেন মিলিয়ে যায় এক গভীর শূন্যতায়। এমন অবস্থায় কারও মনে হতে পারে সব ছেড়ে সরে যাওয়ার কথা, আবার কেউ হয়তো নিজেকে জোর করে টেনে নিয়ে যেতে চান যত দূর সম্ভব। ঠিক এমন এক সময় কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এক লেখিকা।
লন্ডনপ্রবাসী লেখিকা এমা গ্যানন বাইরে থেকে দেখলে ছিলেন সম্পূর্ণ ‘সফল’। লেখালেখি, নিয়মিত কলাম, জনপ্রিয় পডকাস্ট—সবই চলছিল ভালোভাবে। আর্থিক দুশ্চিন্তা ছিল না, ব্যক্তিগত জীবনেও বড় কোনো অশান্তি নয়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে জমে উঠছিল এক অদ্ভুত শূন্যতা। একদিন বন্ধুদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়ে বিলাসবহুল রিসর্টে স্পা করানোর সময় জীবনের প্রথম প্যানিক অ্যাটাক হয় তাঁর। শান্ত পরিবেশেও শান্তি পাচ্ছিলেন না। মনে হচ্ছিল, শরীর আর মনের মধ্যে যোগাযোগ ভেঙে গেছে।
চিকিৎসকের কাছে গেলে জানা যায়, এই অবস্থার নাম ‘বার্ন আউট’। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক শ্রীময়ী তরফদারের ভাষায়, বার্ন আউট মানে শরীর নয়, মনের শক্তি ফুরিয়ে যাওয়া। আপাতদৃষ্টিতে সুখী ও সফল মানুষদের ক্ষেত্রেও এটি হতে পারে। অতিরিক্ত চাপ, দায়িত্ব আর প্রত্যাশার বোঝা একসময় মানুষকে উদ্দেশ্যহীন ও লক্ষ্যহীন মনে করিয়ে দেয়।
এমার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল। তাঁর মধ্যে বাড়তে থাকে উদাসীনতা, রাগ, অস্থিরতা। ঘন ঘন প্যানিক অ্যাটাক, মানসিক চাপের সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সমস্যাও দেখা দেয়। একসময় মনে হতে থাকে—এই জীবন তিনি আর চান না। শেষ পর্যন্ত সেই অনুভূতির কথা শুনেই তিনি নেন বড় সিদ্ধান্ত।
বদলের শুরু
এমা ঠিক করেন, অনির্দিষ্টকালের জন্য সব কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবেন। অন্তত এক বছর কোনো লেখা নয়, পেশাগত কাজ নয়, সামাজিকতা নয়। প্রয়োজন ছাড়া সব দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। বন্ধ হয়ে যায় তাঁর জনপ্রিয় পডকাস্ট, নিয়মিত আয়ের পথও। এমনকি কাছের বন্ধুর বিয়েতেও যাননি।
টিকে থাকার লড়াই
এই এক বছরে জীবনযাপন পুরোপুরি বদলে যায়। আয় না থাকায় ব্যয় কমাতে হয়। অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বন্ধ, অভ্যাস বদলাতে হয় খাবারের ক্ষেত্রেও। স্বাস্থ্যকর খাবার আর পুষ্টির দিকে মনোযোগ দেন তিনি। এমার কথায়, নিজের যত্ন নেওয়াটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
কান্না, গান আর আবেগ
নিজের অনুভূতিগুলো বুঝতে ও প্রকাশ করতে এমার ভরসা হয়ে ওঠে গান। বহুদিন চেপে রাখা কষ্ট, ভয় আর দুঃখের দরজা খুলে দেয় সুর। কাঁদার জন্য আলাদা করে দুঃখের গানের প্লেলিস্ট বানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর মতে, মন খুলে কাঁদতেও সাহস লাগে।
বন্ধুর গুরুত্ব
এই সময়েই এমা বুঝতে পারেন, সত্যিকারের বন্ধু কারা। যখন তিনি কাজহীন, অবসন্ন, নিজের যত্ন নিতেও অনাগ্রহী—তখন যাঁরা পাশে থেকেছেন, নিঃশর্তভাবে—তাঁদেরই তিনি জীবনের আসল প্রাপ্তি বলে মনে করেন।
নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার
এই এক বছরকে এমা নাম দেন ‘ইয়ার অফ নাথিং’—শূন্যের বছর। সেই শূন্যতার মধ্যেই তিনি ফিরে যান শৈশবের বাড়িতে, পুরোনো স্মৃতির কাছে। ছোটবেলার স্বপ্ন, ভালো লাগা, কৌতূহল—সব আবার নতুন করে আবিষ্কার করেন। সেখান থেকেই জীবনের নতুন লক্ষ্য খুঁজে পান তিনি।
নতুন জীবনবোধ
বার্ন আউট কাটিয়ে আজ এমা জীবনকে দেখেন ভিন্ন চোখে। তিনি বলেন, ওই এক বছর তাঁর জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। এখন নিয়ম করে নিজের সঙ্গে সময় কাটান, নিজেকে প্রশ্ন করেন—ভালো আছেন তো? এই অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি লিখেছেন একটি বই।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, বার্ন আউটের সঙ্গে লড়াই করতে হলে আগে নিজেকে বোঝা জরুরি। কী চাইছি, কোথায় চাপ অনুভব করছি—তা বুঝতে পারলেই অর্ধেক পথ পেরোনো যায়। প্রয়োজনে সময় নিয়ে পরিবেশ বদল করলেও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে।
নিজেকে লক্ষ্যহীন মনে হওয়া মানেই শেষ নয়। কখনো কখনো থেমে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকানোই হতে পারে নতুন শুরুর সবচেয়ে বড় পথ।